রাসূল (সাঃ)-এর দাওয়াত কি অন্য নবীদের থেকে ভিন্ন ছিল?

dreamstime_s_175617169
Sujud kepada-Nya © Yudhistirama | Dreamstime.com

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাওয়াত কি অন্য নবীদের মতই ছিল নাকি দাওয়াতের মাঝে ভিন্নতা ছিল? নবীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে এই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।

নবী আদম(আঃ)

পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী আদম(আঃ) ইসলামকে অনুসরণ করেছিলেন, আল্লাহর সকল আদেশ নিষেধ মেনে চলেছিলেন এবং নবী হিসেবে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকেও আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এবং পৃথিবী জুড়ে মানব বিস্তারের মধ্য দিয়ে মানুষ এই বার্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল এবং আল্লাহর পরিবর্তে বা তাঁর সাথে অন্য কোনোকিছুর উপাসনা করতে শুরু করেছিল। কেউ কেউ তো সঠিক ধর্মের উপর কোনোরকমে টিকে ছিল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তাওহীদের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক শক্তির পূজা করা শুরু করেছিল। মানুষকে পুনরায় আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করতে আল্লাহ তা’আলা পুনরায় নবীদেরকে পাঠানো শুরু করলেন।

নবী নূহ(আঃ)

এই নবীদের মধ্যে প্রথম ছিলেন নূহ(আঃ)। যিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এমন সময় আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত নিয়ে আসলেন যখন তাদের মধ্যে ধর্মপ্রাণরা আল্লাহর সাথে পূর্বপুরুষদেরও উপাসনা শুরু করেছিল। নূহ(আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে মূর্তি ও পূর্বপুরুষদের উপাসনা ত্যাগ করে এক আল্লাহর উপাসনায় ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে গুটিকয়েক মানুষ নূহ(আঃ) এর শিক্ষা অনুসরণ করেছিলেন, কিন্তু অধিকাংশই তাঁর দাওয়াতকে অস্বীকার করেছিল। যারা নূহ(আঃ) কে অনুসরণ করেছিলেন তারাই ইসলামের অনুসারী বা মুসলমান ছিলেন। আর যারা তা করেনি তারা কাফের হিসেবে গণ্য হয়েছে এবং তাদেরকে দুনিয়াতেই প্লাবনের শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। নূহ(আঃ) দুনিয়াতে প্রথম রাসূল আদম(আঃ) এর দশম অথবা অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ।

নবী হূদ(আঃ)

হূদ(আঃ) দুর্ধর্ষ ও শক্তিশালী আদ জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য নূহ(আঃ)-এর প্লাবনের পরে এরাই সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা শুরু করে। আম্মান থেকে শুরু করে হাজরা মাউত ও ইয়েমেন পর্যন্ত তাদের বসতি ছিল। পবিত্র কুরআনে হূদ(আঃ) ও কওমে আদ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। শামদেশে (বর্তমানে সিরিয়ায়) কওমে ছামুদ এর প্রতি হযরত ছালেহ(আঃ) কে প্রেরণ করা হয়।

নবী ইবরাহীম(আঃ)

একই সময় ইবরাহীম(আঃ) তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে বাবেল শহরে এবং পরে ফিলিস্তিনে হিজরত করেন। অগণিত পরীক্ষা আর চড়াই-উতরাই পার করে ইবরাহীম(আঃ) এর ঈমানের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হলে অশান্ত নমরূদী শাসন ধ্বংস হয়ে শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর পুত্র ইসমাঈল(আঃ) ও ইসহাক(আঃ) মক্কায় ও ফিলিস্তিনে তাওহীদের বাণী ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রসার ঘটান। অবশেষে এখানেই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনের ফলশ্রুতিতে দ্বীনের তাবলিগে বিশ্বকে তাওহীদের আলোয় উদ্ভাসিত করেন।

বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা:

বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামও মাত্র ২৩ বছর মেহনত করে মর্দে মুজাহিদরূপী একদল নিবেদিতপ্রাণ সাহাবী তৈরি করেন। তাদের জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালানোর ফলে গোটাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কসম করে বলেন, ‘ইসলাম সান’আ থেকে হাজরা মাউত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি একজন মহিলা সে সময় এককী পথ চলবে কিন্তু আল্লাহ ব্যতীত সে কাউকে ভয় করবে না।’

মূসা(আঃ)

ফেরাউনের নিকট মূসা(আঃ) দৃঢ়চিত্তে তাওহীদের দাওয়াত দেন। অহংকারী স্বৈরাচারী এই শাসকের হূদয়ে তাতে কোনরূপ রেখাপাত করে না। মূসা(আঃ) ও হারূন(আঃ) এর দাওয়াতী মিশনের একটি বিরাট অংশ সমাপ্ত হয়। শাম ও ইরাক অঞ্চলে আবির্ভুত হয়ে হযরত সুলায়মান(আঃ) হুদহুদ পাখির মাধ্যমে সাবা প্রদেশের রাণী ‘সূর্য পূজারী’ সম্রাজ্ঞী বিলক্বীসকে সূর্য পূজা ছেড়ে তাওহীদের দাওয়াত দিলে সে ঈমান গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়। 

হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম(আঃ)

হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম(আঃ) পূর্ববর্তী তাওরাত ও পরবর্তী রাসূলদের সত্যায়নকারী হিসাবে তাঁর সম্প্রদায়কে দাওয়াত দেন। তিনি বণী ইসরাঈলয়ের সর্বশেষ কিতাবধারী রাসূল। তিনি আল্লাহর পবিত্রতম একক সত্যের বাণী প্রচার করে গেছেন ও কিয়ামতের পূর্বে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসে মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দেবেন বলে সুস্পষ্ট হাদিসে উল্লেখ আছে। এভাবেই যুগে যুগে সকল নবী রাসূলগণ মানুষকে এক আল্লাহর আনুগত্য করার দিকে আহ্বান করেছেন এবং তাদের দাওয়াতের পদ্ধতি মূলত একই ছিল।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যারা আজ নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করছে তারা নতুন কোনো ধর্মের অনুসারী নয়; বরং তারা সমস্ত নবী-রাসূলদের ধর্ম এবং তাদের মৌলিক বার্তার অনুসরণ করে যা আল্লাহর আদেশে মানবতার নিকট প্রেরিত হয়েছিল, যেটি ইসলাম নামে পরিচিত। ‘ইসলাম’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘আল্লাহর কাছে আনুগত্য’, এবং মুসলিম হল তারা যারা সকল নবীদের মৌলিক দাওয়াত আল্লাহর আনুগত্যের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে।