রাত যত দীর্ঘই হোক না কেন, ভোর হবেই: আত্মহত্যা কোনও সমাধান নয়

dreamstime_s_122540895
oto 122540895 © Ys1982 | Dreamstime.com

আত্মহত্যার মতো একটা বিষয়ে কখনোই খোলা মনে আলোচনা করা যায় না। জীবন যখন এতটাই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু সহজ মনে হয়, এই রকম মানসিক অবস্থার কথা অনুমান করা খুব একটা সহজ নয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে সমস্ত ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নিজেদের সমস্যার কথা কাউকে বলেন না। তাহলে কি যাঁরা এই ধরনের কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন কিংবা আত্মহত্যা করার কথা ভাবছেন, তাঁদের আমরা কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারি? অবশ্যই পারি। এর জন্য শুধু একটু সংবেদনশীল হতে হবে।

ধৈর্যশীল শ্রোতা

এই রকম ক্ষেত্রে, প্রথমেই তাঁদের মনের অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। তাঁদের উৎসাহ দিন যেন আপনাকে সমস্ত কথা তাঁরা বলতে পারেন। তাঁদের সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনুন। কিন্তু সেই কথার ঠিক-ভুল বিচার করার চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন, যে বিষয়টি তাঁদের কষ্ট দিচ্ছে তার সাথে আপনাকে সহমত হতে হবে কিংবা বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে হবে, এমন কোনও ব্যাপার নেই। আপনি হয়তো পুরোটা বুঝতেও পারবেন না যে অপর ব্যক্তি ঠিক কী বলতে চাইছেন, কিন্তু আপনার উপস্থিতি এবং আপনার সহমর্মিতা সেই ব্যক্তির কাছে অনেক বড় ব্যাপার।

অনেকেই মনে করেন যে, যাঁরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন তাঁদের সামনে আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। তাহলে তিনি সেই কথাবার্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন। কিন্তু এই ধারণা একদমই সঠিক নয়। “আপনি কি আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করছেন?” এই প্রশ্ন করার মধ্যে কোনও ভুল নেই। বরং এর ফলে বুঝতে পারবেন, নিছক ভাবনা আর পরিকল্পনা করার মধ্যে কতটা পার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রশ্নকর্তা বুঝতে পারবেন যে, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঠিক কতটা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন, এবং তাঁদের কতটা সাহায্য প্রয়োজন।

মন ভাল করার উপায়

যদি কোনও ব্যক্তি আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে সেই বিষয়ে তিনি কী ভাবছেন- সেটা জানার চেষ্টা করুন। তাঁদের প্রশ্ন করুন, “আপনার কি আগেও কখনও এই রকম মনে হয়েছে? তখন মন ভালো করার জন্য কী কী কাজ করেছিলেন? এবার যাতে আপনার মন ভালো হয় তার জন্য আপনি কী করেছেন?” চেষ্টা করুন তাঁদের সাথে পার্কে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলার, কিংবা তাঁদের সাথে অন্য কোনও রকম বিনোদনমূলক কাজে যোগদান করার।

তাঁদের আশার আলো দেখান, মনে রাখবেন: প্রত্যেক রাতের পরে ভোর হয়। জীবনের অন্ধকার পর্বেরও অবসান ঘটবে। তাঁদের বোঝাতে হবে যে, ভালো এবং খারাপ- এই দুই ধরনের মুহূর্তের সংমিশ্রণেই গড়ে ওঠে জীবন। খারাপ মুহূর্ত জীবনে বার বার আসে, কখনও কয়েক মিনিটের জন্য, কখনও আবার কয়েক মাস বা বছরের জন্য। তবে

সব সময় মনে রাখতে হবে, সেই খারাপ সময় দীর্ঘ হতে পারে কিন্তু তা অবশ্যই শেষ হবে। ভালো সময় ফিরে আসবেই। হতে পারে আপনার পরিচিত কেউ আগে এই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। সেই ব্যক্তির খারাপ সময় কতটা ভয়ঙ্কর ছিল এবং তিনি সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা কীভাবে করেছেন, সেই কথা বারবার বলুন। তাঁর হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন।

উৎসাহ চাই বর্তমানে

তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রশ্ন করুন, “আপনি আত্মহত্যা করতে কেন ভয় পাচ্ছেন?” এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই ধর্ম, পরিবার বা বন্ধুদের কথা বলেন- যাঁদের কথা ভেবে তিনি আত্মহত্যা করতে পারছেন না। এগুলোই হল, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষার জায়গা। এই বিষয়গুলিই তাঁকে আত্মহত্যা করা থেকে বিরত করতে পারে। তাই এই বিষয়গুলি নিয়ে বেশি করে কথা বলুন।

ভবিষ্যতের পরিবর্তে তাঁদের সাথে বর্তমান নিয়ে কথা বলুন। তাঁদেরও কথা বলতে উৎসাহ দিন। যাঁরা আত্মহত্যা করার কথা ভাবছেন, তাঁদের অনেকেই মনে করেন যে তাঁদের মন এমন কষ্টের খাঁচায় বন্দি হয়ে রয়েছে যার হাত থেকে নিস্তার নেই। তাই ভবিষ্যৎ আরও কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, সেই ভয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়াই তাঁর কাছে শ্রেয় বলে মনে হয়।

যদি আপনার মনে হয়, আপনি তাঁদের সঠিক ভাবে সাহায্য করতে পারছেন না, তাহলে কোনও জিপি কিংবা কাউন্সেলরের সহায়তা নিন। পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্যে এই রকম কঠিন সময় থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তাই আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে পেশাদার কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিন।

এই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে থাকুন, তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠুন। আপনার হার্দিক ব্যবহারও তাঁকে বেঁচে থাকতে উৎসাহ দিতে পারে।