রাতে ভাল করে ঘুমোতে হলে তালিকায় রাখুন এই ন’টি খাবার

খাবার ৩১ মার্চ ২০২১ Contributor
সুস্বাদু
রাতে ভাল করে ঘুমোতে হলে
© Olexandr Yarovyy | Dreamstime.com

“রাতে ভাল করে ঘুমোতে হলে ঠিকঠাক খাবারের দিকে নজর দেওয়া জরুরি!” ডাক্তারের মুখে এহেন কথা শুনে অবাক হয়েছিলেন আব্বাস। তাঁর পাঁচবছরের ছোট ছেলে রাতে শুতে যাওয়ার আগে চকোলেটের জন্য বায়না করে রোজ। এদিকে রাতে বারবার তার ঘুম ভেঙে যায়। তাই ছেলের ঘুমের সমস্যার সমাধানে তিনি দ্বারস্থ হয়েছিলেন ডাক্তারের। সেখানেই আব্বাস জানতে পারেন, চকোলেট, কফি ইত্যাদি উচ্চমাত্রার ক্যাফেইনযুক্ত খাবার বা মশলাদার খাবার, আইসক্রিম, ভাজাভুজি ইত্যাদি উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার অনেকসময়েই ঘুমের বিঘ্ন ঘটায়। আর রাতে ঘুম না হওয়ার ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, ক্লান্তি গ্রাস করে, যার প্রভাব দেখা যায় অফিসের কাজের পারফরম্যান্সে। হয়তো বা দেখলেন স্ত্রীর সঙ্গে সামান্য কারণেই ঝামেলা হয়ে গেল! রাতে ভাল করে ঘুমোতে হলে তাই ডাক্তাররা এইসমস্ত খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

রাতে ভাল করে ঘুমোতে হলে প্রয়োজন যথাযথ খাবার

দেখা যায় একটু বয়স বাড়লে অনেকেই অনিদ্রার সমস্যায় ভোগেন, ঘুমের ওষুধ না খেলে এঁদের ঘুম আসতে চায় না! এর পাশাপাশি থাকে অফিসের কাজের চাপ, সাংসারিক চিন্তা। বিছানায় শুতে গেলেই যাদের মাথায় অফিস অ্যাসাইনমেন্টের চিন্তা ভিড় করে আসে, একগাদা ক্লান্তি নিয়েও ঘড়ির টিকটিক শুনে রাত কাটে যাদের, তাঁদের কথা ভেবেই আজকের আলোচনা। আপনারা জানেন, রাতে ঘুম না হলে ডাক্তাররা ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের ওষুধ খেলে নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফলে কী খেলে রাতে ঘুমের কোনও সমস্যা হবে না বা ওষুধ খেতে হবে না, এই প্রশ্ন অনেকের মনে থাকে। আজ আমরা ন’টি খাবারের কথা বলব, যেগুলি খাদ্যতালিকায় রাখলে রাতে ভাল করে ঘুমোতে সাহায্য করবে। কী সেগুলি? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

১. রাতে ভাল করে ঘুমোতে দই এবং বেরি

বেরিজাতীয় ফলে থাকে কার্বোহাইড্রেট, যা আমাদের মস্তিষ্কে সেরাটোনিনের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। দইয়ে থাকা ট্রিপটোফ্যান ঘুমের সহায়ক। ভার্জিনিয়ার ডায়েটিশিয়ান এবং অ্যাকাডেমি অফ নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটিটিক্স-এর ন্যাশনাল মিডিয়ার স্পোকসপার্সন ন্যান্সি জেড. ফ্যারেল অ্যালেনের কথায়, “সকালে ব্রেকফাস্টের পাশাপাশি রাতে দই খেলেও তা যথেষ্ট উপকার দেয়। রাতে অনেকেরই মিষ্টি কিছু খেতে ইচ্ছে করে। দই সেই চাহিদা পূরণ করে।” তাই রাতে ভাল করে ঘুমোতে চাইলে বেরি ও দই মিশিয়ে ফ্রুট স্যালাড বানিয়ে নিতে পারেন। বানিয়ে নিতে পারেন স্মুদিও। বাচ্চারা অনেকসময়েই বাচ্চারা দই খেতে চায় না। তাদেরও আপনি রাতে বেরি মিশিয়ে দই দিয়ে স্মুদি বানিয়ে দিন। দেখবেন চেটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে।

