রঙিন কাচ আর কারিগরি দক্ষতার উজ্জ্বল প্রতিফলন তুরস্কের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’

turkish lights
ID 142830145 © Abrar Sharif | Dreamstime.com

মানব ইতিহাসের সাথেই জড়িয়ে রয়েছে আলোর গল্প। এই শিল্পের জন্ম হয়েছিল ৫০০০ বছরেরও বেশি আগে। তাই বলা যেতেই পারে, তুর্কি ঝাড়লণ্ঠন তৈরির কৌশল অন্তত ৫ হাজার বছর পুরোনো।

বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার ও তার বহুল ব্যবহার শুরুর আগে উনিশ শতক পর্যন্ত,  মূলত তুরস্ক সংলগ্ন এলাকায় মোজাইক ঝাড়লণ্ঠনই ছিল অভিজাত আলোকসজ্জার সংজ্ঞা। প্রাচীনকালে, এই মোজাইক চিত্রগুলি রং দিয়ে আঁকা হত না,  পরিবর্তে রঙিন পাথরের টুকরো ব্যবহার করা হত। অবশ্যই,  সেই আমলে সুলতানের প্রাসাদ বা ধনী অভিজাতদের বাড়িতে একমাত্র এর ব্যবহার দেখা যেত এবং এই আলোকসজ্জাই তাঁদের প্রাসাদকে আলো-আঁধারি ছায়ায় ভরিয়ে রাখত। 

সাধারণ নাগরিকদের ঘরে আলোর জন্য ব্যবহার করা হত মোমবাতি, মশাল,  অন্যান্য জ্বালানী গাছের টুকরো যা লোহার কাঠিগুলিতে সংযুক্ত করে জ্বালানো হত।এই ধরনের নকশি লণ্ঠন ব্যবহারের ক্ষমতা তাদের ছিল না।

প্রাচীন কাল থেকে, মোজাইক আলো মূলত ঘর সাজানোর উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হত মধ্য প্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ভিলা, স্নানাগার, মন্দির, মসজিদ এবং গীর্জায়। আজও ইস্তানবুলের বহু প্রাচীন স্নানাগার, মসজিদে এর ব্যবহার দেখা যায়। ধনীদের বৈঠকখানা বা বাগানে ঝোলানো হয়তো এই ঝাড়লণ্ঠন। যা হাওয়ায় দুলে দুলে রকমারী নকশা ফেলত মেঝেতে। রোমান এবং বাইজেন্টাইনরাও এই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছিল এবং তারা যে বিভিন্ন শিল্পে মোজাইকের ব্যবহার করেছিল তার বহু উদাহরণ আজও দেখা যায়। ইতালির রাভেন্না এবং পম্পেই নগরীতে এই মোজাইক শিল্পের উদাহরণ রয়েছে। এই জনপ্রিয় মোজাইকের নকশাই শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলতেন ঝাড়লণ্ঠনের গায়ে।

প্রায় ৫ হাজার বছর পুরোনো এই ঝাড়লণ্ঠন নির্মাণ নিয়ে এখনও নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। প্রাথমিক ভাবে এই বাতি তৈরি হত সিরামিক, ধাতু দিয়ে। তবে পরবর্তী কালে কাচ এবং প্লাস্টার জাতীয় উপকরণের ব্যবহার শুরু হয়। ধাতব অংশগুলি তৈরি করা হয় তামা, ফিলিগ্রি দিয়ে। 

প্রাচীন কাল তো বটেই এমনকী বর্তমান যুগেও এই ঝাড়বাতিগুলি কারিগররা হাতে তৈরি করেন। কাচ গরম করা এবং তারপরে তাকে ঠান্ডা করার পদ্ধতির মাধ্যমেই তার রংকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করা যায়। মোজাইক ল্যাম্প তৈরির জন্য রঙিন কাচ ব্যবহার করা হয়, তবে তার জন্য কোনো কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না। বরং বিশেষ ধরনের কাঁচি দিয়ে রঙিন কাচের বড় প্লেটগুলি কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয় এবং তারপরে বিভিন্ন রঙের ছোট টুকরোগুলি জুড়ে এক একটি ছবি তৈরি করা হয় এবং এর পরে সেগুলি পৃথকভাবে প্রক্রিয়া করা হয়। মোজাইক শেড তৈরির জন্য এই রকম ছোট ছোট কাচের টুকরো জুড়ে নকশা তৈরি করা একধরনের শিল্প। সবচেয়ে ছোট আকারের মোজাইক মোমদানি তৈরি করতেও অন্তত ৪০ মিনিট সময় লাগে।

