রমজান পারে সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলতে

সিয়াম Contributor
রমজান সাম্যবাদ
Ramadan bulan sesuai memohon taubat © Hin255 | Dreamstime.com

রমজান আমাদের মধ্যে সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনুভূতি সৃষ্টি করে। রোজা রাখার সময় আমরা যে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা অনুভব করি, তা আমাদেরকে তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যারা অর্থনৈতিক বা সামাজিক জীবনে কঠিন পরিস্থিতিতে জীবন অতিবাহিত করে।

ইসলামিক ক্যালেন্ডারে, রমজান রোজার মাস-ফরয রোজার মাস। রোজা রাখার সময় একজন মুসলমানকে দিনের বেলা খাওয়া, পান করা, স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন এবং যেকোনো পাপ কাজের অনুমতি দেওয়া হয় না। অবশ্য কেউ এই কাজগুলো করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য কোনো মানবীয় ব্যবস্থা নেই। এটি শুধুমাত্র তার এবং আল্লাহর মাঝে সম্পর্কযুক্ত। এটি তার ইমানের অংশ যা সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ সর্বদা তাকে দেখছেন, শ্রবণ করছেন এবং তার সকল তিনি অবস্থা জানেন।

এই বিশ্বাস ভিত্তিক অনুভূতি হল তার পর্যবেক্ষক, যা ইসলামে তাকওয়া (আল্লাহর ভয়) নামে পরিচিত। আমার আগের প্রবন্ধে আমি তাকওয়ার প্রশিক্ষক হিসাবে রমজানের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম, যা একটি আধ্যাত্মিক বিষয়। আজ আমি প্রতিবিম্বিত করতে চাই যে, রমজান কীভাবে আমাদেরকে উপবাস রেখে মানবজাতির প্রতি সহানুভূতি বোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়তা করতে পারে – যার মধ্যে অন্যের সাথে খাবার ও পানীয় ভাগাভাগি করা এবং অভাবীদের মধ্যে সম্পদ বিতরণ করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

মানবজাতির জন্য সহানুভূতি বোধ জাগ্রত করা

একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “রমজান সহানুভূতির মাস”। এটি আমাদের মধ্যে সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অনুভূতি তৈরি করে, যা রমজান মাসে এবং তার বাইরেও আমাদের অনুশীলন করা উচিত। রমজান আমাদের মধ্যে সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনুভূতি সৃষ্টি করে। রোজা রাখার সময় আমরা যে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা অনুভব করি, তা আমাদেরকে তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যারা অর্থনৈতিক বা সামাজিক জীবনে কঠিন পরিস্থিতিতে জীবন অতিবাহিত করে।

সেই হিসাবে, আমাদের প্রয়োজন আমাদের ভাইবোন, মুসলিম, এমনকি অমুসলিম যাদের সাহায্যের প্রয়োজন তাদের প্রতি সাহাযের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। অন্যথায় আমদের অর্থ জুয়ার মত গুণাহের কাজ বা অন্যান্য অনর্থক কাজে ব্যয় হতে পারে। যাই হোক, মুসলিমদের প্রতি বিশ্বাস ভিত্তিক ঐক্যের কারণে মুসলিমরাই আমাদের সাহায্য প্রাপ্তির অধিক হকদার। (সহীহ বুখারী-৬০১১, সহীহ মুসলিম-২৫৮৬)

আমরা আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে সর্বজনীন ভালবাসা এবং করুণার অনেক উদাহরণ দেখতে পাই। একবার খরা হয়ে মক্কায় মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। মক্কার কাফেররা যারা তাঁর সার্বক্ষণিক শত্রু ছিল তাদেরই অনুরোধে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির জন্য দু’আ করেছিলেন। এতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিও হয়েছিল। তারপর তিনি বৃষ্টিপাত বন্ধের জন্য দু’আ করেছিলেন। অন্য আরেক দুর্ভিক্ষের সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাস ও শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও কিছু দরিদ্রদের সাহায্য করার জন্য তিনি কিছু রৌপ্যমুদ্রা প্রেরণ করেছিলেন (মুসনাদে আহমাদ-২০১৩)। এ কারণেই আল্লাহ তাঁকে মানবতার নবী উপাধি প্রদান করেছেন (আল কুরআন-৭: ১৫৮; ৩৪:২৮) এবং তাঁকে দুনিয়ার জন্য রহমত সাব্যস্ত করেছেন (আল কুরআন-২১: ১০৭)।