২. চেরির রস এবং আখরোট

আপনার শরীরের স্লিপ সাইকেলকে ঠিক রাখতে চাইলে এটি খেতে পারেন। এতে প্রচুর পরিমাণে মেলাটোনিন থাকে, যা স্লিপ সাইকেলকে ঠিক রাখতে কার্যকরী। একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, যারা রাতে চেরির রস খেয়েছেন, তাঁদের

ঘুমের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা দেখা যায়নি। বয়স বাড়লে এমনিতেই ঘুমের সমস্যা বাড়ে, দেখা যায়, এঁদের মধ্যে অনেকেই ঘুমের ওষুধ না খেয়ে ঘুমোতে পারছেন না। এঁরা কিন্তু রাতে চেরির রস খেতে পারেন।

এছাড়া আমন্ড ও পেস্তার পাশাপাশি আখরোটও মেলাটোনিনের খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং চেরির রসের সঙ্গে আখরোট মিশিয়ে নিয়ম করে খেলে দীর্ঘমেয়াদি উপকার পেতে পারেন।

৩. একগ্লাস দুধের সঙ্গে কাবুলি চানা

দুধ ও কাবুলি চানা, দু’টিই ট্রিপটোফ্যানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং এটি রাতে ঘুমনোর পক্ষে সহায়ক। ট্রিপটোফ্যান আমাদের মস্তিষ্কে গিয়ে সেরাটোনিন ও মেলাটোনিনে পরিণত হয়। এই সেরাটোনিন ও মেলাটোনিন ঘুমোতে সাহায্য করে। তবে মশলাদার রান্নার বদলে কাবুলি চানা অল্প অলিভ অয়েল এবং নুন দিয়ে ওভেনে রোস্ট করে নিতে পারেন (৪২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে ২০ মিনিট)। এর সঙ্গে পাশে রাখুন একগ্লাস গরম দুধ। যাদের গরুর দুধে সমস্যা রয়েছে, তাঁরা সয়াবিনের দুধও খেতে পারেন। একইরকম উপকার পাবেন।

৪. কিউয়ি ফল

কিউয়ি ফল কিছুদিন আগেও আমাদের কাছে ততটা পরিচিত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এর নানা গুণাগুণের জন্য এটি পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও সেরাটোনিন থাকে যা ঘুমের সহায়ক। এছাড়া কিউয়ি ঘুমের সময়কে বাড়ায় ও নিরুপদ্রব, গভীর ঘুমোতে সাহায্য করে। এই ফলের দাম সামান্য বেশি হলেও এই লেখায় উল্লেখিত নানা খাবারের সঙ্গে একেও মাঝে-মাঝে আপনার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।

৫. কুইনোয়া, অ্যাভোকাডো, কুমড়ার বীজ ও পালংশাকের স্যালাড

পুষ্টিকর উপাদান দিয়ে বানানো একবাটি স্যালাডের চেয়ে ভাল খাবার কিন্তু আর কিছুই হতে পারে না! পালংশাক থেকে শুরু করে কুইনোয়া, অ্যাভোকাডো, কুমড়ার বীজ দিয়ে একটি স্যালাড বানিয়ে নিন। এই প্রত্যেকটা উপকরণেই কিন্তু প্রচুর পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা স্বাভাবিক ঘুমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফ্যারেল অ্যালেনের কথায়, “ম্যাগনেসিয়াম মেলাটোনিনের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্লিপ সাইকেলকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।” এছাড়া ম্যাগনেসিয়াম মস্তিষ্কে গামা-অ্যামাইনোবিউটারিক অ্যাসিড (জিএবিএ)-র মাত্রা বৃদ্ধি করে।

রাতে ঘুমের সময় আপনার মাথায় একগাদা চিন্তা যদি ভিড় করে, তাহলে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। গামা-অ্যামাইনোবিউটারিক অ্যাসিড এই ভাবনাচিন্তার ক্ষমতাকে হ্রাস করে এবং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সহায়তা করে। তবে আপনার হাতের কাছে যদি কুমড়ার বীজ না থাকে, তাহলে সূর্যমুখীর বীজ, আমন্ড এবং অন্যান্য ম্যাগনেসিয়াম যুক্ত খাদ্যোপাদান দিয়েও স্যালাড বানিইয়ে নিতে পারেন।

