রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তান-সন্ততি (২য় পর্ব)

পরিবার ০৪ জানু. ২০২১ Contributor

১ম পর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের ২ ছেলে ও ৩ মেয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এসেছে। এই পর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের আরও এক কন্যা ও এক ছেলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলঃ

ফাতিমা

ফাতিমা(রাযিঃ) এর জন্মসাল নিয়ে মতভেদ আছে। অনেক ইতহাসবিদদের মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়তের ১ম বছরে ফাতিমা(রাযিঃ)-এর জন্ম হয়। অর্থাৎ, নবীজির ৪১ বছর বয়সে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আলী(রাযিঃ)-এর সাথে বিবাহ দেন। এই বিয়ে সংঘটিত হয় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। ফাতিমা(রাযিঃ) রাসূলের কাছে তার আপনজনদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন। রাসূল তার ক্ষোভে ক্ষুব্ধ হতেন, তার সন্তোষে সন্তুষ্ট হতেন। হাদিসে এসেছে, ফাতিমা(রাযিঃ)কে বিবাহের পর আলী(রাযিঃ) আবু জাহেলের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ফাতেমা(রাযিঃ) তা শুনে ফেলে নবীজির কাছে এসে বলেন, আপনার সম্প্রদায় মনে করে, আপনার মেয়েদের কিছু হলেও আপনি ক্ষুব্ধ হন না। এদিকে আলী তো আবু জাহেলের মেয়েকে বিবাহ করতে যাচ্ছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শোনামাত্রই দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি আবুল আসের কাছে এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। সে আমাকে কথা দিয়েছে এবং কথা রেখেছে। আর ফাতিমা আমার কলিজার টুকরা। আমি তার কষ্ট অপছন্দ করি। আল্লাহর কসম, আল্লাহর নবীর মেয়ে এবং আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একই ব্যক্তির নিকট একত্র হতে পারে না। এই কথা শোনার পর আলী(রাযিঃ) তার প্রস্তাব বাতিল করেন।

তাঁর মৃত্যু

অন্য বর্ণনায় এসেছে, হিশাম ইবনে মুগীরা তার মেয়েকে আলী(রাযিঃ)-এর কাছে বিয়ে দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু নবীজি বলে দেন যে, অনুমতি দেওয়া হবে না। যদি আবু তালিবের ছেলে চায়, তাহলে আমার মেয়েকে তালাক দিয়ে তার মেয়েকে বিয়ে করুক। কারণ, ফাতিমা আমার কলিজার টুকরা। তার সংশয় আমাকে সংশয়ে ফেলে। তার কষ্ট আমাকে কষ্ট দেয়।

ফাতিমা(রাযিঃ) হলেন এই উম্মতের নারীদের সর্দার। ফাতিমা(রাযিঃ) ইন্তেকাল করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর ছয় মাস পরেই। তিনি তিনটি ছেলে সন্তানের জননী ছিলেন- হাসান, হুসাইন ও মুহসিন। মুহসিন ছোট থাকতেই মারা যান। এবং দুই মেয়ে সন্তানের জননী ছিলেন- উম্মে কুলসুম ও যয়নাব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ফাতিমা(রাযিঃ) ছাড়া অন্য কোনো উত্তরসূরি ছিলো না। তাই রাসূলের সম্মানিত বংশধারার বিস্তার হয়েছে দুই দৌহিত্র হাসান(রাযিঃ) ও হুসাইন(রাযিঃ)-এর মাধ্যমে। ফাতিমা(রাযিঃ)-এর মেয়ে উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেছিলেন উমর(রাযিঃ)। তাদের ঘরে যায়েদ ও রুকাইয়া নামে দুটি সন্তান হয়। তবে তাদের দুজনের কোনো উত্তরসূরি হয় নি।

ইবরাহিম

ইবরাহিম(রাযিঃ) জন্মগ্রহণ করেন ৮ম হিজরির জিলহজ্জ মাসে। তার মাতা হলেন মারিয়া কিবতিয়া(রাযিঃ)। আনাস(রাযিঃ) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো এক রাতে আমার একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হল। আমার পিতৃপুরুষের নামে তার নাম রেখেছিলাম ইবরাহিম।” জন্মের পর নবীজি তাকে উম্মে সাইফ-এর কাছে অর্পণ করলেন; যিনি ছিলেন আবু সাইফ নামক এক কামারের স্ত্রী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই মদিনার উঁচু ভূমিতে যেতেন, যেখানে ইবরাহিম(রাযিঃ)-এর দুধ মাতার বাড়ি। সেখানে গিয়ে ইবরাহিমকে দেখতেন, তাকে আদর করতেন, চুমু দিতেন। অতঃপর ফিরে আসতেন।

আনাস(রাযিঃ) বলেন, নবীজির মতো সন্তানদের প্রতি এতটা দয়ার্দ্র ও মমতাবান আমি আর কাউকে দেখি নি। মদিনার উঁচু এলাকার এক ঘরে ইবরাহিম দুধপান করত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে যেতেন, আমরাও তাঁর সাথে থাকতাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করতেন আর ইবরাহিমের দুধপিতা ছিলেন লোহার কর্মকার হওয়ার দরুণ সেই ঘর তখন ধোঁয়ায় ছেয়ে থাকতো। তিনি ইবরাহিমকে কোলে নিতেন, চুমু দিতেন, তারপর ফিরে আসতেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাকে চুমু দিতেন এবং তার ঘ্রাণ নিতেন।

ইবরাহিমের জীবনসীমা দীর্ঘ হয় নি। তিনি দুধপানের বয়সেই মারা গেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইবরাহিম আমার সন্তান, সে দুধপানের বয়সেই মারা গেছে। তার দুইজন দুধমা আছেন, যারা জান্নাতে তার দুধপানের মেয়াদ পূর্ণ করবে।

এ সংক্রান্ত হাদিস

ইবরাহিম(রাযিঃ)-এর শেষ মুহূর্তগুলোর হাদিসে স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। আনাস(রাযিঃ) বলেন, আমরা ইবরাহিমকে দেখতে গেলাম। এর কিছুক্ষণ পরেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। তাঁর মৃত্যুতে নবীজির দু’চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে লাগল। তা দেখে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ(রাযিঃ) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি কাঁদছেন? তিনি বলেন, ইবনে আউফ, এটা তো দয়া। চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় বিষণ্ন হয়। কিন্তু আমার প্রতিপালক যে কথায় সন্তুষ্ট হন, আমরা সে কথাই বলি। ইবরাহিম, তোমার বিচ্ছেদে আমরা ব্যথিত।

ইব্রাহিমের মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তাই লোকজন বলাবলি করতে লাগল, ইবরাহিমের মৃত্যুর শোকে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। নবীজি একথা শুনে বললেন, চন্দ্রে বা সূর্যে কারোও মৃত্যুর কারণে গ্রহণ লাগে না। কারো বেঁচে থাকার কারণেও লাগে না। তোমরা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ দেখলে নাম সালাত আদায় করো এবং দু’আ করো।

 

(সমাপ্ত)