আধুনিক বোহেমিয়ান গ্লাস (ব্লোন গ্লাস,  চেক মাস্টারদের উদ্ভাবন) বা “গ্লাস আইস” (ভেনিস গ্লাস ব্লোয়ারদের দ্বারা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি) আশ্চর্যজনকভাবে খুব সাবলীল ভাবে এই নান্দনিকতার সাথে মিশে গেছে এবং নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। যদিও এই ধরনের অন্য উপাদানের সংযোজন হতে কয়েকশো বছর সময় লেগেছে। 

বর্তমান যুগের মোজাইক ল্যাম্পগুলি তাঁদের জন্য আদর্শ যাঁরা এখনও প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন ভালোবাসেন, সেগুলি অনুভব করতে চান। আর এই ধরনের ঝাড়লণ্ঠনের ব্যবহার যে বাড়িতে আলাদা আভিজাত্য যোগ করে, তা বলাই বাহুল্য।

বলা হয়, দুটি হুবহু এক রকম দেখতে তুর্কি ঝাড়বাতি পাওয়া সম্ভব নয়,  কারণ প্রতিটি বাতি অনন্য এবং তার নকশা নকল করা অসম্ভব। ফলে প্রতিটি ঝাড়বাতি হল শিল্পীর হাতে তৈরি এক একটি অনন্য শিল্পকার্য।

মরক্কো বনাম তুর্কি

এই দুই ধরনের ঝাড়লণ্ঠনের কারুকাজই শিল্পানুরাগীদের মুগ্ধ করে। এই কারণে  অনেকেই এই দুই ধরনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না। তবে মরক্কোর ঝাড়বাতির চেয়ে অনেকটাই আলাদা তুর্কির ঝাড়বাতি।

প্রথমত, এই দুই ধরনের ল্যাম্পের উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন, তার পরিচয় পাওয়া যায় তাদের নামের মধ্যেই। দ্বিতীয় এবং সম্ভবত মূল পার্থক্য হল, এই ল্যাম্প নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদানের বিবরণ ও উৎপাদ প্রক্রিয়া। তুর্কি ল্যাম্পগুলি মূলত কাচ দিয়ে তৈরি করা হয় যাতে জ্যামিতিক আকারে রঙিন কাচ কাটা থাকে। অপর ক্ষেত্রে, মরক্কোর ল্যাম্পগুলি হল ধাতব এবং এর মধ্যে যে প্যাটার্নগুলি দেখা যায় তা ওই ধাতুর গায়ে গর্ত করে তৈরি করা হয়।

একটি তুর্কি ল্যাম্পের ব্যবহার হল মেডল ইস্টার্ন ডেকোরেশন (Meadle Eastern Decoration)-এর মূল অংশ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তুরস্কের ল্যাম্পগুলিতে মোজাইকের সাথে তারা এবং ফুলের মতো একই প্যাটার্নের অপূর্ব সুন্দর নিপুণ নকশা রয়েছে। তুর্কি মোজাইক ল্যাম্পগুলিতে তারাগুলি সাধারণত “সিক্স পয়েন্ট স্টার” নামেই পরিচিত। এই “সিক্স পয়েন্ট স্টার” হল একটি সাধারণ জ্যামিতিক আকার যা দুটি সমান্তরাল ত্রিভুজকে ছেদ করে অন্তর্ভুক্ত করে। তুর্কি মোজাইক ল্যাম্পগুলির নকশায় যে ধরনের ফুলের আদল দেখা যায়, তার সাথে অটোমান, আরবি এবং বিবিধ ইসলামিক নিদর্শনে ব্যবহৃত ফুলের মিল পাওয়া যায়।