রিজিক যার জন্যে যতটুকু নির্ধারিত সে ততটুকুই পাবে

dreamstime_s_70907325

দ্বিতীয় পর্ব

আগের পড়বে আমরা আলোচনা করেছি সম্পদের সচ্ছলতা সম্পর্কে কী বলেছেন মহানবী (সাঃ)? এই পর্বে আমরা দেখবো অল্পে তুষ্টির বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস তো আরও প্রাণবন্ত।

তিনি বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন নিজ বাড়িতে নিরাপদে সুস্থ শরীরে সকাল অতিবাহিত করে এবং তার কাছে সেদিনকার মত খাদ্য থাকে, তবে তাকে তো যেন পুরো দুনিয়াটাই একত্রিত করে দেয়া হয়েছে।” (জামে তিরমিযী)

নিরাপদ আবাস, সুস্থ শরীর আর পুরো দিনের খাদ্য মজুদ। তাহলে আর কী চাই? শৈশব থেকেই যেসকল সাহাবী ইসলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সোহবত লাভে ধন্য হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রাযিঃ)। ইসলামের শিক্ষাকে আত্মস্থ করে তিনি বলেছিলেন, “সকালে উপনীত হওয়ার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার অপেক্ষা করবে না আর সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের অপেক্ষা করবে না।” (বুখারী)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের দিকে লক্ষ করুন। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা(রাযিঃ) বর্ণনা করেছেন কেমন ছিল তাঁর সংসারজীবন এবং জীবন ও জীবিকার রূপ- “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন অথচ জীবনের একটি দিনেও জয়তুনের তেল দিয়েও দু’বেলা পেট ভরে রুটি খাননি।” (মুসলিম)

তাহলে কি এতটুকু সম্পদ থাকলেই উপার্জন করা ছেড়ে দিতে হবে? না, সেটাও নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম তো এমনও বলেছেন, তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে অসহায়, মানুষের দুয়ারে ভিক্ষারত অবস্থায় রেখে যাওয়ার চাইতে ধনী অবস্থায় রেখে যাওয়া ভালো।” (বুখারী)

বোঝা যাচ্ছে, সন্তানকে ভিখারিবেশে রেখে যাওয়ার চেয়ে বিত্তবানরূপে রেখে যাওয়া ভালো। তাই যদি হয়, তাহলে তো উপার্জনও করতে হবে এবং সেটাও দিন এনে দিন খাওয়ার মতো নয়, আরও বেশি। বাহ্যত এ সংঘাত নিরসনের জন্য আরেকটি হাদীস উল্লেখ করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হে লোকসকল, আল্লাহকে ভয় করো আর রিজিক অন্বেষণে সহজতা অবলম্বন করো। কারণ কেউ তার জন্য নির্ধারিত রিজিক পূর্ণরূপে গ্রহণ করার পূর্বে কিছুতেই মৃত্যুবরণ করবে না। তাই আল্লাহকে ভয় করো এবং জীবিকা অন্বেষণে সহজতা অবলম্বন করো। যা কিছু হালাল তা গ্রহণ করো এবং যা কিছু হারাম তা বর্জন করো।” (ইবনে মাজাহ)

জীবিকা উপার্জন, আয়রোজগার, অল্পেতুষ্টি ইত্যাদি সকল বিষয়ে এ হাদীসটিকে আমরা মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। হাদীসের নির্দেশনা স্পষ্ট। আল্লাহর পক্ষ থেকে যার জন্য যতটুকু রিজিক নির্ধারণ করা আছে সে তা পাবেই। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাগিদ ও দৃঢ়তার সঙ্গেই  বলেছেন, নির্ধারিত এ রিজিক পূর্ণরূপে গ্রহণ করার আগে কারও কাছেই মৃত্যু উপস্থিত হবে না। এটাই আল্লাহর ফয়সালা।

সুতরাং, আমাদের কর্তব্য সাধ্যমতো সেই জীবিকার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এ চেষ্টা করার আদেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, “সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো, যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (আল কুরআন-৬২:১০)

অর্থাৎ চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে। নির্ধারিত রিজিক যথাসময়ে আসবে-এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, রিজিক যার জন্যে যতটুকু নির্ধারিত সে ততটুকুই পাবে। কিন্তু তাই বলে বসে থাকা যাবে না। সাধ্যানুপাতে চেষ্টা করতে হবে। সে চেষ্টার রূপ কেমন হবে সেটিই উপরের হাদীসটিতে নির্দেশিত হয়েছে-  “জীবিকার অন্বেষণে সহজতা অবলম্বন করো।”

সুতরাং, নিজের জন্য, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততির জন্য, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য উপার্জন করে যেতে হবে। তবে সেটা অবশ্যই হালাল পন্থায়, বৈধ উপায়ে। অবৈধ ও হারাম উপার্জনের যাবতীয় আহ্বানকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এটাই অল্পেতুষ্টি। এ গুণে যে গুণী হবে, দরিদ্রতার মাঝে থেকেও সে পাবে সম্পদশালীর স্বাদ। অন্যের সম্পদ দেখে কখনও তার হিংসা না। আর যদি সে সচ্ছল হয় তাহলে তার সচ্ছলতা ও ক্ষমতায় ভর করে অন্যের দিকে যুলুমের হাতও সে বাড়িয়ে দেবে না। মোটকথা, সম্পদ বৃদ্ধির সকল অন্যায় পন্থাকেই সে এড়িয়ে চলবে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে বলেছেন, “সেই সফল, যে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে, প্রয়োজন পরিমাণ রিজিক পেয়েছে আর আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা দিয়েই সে তৃপ্ত রয়েছে।” (মুসলিম)

অল্পে তুষ্ট থেকে কেউ যদি এরূপ সফল হতে চায়, তবে প্রয়োজন আল্লাহ পাকের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থা রাখা, প্রয়োজন দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের স্মরণ। এ গুণ অর্জন করতে পারলে শুধু দুনিয়ার জীবনেই নয়, আখিরাতের অনন্ত অসীম জীবনেও সফলতা তার পদচুম্বন করবে। আর এরূপ অল্পে তুষ্ট ব্যক্তিই প্রকৃতপক্ষে ধনী।

সমাপ্ত