খাবার ও পানীয় ভাগ করে নেওয়া

রোযাদারকে ইফতার করার জন্য খাদ্য বা পানীয় সরবরাহ করা ধর্মীয়ভাবে প্রশংসনীয় এবং সামাজিকভাবেও উপকারী। এক হাদিসে এসেছে-“যখন কোনো ব্যক্তি রোজা রাখে এবং কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজেকে গুণাহ থেকে বিরত রাখে, তখন আল্লাহ এটিকে এত পছন্দ করেন যে, রোজাদারের মুখ থেকে যে দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসে (পেটের শূন্যতার কারণে) তা আল্লাহর কাছে মেশকের সুবাসের চেয়েও অধিক পছন্দনীয় হয়।” (সুনানে নাসায়ী-২২১২)

এ কারণেই যদি কেউ এ জাতীয় প্রিয় বান্দাকে ইফতারের সাথে শরীক করে নেয় এক টুকরো খেজুর, এক চুমুক পানি বা এক চুমুক দুধের দ্বারাও তবে ফেরেশতারা তাঁর জন্য (মাগফিরাতের) দু’আ করতে থাকেন (ইবনে হিব্বান)। এবং এতে তিনি রোযাদার ব্যক্তির সমান সাওয়াব প্রাপ্ত হন এবং এতে ওই রোজাদের সাওয়াবকে একটুও হ্রাস করা হয় না (মুসনাদ আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, নাসায়ী)। এমনকি এমনও বলা হয়েছে যে, এই জাতীয় ব্যক্তিকে (যে কাউকে ইফতার করায়) জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে (আলমগীরী- ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।

রমজান ও স্নেহানুভূতিঃ

এটি হলো ইফতারের আয়োজনকারীর ধর্মীয় দিক। একই সাথে, এর অসাধারণ সামাজিক প্রভাব সহ দুর্দান্ত পুরষ্কারও রয়েছে। এটি সামাজিক বন্ধন মজবুত করে এবং পারস্পরিক ভালবাসা ও স্নেহানুভূতি সৃষ্টি করে। আমরা যদি উপরের বিষয়গুলি ভাল করে পড়ি এবং এরসাথে ক্ষুধার্তদের আহার করানো, অতিথিদের আতিথেয়তা করা এবং অসুস্থদের সাথে দেখা করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরামর্শ দিয়েছেন সেগুলো মেনে চলি তাহলে এর উপকারের বিস্তৃতি আমরা নিজেরাই বুঝতে পারব। যা রমজানে এবং এর বাইরেও আমদের অনুশীলন করা উচিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “বন্দীদেরকে মুক্ত করো, ক্ষুধার্তদেরকে খাবার খাওয়াও এবং অসুস্থদের সাথে দেখা কর”। (সহীহ বুখারী-৩০৪৬)। অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন: “(তোমরা প্রত্যেকে) রহমানের (আল্লাহর) ইবাদত করো, অন্যকে খাবার খাওয়াও এবং সালামের খুব প্রসার ঘটাও। এতে তুমি নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে”। (জামে তিরমিজি-১৮৫৫)

পরামর্শঃ

খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই দুটি হাদীস আমাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছে যে, (ধর্ম নির্বিশেষে) সকল মানুষের সাথে ভাল কথা বলতে, কোনোভাবে কারও ক্ষতি না করতে, বরং এখানে তাদের জন্য ব্যয় করতে এবং তাদেরকে বিভিন্নভাবে খাবার খাওয়াতে, উপহার প্রদান করতে, অনুদান প্রদান করতে, ভাল পরামর্শ দিতে ও ভাল কথা বলতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের বিশেষ চিকিত্সা করার প্রতিও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে ।

আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “যে ব্যক্তি এটা চায় যে, তাঁর ধন-সম্পদ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হোক এবং তাঁর জীবনকাল আরও দীর্ঘায়িত হোক, তাঁর উচিত আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক কায়েম রাখ”। (সহিহ বুখারী-৫৯৮৬)। প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার গুরুত্ব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদিস থেকে বোঝা যায়-“জিবরাঈল আ’লাইহিস সালাম সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে এত বেশি উপদেশ দিচ্ছিলেন যে, একসময় আমার ধারণা হতে লাগল যে, অচিরেই বুঝি প্রতিবেশিকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা হবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ-৩৬৭৩)।

