রমযান ও জুম’আর দিনে মৃত্যুবরণ কি কোনো ফজিলতের বিষয়?

আকীদাহ Contributor
মতামত
রমযান ও জুম'আর দিনে মৃত্যুবরণ
Photo : Pexels

আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে যে, রমযান ও জুম’আর দিনে মৃত্যুবরণ করলে সেই বান্দার জন্য জান্নাত রয়েছে। এসময়গুলিতে মৃত্যু কোনো ব্যক্তির জন্য খোশনসিব স্বরূপ। তবে মৃতব্যক্তির জন্য জান্নাত প্রাপ্তির বা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির কোনো সুসংবাদ না থাকলেও জুম’আর দিন বা রমযান মাসে মৃত্যুবরণকারী ঈমানদার মুসলমানকে কবরের ফেতনা থেকে মুক্ত রাখার কথা কিছু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

রমযান ও জুম’আর দিনে মৃত্যুবরণ সম্পর্কে হাদিস

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “যে কোনো মুসলমান জুম’আর দিনে কিংবা রাতে মৃত্যুবরণ করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তাকে কবরের ফেতনা থেকে নিরাপদ রাখেন।” (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী)

এ হাদিসটির ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরাম বলেছেন যে, এখানে ফেতনা দ্বারা কবরে মুনকার-নাকিরের জিজ্ঞাসাবাদ অথবা কবরের আযাবকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু নুআ’ইম তার হিলইয়া’ গ্রন্থে হজরত জাবের (রাযিঃ) হতে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যাতে সুস্পষ্টভাবে কবরের আযাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল কথা হলো, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে আমলি জিন্দেগী যাপন করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ব্যক্তি যে দিন বা মাসেই মৃত্যুবরণ করুন না কেন, আখিরাতের সফলতা তার পদচুম্বন করবে ইনশাআল্লাহ। এ কারণেই কুরআনে জান্নাতের সুসংবাদের প্রত্যেক আয়াতে ঈমান ও নেক আমলের কথা বলা হয়েছে। আর তাতে জান্নাতের যাবতীয় নি’আমতের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

ঈমান ও আমলের বিনিময়ে আখিরাতের ফয়সালা হবে

আবার অনেকেরই প্রশ্ন মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক; যারা সমাজে ভাল ও কল্যাণমূলক কাজ করে থাকে, আখিরাতে কি তাদের কাজের কোনো বিনিময় তারা পাবে না?

আল্লাহ তা’আলা এ প্রশ্নের উত্তরও কুরআনের অনেক স্থানে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। আখিরাতে সকল ভাল ও কল্যাণমূলক কাজের পুরস্কার রয়েছে। তবে শর্ত হল, এসকল নেক কাজ ঈমান সহকারে করতে হবে। কেননা আল্লাহর কাছে ঈমানবিহীন আমলের কোনো মূল্যই নেই।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘সময়ের কসম! নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতিত যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে।’ (আল কুরআন-১০৩: ১-২)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যারা ঈমান আনয়ন করে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদের অভ্যর্থনার জন্যে আছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখান থেকে স্থান পরিবর্তন করতে চাইবে না।” (আল কুরআন-১৮: ১০৭-১০৮)

অতএব, সারকথা হল- রমযান ও জুম’আর দিনে মৃত্যুবরণ বা অন্য যে কোনো ফজিলতপূর্ণ দিনে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির সাথে জান্নাত বা জাহান্নামের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা স্পষ্টভাবে কেউ বলতে পারবে না। এটা শুধুমাত্র আল্লাহর ইলমেই আছে।

রমযান ও জুম’আর দিনে মৃত্যুবরণ জান্নাতের নিশ্চয়তা দেয় না

জান্নাত বা জাহান্নামের সাথে সর্ম্পক হল- মানুষের দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা, ঈমান ও নেক আমল। আর মৃত্যু পরবর্তী জীবনে এ ঈমান ও নেক আমলের ভিত্তিতেই ফয়সালা হবে।

যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে নেক আমল করে ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু বরণ করবে সে জুম’আর দিন মৃত্যুবরণ করুক বা অন্য যে কোনো দিন মৃত্যুবরণ করুক; তাঁর জন্য জান্নাতে প্রবেশের আশা করা যায়, ইনশাআল্লাহ।

আর যে ব্যক্তি শিরক ও কুফরের উপর মৃত্যু বরণ করে সে ব্যক্তি যে কোনো পবিত্র দিন বা পবিত্র মাসে কিংবা যে কোনো পবিত্র স্থানেই মৃত্যুবরণ করুক না কেনো, তার এই মৃত্যু তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

কেননা আল্লাহ তা’আলা এ ব্যাপারে সুস্পষ্টরূপে বলেছেন,

“নিশ্চয়ই আল্লাহ শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না এবং শিরক ছাড়া অন্য যেকোনো গুনাহের মধ্যে যাকে চান তিনি ক্ষমা করবেন।” (আল কুরআন-৪: ৪৮)

রমযান ও জুম’আর দিনে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তি যদি মুসলমান হয় তথা তাওহিদ রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসী হয়ে গুনাহের পথে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তবে তার পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছায় নির্ধারিত হবে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে মাফ করে দিয়ে সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন, তবে এই ঈমানের বিনিময়ে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামের অধিবাসী হবে না।

গুনাহ ও নেকীর হিসাব-নিকাশের পর আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিয়ে জাহান্নামেও দিতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। এ সবই আল্লাহ তা’আলার একক ইখতিয়ার। তবে জাহান্নামের গেলেও একটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সুতরাং, বিশেষ দিন, মাস ও স্থানের কথা চিন্তা না করে নেক আমলের মাধ্যমে আখিরাতের জীবনের চিরস্থায়ী শান্তির স্থান জান্নাতের জন্য সকলের চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে ঈমানের সঙ্গে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।