রোজার আগে সেহরি: শরীর ঠিক রাখতে থাকুক স্বাস্থ্যকর খাবার

খাবার Contributor
মতামত
রোজার আগে সেহরি

রোজার আগে সেহরি-তে কী খাওয়া উচিত ও কী খেলে শরীর সুস্থ থাকবে, সেই নিয়ে আপনাদের প্রত্যেকেরই মনে প্রশ্ন থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে এসেছে পবিত্র রমযান মাস। এই মাসে রোজা রাখা প্রতিটি মুসলিমের ফরজ। সেহরি ও ইফতার করবেন বলে এইসময় সকলেই বাড়িতে ভাল-মন্দ মিষ্টি, নোনতা ইত্যাদি খাবার মজুদ রাখছেন। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে করোনা পরিস্থিতিতে সুস্থ থাকাটা অবশ্য কর্তব্য। তাই ডাক্তাররা বারবার সেহরি ও ইফতারের সময় পুষ্টিযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

রমযানের উপবাস আল্লাহ তা’আলার জন্য

যদিও আমরা রোজা শেষে ইফতার করে আমাদের পবিত্র ধর্মের ঐতিহ্যকেই বজায় রাখতে চাই, কিন্তু রমযানের উপবাসের আসল অর্থ কী, সেটি প্রত্যেকেরই জেনে রাখা প্রয়োজন। বছরের ১২টি মাসের মধ্যে রমযান ছাড়া প্রত্যেকটি মাসই আল্লাহ তা’আলা আমাদের খানাপিনা বা আনন্দ করার জন্য রেখেছেন। কেবল এই একটি মাসই তিনি তাঁর জন্য (আদতে আমাদের উপকারের জন্যই) আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছেন।

এই মাসে আল্লাহ আমাদের শুধু খাদ্য এবং পানীয় থেকেই দূরে থাকতে বলেন না, জাগতিক সমস্ত চাহিদা, কামনা, বাসনা থেকেও দূরে থাকতে বলেন (দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়েই)। তিনি আমাদের ইবাদত বৃদ্ধি করতে উপদেশ দেন এবং অনুশীলন ইত্যাদি বিষয়গুলির মাধ্যমে তাঁর আরও নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ করে দেন। রোজার সময় দিনের গোটা অংশ জুড়েই আমাদের পরিপাকতন্ত্র নানারকম ক্ষতির হাত থেকে সেরে ওঠে, আরও ভাল করে কাজ করার অবকাশ পায়। তারপর আবার ইফতারের সময় ভাজাভুজি, মিষ্টি, কোল্ডড্রিংক্স ইত্যাদিতে পেট ভরে ওঠে, ফলে আবার যে-কে-সেই অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়! মহাশক্তিমান আল্লাহ কি দিনের শেষে আমাদের কাছ থেকে এটাই চান? নিশ্চয়ই না! তাই এবারের রমযান শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকভাবে পালন না করে শারীরিক সুস্থ থাকারও প্রতিজ্ঞা করুন। দেখবেন, তা সারাবছরের জন্য আপনার সুস্থ থাকার পাথেয় যোগাবে।

রোজার আগে সেহরি-কে গুরুত্ব দিন

অনেকেই ইফতারের খাবারকে বেশিমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অনেকে আবার রাতেও অনেকসময় ধরে খান। এর ফলে প্রায়শই সুহুর বা সেহরিকে অবহেলা করা হয়, বা ইফতারের বাঁচিয়ে রাখা খাবার থেকেই সেহরি করে ফেলা হয়! সুন্নাহতে বলা রয়েছে যে, প্রফেট মুহম্মদের পরামর্শ অনুযায়ী, “যে রোজা রাখতে চাইবে, তাকে সেহরি খেতে দাও।” (আল-বুখারি, মুসলিম)।

ফলে সেহরিকে কখনওই অবহেলা করবেন না বা সেসময় আপনার খিদে পায়নি বা অত সকালে খান না বলে এড়িয়ে যাবেন না। এটি করলে কিন্তু সারাদিন রোজা রাখার পর আপনার শরীর অচিরেই খারাপ হয়ে যাবে।

