রমজান মাসে জয় করা হয় দ্বিতীয় ‘আন্দালুস’

belgrade
ID 49431598 © Mario Cupkovic | Dreamstime.com

অনেকেই জেনে অবাক হতে পারেন, কিন্তু এ কথা সত্যি যে ইউরোপের সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড এক সময় ইসলামিক শহর ছিল। সংস্কৃতি এবং শিক্ষার দিক থেকে এই শহরকে বল্কানদের “আন্দালুস” হিসাবে বিবেচনা করা হত। পুরোনো “আন্দালুস”-কে হারানোর বহু বছর পরে, আধুনিক বিশ্বের মানচিত্রে একটি নতুন “আন্দালুস” তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনা পরম্পরার মাঝে সময়ের যে বড় ব্যবধান রয়েছে, তা পূরণ করার জন্য ইসলামীয় বেলগ্রেড নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন ডঃ মহম্মদ মুফাকো।

ভৌগোলিক অবস্থান ও তার তাৎপর্য

ডাঃ মুফাকোর মতে বেলগ্রেড-এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেন্যুব এবং সাভা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত বেলগ্রেডের সুপ্রাচীন দুর্গ, যার নাম বেওগ্রাদস্কা তভদ্রভা, বহু রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একে বল্কানদের প্রবেশদ্বার হিসাবে বিবেচনা করা হত, যা পাশ্চাত্য, বল্কান ও প্রাচ্যের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করত।

এই গুরুত্বের ফলস্বরূপ, উচ্চাভিলাষী উদীয়মান শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলি এই শহরের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। রোমান সাম্রাজ্যের যুগে হোক বা বাইজেন্টাইন আমলে – এই নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াই জারি ছিল। এই অবিচ্ছিন্ন দ্বন্দ্বের ইতিহাসের ফলে দীর্ঘ সময় এখানে কোনও স্থিতিশীলতা ছিল না। 

বেলগ্রেডের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা গেছিল পঞ্চদশ শতকে, যখন যখন উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তখন বেলগ্রেড হাঙ্গেরির সীমান্তভুক্ত ছিল, এবং তাকে “খ্রিস্টানদের দুর্গ” (the fortress of Christianity) বলা হত। 

রমজান মাসে ক্ষমতা দখল

ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্য বল্কান অঞ্চলের উপরে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এই যুদ্ধযাত্রার ফলে বল্কান অঞ্চলের পরে মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা অটোমানদের দখলে চলে এসেছিল। শুধু বাকি ছিল বেলগ্রেড, যার অপর নাম ছিল – “হাঙ্গেরির চাবি”। বেলগ্রেড দখল করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল সুলতান সুলেমানের (১৫২০-১৫৬৬) আমলে।

অটোমান সাম্রাজ্যের সমকালীন পর্যটক অল্যা শালাবির মতে, সুলতান সুলেমান ছিলেন সুশিক্ষিত। যুবরাজ হওয়ার ফলে তিনি ইতিহাস এবং বিশ্বের পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহ আমাকে ক্ষমতা দিলে, আমি বেলগ্রেডে সেনাবাহিনী প্রেরণ করব।” শাসনক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পরে, সুলতান সুলেমান বেলগ্রেড দখল করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ১৫২১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বেলগ্রেডের উপকণ্ঠে পৌঁছন।

