রমযানের আত্মশুদ্ধি: শুধু পানাহার নয়; বরং সকল হারাম থেকে বিরত থাকাই রোযা

দর্শন Contributor
ফোকাস
রমযানের
Photo : Dreamstime

অনন্য সাধারণ ও মহিমান্বিত মাস পবিত্র রমযান নিঃসন্দেহে অন্যান্য মাস থেকে আলাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এই মাসটি হল সিয়াম সাধনার পবিত্রতম মাস। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক নিজের সঙ্গে রোযার সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেছেন। সব ইবাদত-বন্দেগি থেকে রোযাকে আলাদা মর্যাদাও দিয়েছেন।

রোযা ও রমযানের পরিচয়

রোযা ফারসি শব্দ। এর আরবি পরিভাষা হচ্ছে সাওম, বহুবচনে বলা হয় সিয়াম। সাওম শব্দের অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা অথবা জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেওয়া। পরিভাষায় রোযা বা সিয়াম অর্থ মহান আল্লাহর সন্তুটি অর্জনের লক্ষে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকা।

‘রময’ শব্দ থেকে এসেছে ‘রমযান’। ‘রময’ শব্দের অর্থ হলো জ্বালিয়ে দেওয়া, দগ্ধ করা। রমযানের সিয়াম সাধনা মানুষের মনের কলুষতা পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়ে মনকে নির্মল ও পবিত্র করে তোলে। পাপরাশিকে সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ করে মানুষকে করে তোলে খাঁটি ও পুণ্যবান। তাকওয়া অর্জনের জন্য, গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজেকে পরিশুদ্ধ করার প্রেরণা নিয়ে রমযানের আগমন ঘটে।

রোযা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে

রমযানের মাসব্যপী রোযার মাধ্যমে সংযম সাধনার ফলে মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় রাব্বে কারিমের নৈকট্য লাভ করার। কারণ, রমযানের রোযা মানুষের মনের পাপাত্মাকে সংযত করে। অসহায়-দরিদ্র ক্ষুধার্তদের কষ্ট ও যন্ত্রণা, ব্যথা ও বেদনা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মানুষকে শিক্ষা দেয় ধৈর্য্যের।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, “রোযাদারের নিদ্রা ইবাদতের সমতুল্য। তার নীরবতা তসবীহ সমতুল্য। সে সামান্য ইবাদতেই অন্য সময় অপেক্ষা অনেক বেশি সাওয়াবের অধিকারী হয়। এ সময় তার দু’আ কবুল হয় এবং গোনাহ মাফ করা হয়। ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে যে ব্যক্তি রোযা রাখবে তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।”

রোযার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বাত্মক চেষ্টা করা সকল মুসলমানের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। রোযা, তারাবিহ ও সারা মাস সংযম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভের এই সুযোগ আর কোনো মাসেই পাওয়া যায় না। রমযান মাসে যেভাবে আল্লাহর রহমত আমাদের উপর বর্ষিত হয়, সে অসাধারণ সুযোগ আমাদের কারোরই হারাতে চাওয়া উচিত নয়।

শুধু পানাহার নয়; বরং সকল হারাম থেকে বিরত থাকাই রোযা

জীবনকে উন্নত ও অর্থবহ করার প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্যও এই মাসে রোযার গুরুত্ব অপরিসীম। রমযানের উদ্দেশ্য এটাই যে, এ মাসে ত্রুটিযুক্ত মানুষ নিজেকে ত্রুটিহীন মানুষে এবং ত্রুটিহীন মানুষ নিজেকে পূর্ণ মানুষে পরিণত করবে। এ পবিত্র মাসের পরিকল্পনা নফস বা প্রবৃত্তির পরিশুদ্ধি, মানবীয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার সংশোধন, প্রবৃত্তির জৈবিক তাড়নার উপর বুদ্ধিবৃত্তি, ঈমান ও ইচ্ছা শক্তির বিজয় ও নিয়ন্ত্রণ।

তবে যদি এমন হয় যে, পবিত্র রমযান মাস এল আর মানুষ একমাস দিনের বেলা ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং রাতে নিদ্রাহীন থাকল, তারপর ঈদ আসল; কিন্তু রমযানের পূর্বের দিন থেকে তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। তাহলে ঐ রোযা তার জন্য কোন উপকারই বয়ে আনেনি। ইসলাম তো এটা চায় না যে, মানুষ এমনিই মুখ বন্ধ করে রাখবে। বরং রোযা রাখার উদ্দেশ্য হল, মানুষ সংশোধিত হবে।

হাদিসে এসেছে, প্রচুর রোযাদার এমন আছে যারা রোযা থেকে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই লাভ করে না। তাদের রোযা শুধু ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকা ছাড়া কিছুই নয়। হালাল খাদ্য থেকে মুখ বন্ধ করার অর্থ মানুষ এ একমাস একনাগাড়ে অনুশীলন করবে হারাম কথা থেকে নিজের জিহ্বাকে বিরত রাখার, গীবত না করার, মিথ্যা না বলার ও গালি না দেয়ার।

গীবত থেকে দূরে থাকা ও রমযানের ইবাদত 

মানুষ রোযা রেখেও গীবত করে। ফলে যদিও তার মুখকে হালাল খাদ্য থেকে বঞ্চিত রাখে, কিন্তু তার আত্মাকে হারাম খাদ্য দ্বারা পূর্ণ করে। কেননা হাদিসে এসেছে, যদি মানুষ মিথ্যা বলে তবে তার মুখের দুর্গন্ধে সপ্ত আসমান পর্যন্ত ফেরেশতারা কষ্ট পান। যখন মানুষ জাহান্নামে থাকবে তখন জাহান্নাম প্রচণ্ড দুগন্ধ ছড়াবে। এ দুগন্ধ প্রকৃতপক্ষে এ দুনিয়াতেই আমরা সৃষ্টি করেছি মিথ্যা কথা বলা, গালি দেয়া, অপবাদ ও পরনিন্দা চর্চার মাধ্যমে।

পরনিন্দা করা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ও গীবত থেকেও খারাপ। যেহেতু পরনিন্দার মাধ্যমে মিথ্যাও বলা হয়, আবার গীবতও করা হয়। কিন্তু যে মিথ্যা বলে সে শুধু মিথ্যাই বলে, গীবত করে না। তাই পরনিন্দায় দু’টি কবীরা গুনাহ একসাথে আঞ্জাম দেয়া হয়।

এটা কি উচিত, রমযান মাস শেষ হয়ে যায়, অথচ এ মাসে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে পরনিন্দা ও অপবাদ আরোপ করতে থাকি? রমযান মাস তো এজন্য এসেছে যে, মুসলমানরা বেশি বেশি মসজিদে সমবেত হবে, সম্মিলিতভাবে ইবাদত করবে। এজন্য নয় যে, একে অপরকে দূরে সরানোর জন্য এ মাসকে ব্যবহার করবে।

রাব্বে কারিম আত্মশুদ্ধির এ মহান মাসে ‘রহমত’ ‘মাগফেরাত’ ও ‘নাজাত’সহ আমাদের সবাইকে বেশি বেশি নেক আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।