রমযানে ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা পালনের জন্য টিপস

স্বাস্থ্যকর খাদ্য ১৮ এপ্রিল ২০২১ Contributor
মতামত
ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা
Photo : Dreamstime

ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা পালনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। তাকওয়া লাভ করার জন্য আল্লাহ তা’আলা আমাদের রমযানে রোযা পালনের উপদেশ দিয়েছেন। তাই প্রত্যেক মুসলিমেরই এই পবিত্র রমযানে রোযা পালন অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের রোযার ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ একমাস ধরে রোযা রাখা শারীরিক দিক থেকে অনেকসময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আপনার বা আপনার পরিবারের কারওর ডায়াবেটিস থাকলে কীভাবে রোযা পালন করবেন ও কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন, সেই নিয়ে আজকের লেখায় আলোচনা করব।

ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা : অসুস্থ হলে রোযা রাখবেন না

প্রথমেই বলব, আপনি যদি দিনে দুই বা তার বেশিবার ইনসুলিন নিয়ে থাকেন, এবং কিডনি ও লিভারের সমস্যায় ভোগেন, তাহলে আপনার রোযা পালন না করাই উচিত। আর আপনার ডায়াবেটিস যদি খানিক নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলেও রোযা পালনের আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। আপনার শারীরিক সমস্যা ও সুবিধা-অসুবিধা বুঝে তিনিই আপনাকে যথাযথ পরামর্শ দিতে পারবেন।

রোযা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “ওটা নির্দিষ্ট কয়েক দিন। কিন্তু তোমাদের মধ্যে যে কেহ পীড়িত কিংবা প্রবাসী হয় তার জন্য অপর কোন দিন হতে গণনা করবে, আর যারা ওতে অক্ষম তারা তৎপরিবর্তে একজন দরিদ্রকে আহার্য দান করবে। অতএব যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎ কাজ করে তার জন্য কল্যাণ এবং তোমরা যদি বুঝে থাক তাহলে সিয়াম পালনই তোমাদের জন্য কল্যাণকর।” (আল কুরআন- ২:১৮৪)

ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা পালন: সেহরি-ইফতারে কী খাবেন?

তাই ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা পালনের সময় সেহরি ও ইফতারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। খাবারদাবারের কোনওরকম এদিক-ওদিক হলেই হয় লো ব্লাড সুগার (হাইপোগ্লাইসিমিয়া), নয় হাই ব্লাড সুগার (হাইপারগ্লাইসিমিয়া) এবং ডিহাইড্রেশন হয়ে যেতে পারে। ফলে শরীর খারাপের সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই ডায়াবেটিস রোগীরা সেহরি ও ইফতারে কী খাবেন, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

সাধারণত দেখা যায়, যাদের ডায়াবেটিস থাকে, তাঁরা অভ্যেসবশত সেহরির সময় স্টার্চ, কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলেন। কিন্তু রোযার সময় যেহেতু সারাদিন খাওয়া হয় না, ফলে এগুলি না খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য ডায়াবেটিস রোগীদের সেহরি ও ইফতারের সময় খাদ্যতালিকায় স্টার্চ ও কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার যোগ করা উচিত। এর সঙ্গে ফাইবারের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ফল, সবজি যোগ করতে ভুলবেন না। ফাইবার সারাদিন ধরে শরীরে আস্তে-আস্তে শোষিত হয়, ফলে দেহে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমনকী যেহেতু স্বাস্থ্যকর ফ্যাটজাতীয় খাবার পরিপাকের গতিকে স্তিমিত করে, তাই ডাক্তাররা রোযার সময় ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকায় ফ্যাটও রাখতে বলে থাকেন।

লো সুগার এড়ানোর জন্য—

খাদ্যতালিকায় যোগ করুন:

  •  হোলমিল রুটি/ চাপাটি, হোলমিল পাউরুটি, ব্রাউন রাইস বা বাসমতি চালের ভাত, খোসাসুদ্ধ আলু, হোলমিল সিরিয়াল
  •  ফল ও সবজি
  • অলিভ অয়েল/ ফ্যাট স্প্রেড, বাদামের মতো পুষ্টিকর ফ্যাটযুক্ত খাবার, সিডস, অ্যাভোকাডো, অলিভ

অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, ইফতারের পর আচমকা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে শরীর খারাপ হয়। এমনকী, তাঁরা যদি নিয়ম মেনে মিষ্টি পানীয়, মিষ্টি এড়িয়েও চলেন, তাহলেও এই সমস্যা দেখা যায়। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা পালনের ক্ষেত্রে কী খাবেন ও কী খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ। আবার কেউ যদি মিষ্টি পানীয়, মিষ্টি না খেয়ে স্টার্চ ও কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার, ফল, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ইত্যাদি অতিরিক্ত পরিমাণে খান, তাহলেও তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

হাই সুগার এড়ানোর জন্য—

নিম্নলিখিত খাবারগুলির উল্লেখিত পরিমাণের বেশি খাবেন না:

  •  ৪০-৮০ গ্রাম চাপাটি, বা ১-২ স্লাইস পাউরুটি, বা ২-৪টি ছোট আলু, বা ৩০-৬০ গ্রাম সিরিয়াল একবারে খাওয়ার জন্য
  •  ২০০ মিলি. দুধ, অল্প চিজ, ১২৫ মিলি. দই একবারে খাওয়ার জন্য
  •  ৮০ গ্রাম ফল একবারে খাওয়ার জন্য
  •  বেশি মিষ্টি খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলুন

এই খাবারগুলির সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খেতে ভুলবেন না। যাদের ডায়াবেটিস থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর জল বেশি মাত্রায় বেরিয়ে যায়। তাই নিয়ম করে ঘনঘন জল খান।

ডিহাইড্রেশন এড়ানোর জন্য—

  •  সেহরির সময় ও ইফতারের পরে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খান
  •  চা ও কফি খেলে জল শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, ফলে এগুলি না খাওয়াই ভাল। একান্তই খেতে হলে পরিমিত খান
  •  লস্যি, জুস, কোল্ডড্রিঙ্কস ইত্যাদি মিষ্টি বা নোনতা পানীয় খাবেন না
  •  ফল ও সবজির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে, তাই শরীরে জলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এগুলি খান

উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলি মেনে চলুন। ডায়াবেটিস রোগীদের রোযা পালনের ক্ষেত্রে অন্যদের চাইতে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। খাবারের ক্ষেত্রে একটু এদিক-ওদিক হয়ে গেলেই শরীর খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই নিজের শরীর নিজে বুঝুন। ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকলে তারপর রোযা পালনের কথা ভাববেন।