অন্য স্থানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-“ঐ ব্যাক্তি (প্রকৃত) মুমিন নয়, যে নিজে পেটভরে খায় কিন্তু তাঁর প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”(আল-আদাবুল মুফরাদ-১১২)। তিনি আরও বলেছেন, “সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার প্রতিবেশী তার অন্যায় আচরণ থেকে নিরাপদ নয়।”(সহিহ মুসলিম-৪৬)। “প্রতিবেশী” শব্দটি কোনো ব্যক্তির প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়, “একজন ব্যক্তির সামনে চল্লিশটি বাড়ি, তার পিছনে চল্লিশটি বাড়ি, তার ডানদিকে চল্লিশটি বাড়ি এবং তার বামদিকে চল্লিশটি বাড়ি প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত”(আল-আদাবুল মুফরাদ-১০৯)।

দরিদ্রদের প্রতি দান করা

ইসলামে একজন মুসলমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তিনি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেন (আল কুরআন-২:৩), যার মধ্যে মূলত তাঁর নিজের পরিবার, ফরয সদকা (যাকাত) আদায় করার পরে  যা অবশিষ্ট থাকে তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটিকে ঐচ্ছিক সদকা বলে।

এটির মুল উদ্দেশ্য অন্তর থেকে অর্থ জমা করা ও পার্থিব সম্পদের প্রতি ভালবাসা মুছে ফেলা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এই পরিমাণ উত্সাহিত করেছেন যে, তিনি বলেছেন- “অর্ধেক পরিমাণ খেজুর সদকা করে হলেও নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো”।(সহিহ বুখারী-১৪১৭)। তিনি রমজানের দানকে সেরা দান বলে অভিহিত করেছেন (জামে তিরমিজি-৬৬৩) এবং এই মাসে তিনি নিজেকে “দানের ক্ষেত্রে প্রবাহিত বাতাসের চেয়ে আরও উদার …” উদাহরণ হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন।

দানের প্রকারঃ

তবে এই মাসে দানশীলতা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। এটি মালের যাকাত হতে পারে। যেহেতু রমজানের সদকা সবচেয়ে উত্তম, তাই অনেক মুসলমান এই মাসকে তাদের মালের যাকাত প্রদান করার জন্য বেছে নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে, যাকাত যথাযথ সময় হিসাবেই প্রদান করা উচিত এবং অন্য মাসে যাকাত ফরয হলে রমজান পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়।

দ্বিতীয় প্রকারের দান সদকাতুল ফিতর হতে পারে, যা যেকোনো অশালীন কাজ বা বক্তব্য থেকে নিজেকে পরিষ্কার করার জন্য এবং অভাবীদের জন্য খাদ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে রমজান মাসে প্রদান করতে হয় (সুনানে আবু দাউদ-১৬০৯)। অভিভাবকের পক্ষ থেকে এটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্যও প্রদান করতে হয়। মূলত, সদকাতুল ফিতর (যে রোযা রাখে এবং কম বয়সের কারণে রোযা রাখেনি তার জন্য) প্রদান করার মূল উদ্দেশ্য দরিদ্র ও মিসকীনদের সাহায্য করা।

তৃতীয় প্রকারের সদকা ফিদিয়া (মুক্তিপণ) হতে পারে। এটি তাদের জন্য যারা বয়সের কারণে, অসুস্থতার কারণে বা সুস্থতার কোন আশা নেই এমন গুরুতর অসুস্থতার কারণে রোজা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন । এই কয়েকটি ধরণের দানের খাত ছাড়াও সর্বদাই দানের যেকোনো বিকল্প রাস্তা খোলা থাকে। এখানে আবার উল্লেখ করা যেতে পারে, দানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশী। তাদের কথাও মাথাই রাখা উচিত।

উপসংহারে বলা যায়, ইসলামে রোজা রাখা কেবল একটি আচার-অভ্যাসই নয়। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যার উপরে ইসলাম নামের ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছে। অন্যান্য চারটি স্তম্ভের মতো এটিও গভীর আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সহ মুসলিম জীবনের জন্য একটি সুশৃঙ্খল জীবনপদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.