রকমারী সবজি এবং মাংসের সাথে ইতিহাসে ভরপুর সিঙারা

samosa

কখনও ঝাল ঝাল আলুর পুর, কখনও আবার মাংসের কিমার পুর আবার কখনও চাউমিনের পুর ভরা ত্রিকোণ আকৃতির এবং কড়া তেলে ভাজা মচমচে স্বাদের খাবারটির নাম সিঙারা বা সিঙ্গারা। দক্ষিণ এশিয়াতে সিঙারা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারতে বিকেলের নাস্তাতে চা-এর যোগ্য জুটি যেন এই সিঙ্গারা। তবে এই সিঙ্গারারও রয়েছে একটা ইতিহাস। রন্ধন বিশারদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে সেই বিষয়টিকেই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করা যেতে পারে। সাধারণত হিন্দি ভাষাভাষি মানুষদের মধ্যে খাবারটি সামোসা নামেই বেশি জনপ্রিয়। সামোসা শব্দটি ফার্সি শব্দ ‘সানবোসাগ’ থেকে এসেছে। আরব প্রদেশে এটি সানবুসাক নামে অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। মনে করা হয়ে থাকে মধ্যপ্রাচ্যে এটি প্রথম তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রদেশের মানুষেরা যখন প্রাচ্যের দেশগুলোতে বাণিজ্যসূত্রে যাতায়াত করতেন তখন তাঁদের হাত ধরে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন প্রদেশে এর প্রচলন শুরু হয়।

ত্রিকোণ আকৃতির এই তেলেভাজাটির জনপ্রিয়তা আজ নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বৃষ্টির দিনে চা-সহযোগে বন্ধুদের সঙ্গে জমাটি আড্ডা দেওয়ার উপযুক্ত সঙ্গী হল সিঙ্গারা। অল্পসময়ের মধ্যেই সিঙারা বানিয়ে ফেলা যেতে পারে। উপকরণের ক্ষেত্রেও সামান্য আয়োজনই প্রয়োজন পড়ে। উপকরণ এবং প্রণালী বিষয়ে কথা বলার আগে আরও দু-চারটি কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। ইসলাম শাসকদের মধ্যেও কিন্তু সামোসার জনপ্রিয়তা চোখে পড়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণের সাক্ষ্য রয়েছে এই প্রসঙ্গে। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে আমির খসরু দিল্লির অভিজাত মুসলমান সম্প্রদায়ের খাবারের যে তালিকা বানিয়েছিলেন, তাতে এই সামোসার উল্লেখ ছিল। এক্ষেত্রে খাবারটি তৈরি করার ক্ষেত্রে আলুর পুরের বদলে মাংস এবং পেঁয়াজের ব্যবহার লক্ষ করা যায়… একইসঙ্গে তেলের পরিবর্তে ঘিয়ে ভাজার একটা চল ছিল ওই সময়ে। আমির খসরুর প্রায় বেশ কিছু বছর পরে ইবন বতুতা যে খাবারটির নাম করেছিলেন তা হল ‘সামসুক’। মাংসের কিমার মধ্যে আখরোট, বাদাম, পেস্তা এবং পেঁয়াজ, মশলা দিয়ে ভাল করে পুর বানিয়ে ময়দার মধ্যে ঢেকে ঘিয়ে কড়া করে ভাজার মাধ্যমে খাবারটি প্রস্তুত করা হত। এখনকার সামোসার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল না থাকলেও সাদৃশ্য যে অবশ্যই রয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না। মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালে রচিত ‘আইন-ই-আকবরী’তে এই একই পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া খাবারটির নাম হল ‘সানবুসা’। আবুল ফজল জানিয়েছেন সেই সময়ে স্থানীয় অনেকেই এটিকে কুংতাব নামে চিনত। এছাড়াও মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের রান্নাবিষয়ক গ্রন্থ ‘নিম্মন্নামা-ই-নাসিরুদ্দীন-শাহী’-তে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে সিঙ্গারা খেতে হঠাৎ করে ইচ্ছে করতেই পারে, তাই পাঠকদের জন্য রইল বাড়িতে সিঙ্গারা বানানোর চটজলদি প্রণালী।

