রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে সমালোচনার মুখে ধৈর্যধারণ করতেন

dreamstime_s_194224493

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামকে দ্বীনের দাওয়াত ও দ্বীন কায়েমের পথে কেবল নম্রভাবে সমালোচনা গ্রহণ করার জন্যই নয়, বরং প্রতিউত্তরে ইতিবাচক আচরণ প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

ইহুদি পন্ডিতের সাথে

ইহুদিদের বড় পণ্ডিত যায়েদ ইবনে সুনার কাছ থেকে একদিন নবীজি কিছু গম খরিদ করে বলেছিলেন, “আমি ছয় মাস পর গমের বিনিময়ে তোমাকে এই পরিমাণ খেজুর দিব।” যায়েদ তাতে সম্মত হয় এবং খেজুর প্রদান করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তিনদিন যেতে না যেতেই সে এসে হাজির। এসেই সে বলল, আমার ঋণ পরিশোধ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিনয় দেখুন! তিনি চুক্তির কথা না বলে, আইনের পথে না গিয়ে খুলুকে আজিম তথা মহান চারিত্রিক গুণাবলীতে লজ্জায় মাথা নিচু করে বললেন, “এখন তো আমার কাছে তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। ব্যবস্থা হলে দিব।”

ইহুদি তখন কঠোর আচরণ শুরু করল। নবীজীকে পিতামাতা ও বংশের নাম নিয়ে গালিগালাজ শুরু করল। হযরত উমর(রাযি.) ইহুদির এরূপ অশোভন আচরণ দেখে নিজেকে সামলাতে না পেরে নবীজির কাছে আবেদন করে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন। আমি এই কাফেরের গর্দান উড়িয়ে দিই। আপনার সাথে এমন অসৌজন্যমূলক আচরণ কিছুতেই আমি বরদাস্ত করতে পারছি না।”

কিন্তু বিস্ময়ের কথা হলো, নবীজি ইহুদি পণ্ডিতের উপর রাগ না করে উল্টো উমর(রাযি.) এর প্রতি অসন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ করে তাকে ঋণ পরিশোধ করে দিতে বললেন এবং যায়েদের সাথে খারাপ আচরণের দরুন কিছু বেশি দিতে বললেন। ইহুদি পন্ডিত এ ঘটনার পরে নবীজির আচরণে মুগ্ধ হয়ে তার নবী হওয়ার সত্যতা বুঝতে পেরে ইসলাম কবুল করলেন।

নবীজির স্ত্রী আয়িশা(রাযিঃ) এই চরিত্রকে প্রতিফলিত করেই বলেছেন, “দ্বীনের সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে নবীজি কখনও নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কিন্তু দ্বীনি বিষয় হলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।” (বুখারী)

গণিমতের মাল বন্টন নিয়ে আনসারদের একটি দলের আপত্তি

হুনাইন যুদ্ধ ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে পরিচালিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ, যেখানে গনীমতের মাল সবচেয়ে বেশী অর্জিত হয়। গনিমতের মাল বন্টনের ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিল এক পঞ্চমাংশ বাইতুল মালে জমা করে বাকিটা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বিতরণ করা।

কিন্তু এই যুদ্ধে প্রাপ্ত গণিমত কিছুটা ব্যতিক্রমভাবে বন্টন করেন। কারণ, মক্কার অধিকাংশ নেতা-উপনেতা তখন নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তখন পর্যন্ত তাদের ঈমান পরিপূর্ণ হয়েছিল না। তাই তিনি চিরাচরিত রীতির বিপরীত নতুন মুসলমানদের বেশী দান করলেন। এতে আনসারদের মাঝে কেউ কেউ মনঃক্ষুণ হলেন।

মদীনার কিছু যুবক আনসার বললেন, “রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কোরাইশদের বেশি দিলেন আর আমাদেরকে বঞ্চিত করলেন; অথচ, এখনও পর্যন্ত আমাদের তরবারী থেকে কোরাইশদের রক্ত ঝরছে। বিপদের সময় আমরা আগে এসেছিলাম; আর প্রাপ্ত গণিমত তাদেরকেই বেশি দেওয়া হল।”

বিপথগামীদের হেদায়াত দান

রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কানে এসব কথা পৌঁছালে, তিনি সকল আনসারদেরকে সমবেত করে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। আনসাররাও কথাগুলো স্বীকার করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, “আচ্ছা বলতো! এটা কি সত্য নয় যে, তোমরা প্রথমে বিপথগামী ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের হেদায়েত দান করেছেন? তোমরা বিচ্ছিন্ন ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন? তোমরা নিঃস্ব ও দরিদ্র ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে বিত্তশালী করেছেন?’’

আনসাররা এ কথা শুনে সমস্বরে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল। সত্য।’’ এবার তিনি বললেন, “হ্যাঁ অপরদিকে এটাও সত্য যে, যখন মুহাম্মদের দ্বীনকে সবাই অস্বীকার করেছে, তখন তোমরা আমার দ্বীনকে সত্য বলে মেনেছ। যখন আমাকে আমার দেশবাসী, স্বজাতি পরিত্যাগ করেছিল, আল্লাহর আদেশে তোমরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছ। আমি নিঃস্ব অবস্থায় ছিলাম, তোমরা আমাকে জীবন দিয়ে সাহায্য করেছ’’। আবেগ ভরা কন্ঠে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলে চললেন, “তোমরা কি এতে খুশি নও যে, মক্কার লোকেরা ফিরে যাবে উট, বকরী আর ছাগলের পাল নিয়ে। আর মদীনার আনসাররা সাথে নিয়ে যাবে আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে?”

আনসারগণ একথা শুনে চিৎকার দিয়ে একসাথে বলে উঠলেন, “আল্লাহর কসম, আপনার ফয়সালাই সঠিক, আমরা সম্পদ চাই না, আমরা আল্লাহর রাসুলকে আমাদের সাথে নিয়ে যেতে চাই।’’ এ পরিস্থিতিতে কাঁদতে কাঁদতে অনুশোচনায় আনসারদের দাঁড়ি পর্যন্ত ভিজে গেল।