রাগের মাথায় তিন তালাক দিলে কি তালাক কার্যকর হবে?

পরিবার Contributor
Homme et femme asiatiques
© Paulus Rusyanto | Dreamstime.com

সাংসারিক জীবনে তালাক একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। কেউ তালাকের অপব্যবহার করলে অথবা ভুল পন্থায় তা প্রয়োগ করলে একদিকে তালাক যেমন কার্যকর হয়ে যাবে তেমনি উক্ত ব্যক্তি গুনাহগার ও হবে। তাই একজন বিবেকবান স্বামীর কর্তব্য হল তালাক এবং এর সমার্থক কোনো শব্দমুখে উচ্চারণ করা থেকে খুবই সতর্কতার সাথে বিরত থাকা।

শরীয়তের বিধান হলো এক বৈঠকে তিন তালাক দেওয়া হোক বা একাধিক বৈঠকে একশব্দে তিন তালাক দেওয়া হোক বা একাধিক শব্দে তিন তালাক দেওয়া হোক; এই সকল ছুরতেই তিনতালাক পতিত হয়ে যাবে।

যেকোনো উপায়ে তিন তালাক দিলে তিন তালাক কার্যকর হয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মৌখিকভাবে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার যেমন কোনো সুযোগ থাকে না তেমনি নতুন করে বিবাহ দোহরানোর মাধ্যমেও ফিরিয়ে নেওয়ার পথখোলা থাকে না। একাধিক সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম একসাথে বা ভিন্নভাবে তিনতালাক দেওয়াকে তিন তালাক হিসেবেই গণ্য করেছেন। যদিও এভাবে তালাক দেওয়ার কারণে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়েছেন।

হাদিসের শিক্ষা

মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলযে, জনৈক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিনতালাক দিয়েছে। তিনি একথা শুনে প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, তোমাদের মাঝে আমি থাকা অবস্থাতেই তোমরা আল্লাহর কিতাবের সাথে উপহাস শুরু করেছ? (সুনানেনাসাঈ)

লক্ষ্যকরুন, এখানে একসাথে তিনতালাক দেয়ার কারণে নবীজী রাগান্বিত হয়েছেন, কিন্তু এই বিষয়টিকে একতালাক বা অকার্যকর বলে ঘোষণা দেননি।

আর সকল সাহাবায়ে কেরামও এটা জানতেন যে, একসাথে তিন তালাক দিলে তিন তালাক-ই কার্যকর হয়, তা যেকোনো অবস্থাতেই দেওয়া হোকনা কেন।

অনুরূপভাবে, যদি কোনো সুস্থ ব্যক্তি রাগের মাথায় তালাক দেয়; তবে তালাক পতিত হয়ে যাবে। কারণ তালাক সাধারণত রাগের বশেই মানুষ দিয়ে থাকে। ভালোবেসে কেউ তালাক দেয়না। সুতরাং তা পতিত হবে।

তালাক খুবই জঘন্য একটি শব্দ। হাদিসে একে নিকৃষ্ট হালাল বলা হয়েছে। এ শব্দটি এমন যে, নিয়ত থাকুক বা না থাকুক,রাগে বলুক আর ভালোবেসে বলুক স্ত্রীকে উদ্দেশ্য নিয়ে মুখ দিয়ে এ শব্দ বের হলেই তালাক পতিত হয়ে যায়।

এ সম্পর্কে রাসূলসাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “তিনটি বিষয় এমন আছে যে, ইচ্ছেকৃত করলেও ইচ্ছেকৃত এবং ঠাট্টা করে করলেও তা ইচ্ছেকৃত বলে ধর্তব্য হয়। তা হল ১) তালাক, ২) বিবাহ এবং ৩) তালাকে রেজয়ী প্রাপ্তা স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। (ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)

সুতরাং, এ কথার সারমর্ম হলো রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দিলেও তালাক হয়ে যাবে।

ব্যতিক্রম কখন?

অবশ্য এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমও আছে। কেউ যদি এত বেশি রেগে যায় যে, রাগের ফলে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আর এ অবস্থায় সেকী বলেছে তার কিছুই তার মনে না থাকে তবে একমাত্র ঐ অবস্থাতেই তালাক কার্যকর হয়না।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, শর্তটি হলো বেহুশ হয়ে যাওয়া এবং সেই সময়ের কোনো কথা মনে না থাকা।

দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে অনেক বড় একটি নেয়ামত। স্বামী-স্ত্রী সকলের কর্তব্য, এই নেয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং একে অপরের সকল অধিকার আদায় করা। এক্ষেত্রে স্ত্রীর উচিত নয়, কথায় কথায় স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া। আবার স্বামীর জন্য ও জায়েয নয় আল্লাহ তা’আলার দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করা।

স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য জরুরি বিয়ে, তালাক ও দাম্পত্য জীবনের সকলবিধান ও মাস’আলা ভালোভাবে শিক্ষাকরা। বিশেষ করে স্বামীর কর্তব্য হল, তালাকের মাস’আলা ও এর পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত না হয়ে মুখে কখনো তালাক শব্দ উচ্চারণ না করা। তবে যদি কোনো কারণে তালাক দেয় এবং এমনভাবে দেয় যে, তখন আর তাদের একসাথে বসবাস করা শরীয়তে বৈধ নয় তবে তাদের উচিত আল্লাহকে ভয় করা। বিভিন্ন টাল-বাহানা বা অজুহাত দেখিয়ে কিংবা ভুল কথার উপর ভিত্তিকরে অথবা মূলঘটনা গোপন রেখে তাদের আর একসাথে বসবাস করা উচিত নয়। বিয়ে শুধু একটি সময়ের বিষয় নয়, বরং এটি সারাজীবনের বিষয়।

বাস্তবেই যদি তালাক পতিত হয়ে যায় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে যায়; কিন্তু এরপর ও যদি স্বামী স্ত্রী একসাথে বসবাস করে তবে তা হবে কবীরা গুনাহ এবং উভয়েই হবে জিনা বা ব্যভিচারের গুনাহে লিপ্ত।