জুলাই মাসের শেষের দিকে তিনি বেলগ্রেড দুর্গে বোমাবর্ষণ শুরু করেন এবং আগস্ট পর্যন্ত ত্রমাগত তা চলতে থাকে। বোমাবর্ষণ চলাকালীন অটোমান সেনাবাহিনী ২-৩ আগস্ট প্রথম বার বেলগ্রেড আক্রমণ আক্রমণ করে। দ্বিতীয় বার হামলা হয় ৮ আগস্ট। দ্বিতীয় দফার এই আক্রমণ দিনের বেলা শুরু হলেও যুদ্ধ চলেছিল রাত পর্যন্ত। সেদিন এই দুর্গ শহরের নীচের অংশ সুলতান সুলেমানের দখলে চলে আসে। সেই আগস্ট মাসে অর্থাৎ গোটা রমজান মাস অটোমানরা এই দুর্গ নিজেদের দখলে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ২৬ রমজানে বেলগ্রেড আত্মসমর্পণ করে।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে, “ডায়েরিজ অন সুলতান সুলেইমানস ক্যাম্পেন অন বেলগ্রেড”-এর লেখক বলেছেন, “আল্লাহর কৃপায় বেলগ্রেড দুর্গ দখল করা সম্ভব হয়েছিল, এবং তারপরে সেই দুর্গ থেকে মুয়াজ্জেন আজান দিয়েছিলেন।” এর পর দিন, অর্থাৎ ২৭ রমজান ছিল শুক্রবার (এই দিনটিকে মুসলিমরা অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করেন)। এই দিনে সুলতান সুলেমান বেলগ্রেডে প্রবেশ করেছিলেন এবং মহা ধুমধাম করে উৎসব পালন করা হয়েছিল। 

শহরের উন্নয়ন

অটোমানরা বেলগ্রেড দখল করার পরে এই শহরের গুরুত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এই সময়ে “খ্রিস্টানদের দুর্গ” ইসলামী কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল, এখান থেকেই অটোমানরা ইউরোপ বিজয়ের অভিযান জারি রেখেছিল। এই শহরের অটোমান শাসনকাল ছিল ১৫২১-১৮৬৭, এবং বিশেষত তাদের শাসনকালের প্রথম পর্যায়ে (১৫২১- ১৬৮৯) এই শহর প্রথম স্থিতিশীলতা প্রত্যক্ষ করে। এই সময়েই দুর্গের পরিবর্তে বেলগ্রেড ক্রমশ পূর্ব ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়। এই দুর্গের বাইরে একটি নতুন শহর নির্মাণ করা হয়েছিল। 

বেলগ্রেডের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান

বলা যেতে পারে, বেলগ্রেড তার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্যই বিখ্যাত ছিল। এই স্থাপত্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বহু মসজিদ, যার সংখ্যা পৌঁছেছিল ২১৭-তে। এই সংখ্যা দেখেই তৎকালীন বেলগ্রেড শহরের ব্যাপ্তি ও প্রাচুর্য সম্পর্কে অনুমান করা যায়। 

এই প্রতিষ্ঠানগুলি কুরআন এবং স্কুলশিক্ষার কেন্দ্র ছিল, যার শিক্ষার সাথে তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তানবুলের শিক্ষাব্যবস্থার মিল ছিল। মসজিদের বিকাশের কারণে মসজিদে অযু করার জন্য ও জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য পরিষ্কার জল সরবরাহ করতে ভূগর্ভস্থ খাল খনন করা হয়েছিল।

ক্লক টাওয়ার

সময় মতো নামাজ পড়ার জন্য সঠিক সময় জানা মুসলমানদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। তাই অটোমানরা তাদের অধীনস্থ প্রতিটি শহরে সুদৃশ্য ক্লক টাওয়ার নির্মাণ করেছিল, যা মূলত সাত কুলা নামে পরিচিত। প্রতিটি টাওয়ারের উপরে একটি ঘড়ি ছিল, যার শব্দ গোটা শহর এমনকী শহরের বাইরে থেকেও শোনা যেত। বেলগ্রেডে এই ধরনের প্রথম টাওয়ার নির্মাণ হয়েছিল ১৫৩৭ সালে। এই টাওয়ারের উল্লেখ পর্যটক অল্যা শালাবির কথাতেও রয়েছে।

বহু বছর পরে, উন্নত বেলগ্রেড শহরকে অটোমান শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য ফের যুদ্ধ শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, ইউরোপের বুকে বেলগ্রেড যেভাবে ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল, তা নষ্ট করা। বর্তমানে, বেলগ্রেড একটি সাধারণ আধুনিক ইউরোপীয় শহরে পরিণত হয়েছে যার নিজের পূর্বতন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সাথে কোনও যোগ নেই। এভাবেই, বেলগ্রেড আরও একটি “আন্দালুস” হয়ে উঠেছিল।