রমযানের প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসে রোজা রাখার গুরুত্ব

আকীদাহ Contributor
মতামত
শাবান মাসে
Emkan1980-Dreamstime.com

আরবি হিজরী বর্ষপঞ্জির ৮ম মাস হল শাবান। এই মাসটি বিভিন্ন কারণে বিশেষ মর্যাদা ও ফযিলতপূর্ণ। হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এই শাবান মাসে মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তন হয়; অর্থাৎ পূর্ব কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা শরিফ কিবলা হিসেবে ঘোষিত হয়। আবার শাবানের পরবর্তী মাস হল রমযান। আল্লাহ তা’আলা রমযান মাসে সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। আর রমযানের রোজার প্রস্তুতি হিসেবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসেও অত্যধিক রোজা রাখতেন বলে হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে।

শাবান মাস রমযানের প্রস্তুতি

রমযানের প্রস্তুতি হিসেবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। উসামা বিন যায়েদ (রাযিঃ) বলেন, “আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, শাবান মাসে আপনি যেভাবে রোজা রাখেন, সেভাবে অন্য কোনো মাসে রোজা রাখতে আমি আপনাকে দেখিনি।” রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “রমযান ও রজবের মধ্যবর্তী এ মাসের ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। কিন্তু এটা এমন এক মাস, যে মাসে বান্দার আমলকে বিশ্বজগতের রব আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই, আল্লাহর কাছে আমার আমল এমন অবস্থায় পেশ করা হোক, যখন আমি রোজাদার।” (নাসাঈ)

এ হাদিস থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্টরূপে জানা যায়-

১) শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা

এ মাসের বেশির ভাগ দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রাখতেন। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আয়েশা (রাযিঃ) বলেন, “আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে (রমযান ছাড়া) অন্য কোনো মাসে শাবান মাসের মত এত অধিক রোজা রাখতে দেখিনি। এ মাসের অল্প কয়েক দিন ছাড়া প্রায় পুরো মাসই তিনি রোজা রাখতেন।” (তিরমিযী)

আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদিসে এসেছে, “রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও ধারাবাহিকভাবে রোজা রাখতেন। এরকম দেখে আমরা বলতাম, তিনি মনে হয় আর রোজা ছাড়বেন না। আবার কখনও এভাবে রোজা রাখা ছেড়ে দিতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি মনে হয় আর রোজা রাখবেন না। রমযান ছাড়া অন্য কোনো মাসে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পুরো মাস রোজা রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে এত অধিক রোজা রাখতেও দেখিনি।” (মুসলিম)

২) শাবান মাসে মানুষের উদাসীনতা

এ মাসের ব্যাপারে মানুষ সাধারণত উদাসীন ও নির্লিপ্ত থাকে। শুধু শাবান মাসই নয়, বরং আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহৎ রমযান মাসেও উদাসীন থাকি। নফল ও মুস্তাহাবের প্রতি তো গুরুত্ব দেওয়া হয়ই না, উপরন্তু অনেক সময় ফরজও ত্যাগ করা হয়। এগুলি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়।

৩) মানুষের আমল আল্লাহর নিকট উপস্থাপন

এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য অনুযায়ী, বান্দার আমল আল্লাহর কাছে তিন স্তরে উপস্থাপন করা হয়। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও বার্ষিক। প্রতিদিন ফজরের নামাজের সময় ও আসরের নামাজের সময় আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। নির্ভরযোগ্য একটি হাদিস থেকে জানা যায়, ফেরেশতারা রাতে ও দিনে পালাক্রমে মানুষের কাছে আসেন। রাত্রিবেলা যে ফেরেশতারা থাকেন, তাঁরা ফজরের সময় চলে যান। তখন দিনের ফেরেশতারা আসেন। তাঁরা আসরের সময় চলে যান। ফলে তখন আবার রাতের ফেরেশতারা আসেন। ফেরেশতারা যাওয়ার পর আল্লাহ তা’আলা অধিক জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় দেখে এসেছ? এরপর তারা বান্দাদের অবস্থা অনুযায়ী আল্লাহর নিকট জবাব দেন।

এরপর সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, “আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বনি আদমের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এমন ব্যক্তি ব্যতীত সকলের আমল কবুল করা হয়।” (মুসনাদে আহমাদ)

আর বার্ষিকভাবে শাবান মাসে আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। এ কারণে নেককাররা এ মাসকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাছাড়া শাবান মাস হল রমযান মাসের প্রস্তুতিস্বরূপ। রমযান মাসে যেভাবে রোজা রাখা এবং কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ ফযিলত ও গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি এ মাসেও রোজা রাখা ও কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যাতে রমযান মাসের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে শাবান মাসকে গুরুত্ব দেওয়ার ও পরিপূর্ণরূপে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।