রমযানে স্ত্রীর সঙ্গে আচরণের কিছু বিধিবিধান

বিবাহ Contributor
ফিচার
রমযানে স্ত্রীর সঙ্গে
Photo : Dreamstime

রমযানে বিবাহ

ইসলামী শরীয়তে এমন কোনো বিধান নেই যার কারণে রমযান বা অন্য কোনো মাসে বিবাহ নিষিদ্ধ হবে। বরং বছরের যে কোন সময় বিবাহ করা জায়েয। কিন্তু রমযানে স্ত্রীর সঙ্গে আচরণের কিছু বিধিবিধান রয়েছে।

কিন্তু রোযাদারের জন্য ফজর থেকে সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত সময়ে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করা নিষিদ্ধ। তাই যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে এবং রোযা ভঙ্গকারী বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার আশংকা না করে তার জন্য রমযান মাসে বিবাহ করতে কোনো আপত্তি নেই।

তবে যে ব্যক্তি রমযান মাসে তার দাম্পত্য জীবন শুরু করতে চায় কিন্তু তার আশঙ্কা আছে যে, দিনের বেলায় সে নতুন স্ত্রী থেকে ধৈর্য্য রাখতে পারবে না। তাই হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া ও এ মর্যাদাবান মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন না করার জন্য তার উচিত রমযান মাস অতিবাহিত হওয়ার পর বিবাহ করা।

রমযানে স্ত্রীর সঙ্গে মেলামেশা (চুম্বন, আলিঙ্গন)

রমযানে অনেকেই স্ত্রী-পরিজনকে বর্জন করার মাঝেই প্রকৃত সংযমের অর্থ খুঁজে পান। অথচ রাসূলের জীবন থেকে আমরা এমনটি পাই না। বরং তিনি রমযানেও স্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা অব্যাহত রাখতেন। আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইতেকাফ থাকাকালীন সময়ে আমার দিকে মস্তক এগিয়ে দিতেন। এসময় আমি তার চুল আঁচড়ে দিতাম। মানবিক প্রয়োজন ছাড়া তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন না।” (মুসলিম)

এটাই স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক প্রীতির নিদর্শন। রোযা অবস্থাতেও রাসূল তার স্ত্রীদের চুম্বন করতেন এবং ঘনিষ্ঠভাবে আলিঙ্গন করতেন।

এক রেওয়ায়েতে এসেছে, আয়েশা (রাযিঃ) বলেন, রাসূল চুম্বনের জন্য আমার নিকট ঝুঁকে এলেন। আমি বললাম, আমি তো রোযাদার। তিনি বললেন, আমিও তো রোযাদার। অতঃপর তিনি ঝুঁকে এসে আমাকে চুম্বন করলেন।” (মুসনাদে আহমাদ)

হাফসা (রাযিঃ) বলেন, রাসূল রোযা রাখা অবস্থায় আমাকে চুম্বন করতেন। (মুসলিম)

এমনকি তিনি আলিঙ্গনও করতেন। আয়েশা (রাযিঃ) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে আলিঙ্গনা করলে আমি তাকে বললাম, আমি তো রোযাদার। তিনি বললেন, আমিও তো রোযাদার।” (মুসনাদে আহমাদ)

রোযা অবস্থায় মেলামেশা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আয়েশা (রাযিঃ) জানান, “হ্যা, (তিনি মেলামেশা করতেন), কিন্তু তিনি ছিলেন তোমাদের মাঝে সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণশীল।” (মুসলিম)

এ সকল হাদিস থেকে বোঝা যায়, রোযা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার জন্য রোযা রেখে স্ত্রীকে চুম্বন বা ঘনিষ্ঠ মেলামেশা করা উচিত নয়।

রমযানে স্ত্রীর সঙ্গে মিলন

রমযানের রাতে স্ত্রীর সাথে সহবাস বৈধ। বিবাহিত পুরুষের জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস কোনো হাদিসে সদকা সমতুল্যও বলা হয়েছে। ইবাদতপ্রিয় লোকদের এ বিষয়ে অবগত থাকা উচিত যে, রমযান কোনো বৈরাগ্য নয়, বরং একটি সংযমী ও ইবাদতের মাস।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানের রাতে স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হতেন। তবে শেষ দশ দিনে ই’তিকাফ থাকাকালীন তা থেকে বিরত থাকতেন। আয়েশা রাযিঃ বলেন, স্বপ্নদোষে নয়, বরং, সহবাসের কারণে রমযানে অপবিত্র অবস্থায় রাসূলের ফজর হয়ে যেত। অতঃপর তিনি গোসল করে রোযা পালন করতেন।” (মুসলিম)

তবে রাসূল কেবল রমযানের প্রথম বিশ দিনে স্ত্রীদের সাথে সহবাস করতেন, শেষ দশ দিনে তিনি ই’তিকাফ পালন করতেন। আয়েশা রাযিঃ বলেন, “শেষ দশ দিনে রসূল স্ত্রী সহবাস বর্জন করতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন, এবং তার পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন।” (বুখারি)

তবে রমযানে দিনের বেলায় অর্থাৎ, রোযা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস কোনোভাবেই জায়েজ নয়। রোযা অবস্থায় সহবাস করলে ঐ রোযার কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে। রোযার কাফফারা হল মাঝে কোনো বিরতি না দিয়ে একাধারে ৬০টি রোযা রাখা। এর সামর্থ্য না থাকলে ৬০জন মিসকিনকে ২ বেলা পেট ভরে আহার করানো।

রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ

প্রথমত, যে ব্যক্তির স্বপ্নদোষ হয়েছে এরপর ঘুম থেকে জাগার পর সে বীর্যের কোনো আলামত তার কাপড়ে দেখতে পায়নি তার উপর গোসল ফরজ হবে না।

উম্মে সুলাইম (রাযিঃ) বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! কোনো মহিলার যদি স্বপ্নদোষ হয় তাহলে কি তার উপর গোসল ফরয হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ; যদি পানি (বীর্য) দেখে। (বুখারী ও মুসলিম)

এ হাদিস নির্দেশ এসেছে যে, যদি পানি (বীর্য) না দেখে তাহলে তার উপর গোসল ফরয নয়।

দ্বিতীয়ত, স্বপ্নদোষের কারণে রোযা ভঙ্গ হবে না। কারণ স্বপ্নদোষ রোযাদারের অনিচ্ছায় ঘটে থাকে।

এ বিষয়ে আলেমগণের ইজমা হচ্ছে- কারও স্বপ্নদোষ হলে তার রোযা ভাঙ্গবে না। কারণ এক্ষেত্রে সে ব্যক্তি অপারগ। যেমন- কারও অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি কোনো মাছি যদি উড়ে এসে কারো পেটে ঢুকে যায় তবে তার রোযা ভঙ্গ হবে না। এছাড়া, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি বমি করেছে, কিংবা যার স্বপ্নদোষ হয়েছে, কিংবা যে শিঙ্গা লাগিয়েছে তার রোযা ভঙ্গ হবে না।”

সুতরাং, কারও যদি স্বপ্নদোষ হয় তাহলে তার রোযা ভাঙ্গবে না। কেননা স্বপ্নদোষ তার অনিচ্ছায় ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির উপর কেবল গোসল ফরজ হবে। রোযা ভাঙ্গবেও না, এবং কাযা ও কাফফারাও আবশ্যক হবে না।