উপকরণঃ 

আলু -১/২ কেজি, মৌরি -১/২ চা চামচ, জিরা -১/২ চা চামচ, মেথি ১/২ চা চামচ, পেঁয়াজ ২ টি, কাঁচামরিচ ৪-৬ টি, আদা ছেঁচা- ২ চা চামচ, জিরা গোটা এবং গুঁড়ো- ১ চা চামচ, দারচিনি গুঁড়ো- ১ চা চামচ, ময়দা ২ কাপ, কালজিরা ১ চা চামচ, প্রয়োজন মত নুন। 

প্রণালী:

  • আলু খোসা ছাড়িয়ে মটরের মত ছোট ছোট টুকরা করে নিতে হবে। কড়াইয়ে ৩ টেবিল চামচ তেল গরম করে মৌরি, জিরা ও মেথি একসাথে মিশিয়ে তেলে ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, আদা ও ১টি তেজপাতা দিয়ে ভাজুন ও আলু দিন। 
  • একটু ভাজা হলে ১ চা চামচ লবণ ও ৩ টেবিল চামচ পানি দিয়ে ঢেকে মৃদু আঁচে রান্না করুন। আলু সিদ্ধ হয়ে গেলে নেড়ে নেড়ে ভাজতে হবে যেন আলু ভাজা ভাজা হয় এবং একটু ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়। জিরা ও দারচিনির গুঁড়া দিয়ে নামিয়ে ঠাণ্ডা করতে হবে। ঠান্ডা হলে আলু ২৪ ভাগ করে হাতের মুঠায় ঠেসে গোল করে নিতে হবে। এতে খামিরে ভরতে সুবিধা হবে। 
  • ময়দায় ৪ টেবিল চামচ তেল দিয়ে ময়ান দিন। কালজিরা মেশান। আধা কাপ পানিতে ১ চা চামচ লবণ গুলে এই পানি আন্দাজমতো দিয়ে ময়দা মেখে নিন। এক ঘণ্টা রেখে দিন।
  • খামির ভালো করে মেখে ১২ ভাগ করে নিন। একভাগ ডিম এর আকারে বেলে ছুরি দিয়ে কেটে দু’ভাগ করে নিন (লম্বায় না কেটে পাশে কাটলে ভালো)। 
  • একভাগ দু’হাতে ধরে কোণ বা পানের খিলির মত ভাঁজ করুন। ভিতরে ভর্তি করে ঠেসে আলুর পুর দিন। খোলামুখে পানি লাগিয়ে ভালভাবে এঁটে দাও দিন প্যকেটের মত। নীচের সুচালো অংশ একটু মুড়ে দিন। চওড়া মোড়ানো দিক উপরে দিয়ে সিঙ্গারা একটি থালায় সাজিয়ে রাখ। এভাবে সব সিঙ্গারা তৈরি করে নিন।

ভাজার জন্য- 

  • কড়াইয়ে দেড় কাপ তেল মৃদু আঁচে অনেকটা সময় গরম করে নিন। আচ বেশি হলে সিঙ্গারার চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে। অর্ধেক সিঙ্গারা একবারে তেলে ছাড়ুন। মৃদু আঁচে ১৫-২০ মিনিট ভাজুন। হালকা বাদামি ও মচমচে হলে নামিয়ে নিন। জিরা, তেঁতুলের চাটনী বা টমেটো সসের সাথে গরম সিঙ্গারা পরিবেশন করুন। ওপরে মাখন মাখিয়েও পরিবেশন করতে পারেন। 

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া, দেমুর নানারকম-দেবাশিষ মুখোপাধ্যায়

রেসিপি- রন্ধনবিদ সিদ্দিকা কবীর