রমযানের শেষ দশকের রাতগুলো যেভাবে অতিবাহিত করবেন

আকীদাহ ২৭ এপ্রিল ২০২১ Contributor
ফোকাস
রমযানের শেষ দশকের
Photo : Dreamstime

রমযানের শেষ দশ রাত খুবই মূল্যবান। রমযানের শেষ দশকের রাতগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম খুব বেশি ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করতেন। এই রাতগুলোর মধ্যেই মহিমান্বিত লাইলাতুল ক্বদর লুকিয়ে আছে, যে রাতে ইবাদতের মর্যাদা হাজার মাসের থেকেও উত্তম।

শুধু ইবাদতের জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এই রাতগুলোকে বাছাই করে নিতেন। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় তিনি এই রাতগুলো বেশি ইবাদতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতেন।

রমযানের শেষ দশকের রাতে নিজেকে ও পরিবারকে ইবাদতে মগ্ন রাখা

আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম রছরের অন্য সময়ের তুলনায় রমযানের শেষ দশকের রাতে অধিক ইবাদতে মশগুল থাকতেন। (মুসলিম)

এজন্য ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেছেন, “রমযানের শেষ দশকের রাতে নিজেকে ইবাদতের মধ্যে মশগুল রাখার চেষ্টা করা সুন্নত।”

রমযানের শেষ দশকের রাতসমূহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তার পরিবারের সদস্যদেরকেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইবাদতের জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন।

আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রমযানের শেষ দশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কোমর বেঁধে ইবাদত করতেন। পরিবারের সদস্যদেরও তিনি ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন। (বুখারী)

উম্মুল মু’মিনিন উম্মে সালামা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এক রাতে তাকে জাগিয়ে দিতে গিয়ে বললেন, “সুবহানাল্লাহ। চেষ্টার সাথে কি না পাঠানো হয়েছে এই রাতে! এত বরকত নাযিলের রাতেও কি ঘুমকাতুরেরা জাগবে না? হে রব! দুনিয়ায় যা আচ্ছন্ন, আখিরাতে তা প্রকাশিত হয়ে যাবে।” (বুখারী)

রমযানের শেষ দশকের রাতে লাইলাতুল ক্বদরের অনুসন্ধান করা

রমযানের শেষ দশকের রাতগুলোর অন্যতম গুরুত্ব এদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা লাইলাতুল ক্বদরের জন্য।

এটি এমন এক রাত, যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের থেকেও উত্তম। অর্থাৎ, একজন মুমিন এই রাতের ইবাদতের মধ্য দিয়ে প্রায় চুরাশি বছরের চেয়েও অধিক ইবাদতের সওয়াবের অধিকারী হতে পারে। মুসলিম উম্মাহর কাছে এটি আল্লাহর প্রদত্ত অপরিমেয় এক সুযোগ।

কুরআনে আল্লাহ বলেন, “ক্বদরের রাত এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।” (আল কুরআন-৯৭: ৩-৫)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর উপর ঈমান আনয়নকারী ও তার কাছে পুরস্কারের প্রত্যাশী যে কেউ লাইলাতুল ক্বদর সালাতে অতিবাহিত করবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

হাদীসে উল্লেখিত আল্লাহর উপর ঈমানের অর্থ শুধু তাকেই বিশ্বাস করা নয় বরং এই রাতে তার পক্ষ থেকে আমাদেরকে যে পুরস্কারের ওয়াদা করা হয়েছে, তাতেও বিশ্বাস করাকে বোঝানো হয়েছে।

লাইলাতুল ক্বদর রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে একটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “রমযানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদরের সন্ধান করো।” (বুখারী ও মুসলিম)

যদিও আমাদের সমাজে ২৭শে রমযানের রাতকে সাধারণভাবে সম্ভাব্য ক্বদরের রাত হিসেবে গণ্য করা হয়; কিন্তু হাদিসে এরকম সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয় নি।

রমযানের শেষ দশকে মহিমান্বিত এই রাতের অনুসন্ধানে মুসলিমরা বিভিন্ন ইবাদত তথা- নফল সালাত, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর কাছে তওবার মাধ্যমে অতিবাহিত করতে পারেন।

এই দশ রাতে আমাদের সকলের জন্য ইবাদতের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করা কর্তব্য। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমাদের জন্য লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধানের উপায় হল অতিরিক্ত ইবাদতে মশগুল থাকা।”

রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসা

রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমৃত্যু নিয়মিত অনুশীলন। হযরত আয়েশা (রাযিঃ) বলেন, রমযানের শেষ দশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তার মৃত্যু পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করতেন। তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রীরা এই অনুশীলন অব্যাহত রাখেন। (বুখারী, মুসলিম)

ইসলামে ইতকাফের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। মূলত ইতিকাফ বলতে শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দিন মসজিদ বা অন্য কোন স্থানে অবস্থানকেই বোঝায়।

ইতিকাফের উদ্দেশ্য ব্যক্তির সাথে আল্লাহর সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। এ কারণে রমযানের শেষ দশকের রাতে ইতিকাফে অবস্থানকারী ব্যক্তির মনে সর্বদা এই চিন্তা জাগ্রত থাকা উচিত এবং তার সকল কাজে আল্লাহর রহমত কামনা করা উচিত। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কোন ব্যক্তিই তার নির্ধারিত ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করতে পারে না।

ইতিকাফকারীর উচিত ইতিকাফে থাকা অবস্থায় নিজেকে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন রাখা। সকাল-সন্ধ্যায় যিকির এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মাধ্যমে সে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে। এছাড়া সে সুন্নত ও নফল সালাত এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে।

তার উচিত খাবার ও ঘুমে যতটুকু কম সম্ভব সময় ব্যয় করা, অযথা কথাবার্তা ও খোশগল্প এড়িয়ে চলা। কিন্তু, ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানমূলক আলোচনায় সে অংশগ্রহণ করতে পারে।

অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা

রমযানের শেষ দশকে কোন প্রকার অপচয় বা লোকদেখানোর জন্য ছাড়া দান-সদকা বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সৎকাজের দিক থেকে সকলের চেয়ে অগ্রগণ্য এবং রমযানে তিনি তার দান-দক্ষিণা আরও বৃদ্ধি করতেন। জিবরাইল (আঃ) প্রতিবছর রমযানে তার সাথে সাক্ষাত করতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। জিবরাইল (আঃ) এর সাথে সাক্ষাতের পর তিনি যেন কল্যাণদায়ক বাতাসের মত উদার হয়ে যেতেন।” (বুখারী ও মুসলিম)

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, “দয়া ও হাত খুলে দান করাকে রমযানে বিপুলভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে, বিশেষ করে শেষ দশকের রাতে। এর মাধ্যমে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর পাশাপাশি আমাদের পূণ্যবান পূর্বপুরুষদেরও অনুসরণ করতে পারি। এই মাস মহিমান্বিত এবং যেকোনো সময়ের চেয়ে এই মাসে নেককাজ করা অধিক বরকতপূর্ণ।”