৬. রাতে ভাল করে ঘুমোতে কলা ও পিনাট বাটার

আজ্ঞে হ্যাঁ, কলা এবং পিনাট বাটার, এই দু’টিই কিন্তু ম্যাগনেসিয়ামের অন্যতম প্রধান উৎস। এছাড়া ঘুমের সমস্যার পাশাপাশি আপনার যদি ডায়াবেটিসের সমস্যাও থাকে, তাহলে কলা ও পিনাট বাটার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। রাতে শুতে যাওয়ার আগে কলা ও পিনাট বাটার দিয়ে মিল্কশেক বানিয়ে নিন, বা ব্রাউন ব্রেড, মাল্টিগ্রেন ব্রেডের মধ্যে

পিনাট বাটার ও কলার স্লাইস দিয়ে সুস্বাদু স্যান্ডউইচও বানিয়ে নিতে পারেন। আপনার ছেলে-মেয়ের যদি রাতে ঘুমের সমস্যা হয়, ঘুম অগভীর হয়, তাহলেও ওদের এগুলি বানিয়ে দিতে পারেন।

৭. রাতে ভাল করে ঘুমোতে প্রোটিনযুক্ত খাবার জরুরি

আপনি কি দীর্ঘদিন ধরে রাতে ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুমোতে পারেন না? কিংবা অফিসের কাজের চাপে বা স্ট্রেসে এপাশ-ওপাশ করতে-করতেই কেটে যায় রাত? তাহলে এবার রাতের ডায়েটে মাছ, ডিম, চিজ ইত্যাদি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এতে থাকা এল-অরনিথিন নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড স্ট্রেস দূর করে এবং ঘুমে সাহায্য করে।

৮. হার্বাল চা

ঠিক রাতে ঘুমনোর খানিক আগে এককাপ হার্বাল চা! এই টোটকাতে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আপনার চোখে ঘুম নামতে বাধ্য! ক্যালিফোর্নিয়ার ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশনিস্ট বন্দনা শেঠ জানালেন, “রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে চ্যামোমাইল টি এক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। কারণ এটি শরীরকে ঠান্ডা ও শান্ত করে। এছাড়া এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এপিজেনিনও এক্ষেত্রে সাহায্য করে।” প্যাশনফ্লাওয়ার টি-ও ঘুমের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি উপকারে লাগতে পারে। তাই যাদের ঘুমের সমস্যা অতটাও গুরুতর নয়, তাঁরা এই চা খেতে পারেন। “এই চা মস্তিষ্কে জিএবিএ-র মাত্রা বৃদ্ধি করে, জানালেন শেঠ।

৯. হলুদ দুধ

প্রাচীনকাল থেকে নানা ওষধি গুণের জন্য হলুদকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। হলুদ পেট ঠান্ডা করে। গরম দুধের সঙ্গে হলুদ মেশালে তা ভাল ঘুমের পক্ষেও কার্যকরী। এককাপ দুধ গরম করে তাতে হলুদগুঁড়ো (কাঁচা হলুদ বেটেও দিতে পারেন) দিন, সামান্য কালোমরিচ গুঁড়ো দিন। ডক্টর শেঠের মতে, হলুদে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট কারকিউমিনের আমাদের দেহে শোষণে কালোমরিচ গুঁড়ো সাহায্য করে। এছাড়া হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণও রয়েছে যা শরীরকে সার্বিকভাবে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তবে আপনাদের ইচ্ছে হলে দুধে হলুদের সঙ্গে দারচিনি, জায়ফলের গুঁড়ো এবং মধুও দিতে পারেন, জানালেন ডক্টর শেঠ।

তাহলে এবার রাতে ভাল করে ঘুমোতে হলে এইসমস্ত খাবারগুলো আপনার রাতের খাদ্যতালিকায় রাখুন। দেখবেন, ঘুমও হচ্ছে দ্রুত ও গভীর এবং আপনিও তরতাজা থাকছেন।