সেহরি করার কী উপকারিতা, সেই নিয়ে পবিত্র হাদিসে বিশদ বিবরণ রয়েছে। এই উপকারিতা আধ্যাত্মিক, শারীরিক সব দিক থেকেই। সেহরী খাওয়া যে উত্তম তা প্রকাশ করার জন্য মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উম্মতকে বিভিন্ন কথার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি সেহরীকে বর্কতময় খাদ্য বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘তোমরা সেহরী খাও। কারণ, সেহরীতে বর্কত আছে।’’ ‘‘তোমরা সেহরী খেতে অভ্যাসী হও। কারণ, সেহরীই হল বর্কতময় খাদ্য।’’(আল-বুখারি, মুসলিম)।

ইবাদতের অংশ হিসেবে প্রতিদিন আপনার রোজা স্বাস্থ্যকর সেহরির মাধ্যমে শুরু করুন। তাহলেই আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি আপনি শারীরিকভাবেও সুস্থ থাকতে পারবেন। পরিবারের সঙ্গে কীভাবে রমযান ও রোজা পালন করবেন, তার কিছু টিপস এই আলোচনায় আমরা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সমস্ত খাবারই খান, কিন্তু সেগুলি পরিমাণ মেপে খান, তাহলেই ভাল থাকবেন।

সুস্থ থাকার জন্য রোজার আগে সেহরি-র জন্য টিপস-

নীচের বিষয়গুলি এড়িয়ে চলুন:

  • বাক্সে প্যাকেট করা সিরিয়াল বা দানাশস্য এড়িয়ে চলুন। কারণ এগুলির মধ্যে বেশিরভাগ সময়েই রিফাইনড সুগার থাকে। ডায়াবেটিস থাকলে এগুলি ক্ষতিকর তো বটেই, তাছাড়া এমনিতেও শরীরের জন্য রিফাইনড সুগার খারাপ। এছাড়া এগুলি খেলে জলদি খিদে পায়।
  • ইফতারের বেঁচে যাওয়া খাবার সেহরিতে এড়িয়ে চলুন। কারণ ইফতারের খাবার সাধারণত ভাজাভুজি, ডিপ ফ্রায়েড বা খুব বেশি মিষ্টিযুক্ত হয়। এতে কোনও পুষ্টিও থাকে না, আর ভোরবেলা এগুলি খেলে সারাদিন খিদে পায়।
  • কোল্ডড্রিংক্স জাতীয় কার্বোনেটেড পানীয় ও প্যাকেটবন্দি ফ্রুট জুস এইসময় না খাওয়াই ভাল। কারণ এইসমস্ত পানীয়তে থাকা চিনি সহজেই শরীরে শোষিত হয়ে যায়, ফলে দেহে সুগারের মাত্রার আচমকা তারতম্য দেখা যায়। এর ফলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ে।
  • গ্লুটেনযুক্ত আটার রুটি, রোল, পেস্ট্রি, মাফিন, স্কোন, রুটি, পরোটা, চাপাটি ইত্যাদি আটারই হোক কি ময়দারই হোক, সেগুলো সবই পরিপাকের পর উচ্চমাত্রায় শর্করার উদ্ভব হয়। এতে আপনার প্রাথমিকভাবে পেট ভর্তি লাগলেও শর্করা কিন্তু সহজেই হজম হয়ে যায়। ফলে কিছুক্ষণ পরেই খিদে পেয়ে যাবে।

নিম্নলিখিত খাবারগুলি সেহরিতে রাখতে পারেন:

  • ডিম। ডিম দারুণ পুষ্টিকর একটি খাবার এবং একে নানাভাবে রান্না করা যায়। সিদ্ধ থেকে শুরু করে পোঁচ ছাড়াও সকলের পছন্দ অনুযায়ী মাশরুম, টমেটো, ক্যাপসিকাম, হার্বস দিয়ে অমলেট বানিয়ে নিতে পারেন।
  • পাউরুটির মধ্যে মাংস দিয়ে স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিতে পারেন। এছাড়া বান বা র‍্যাপসের মধ্যে মাংসের পুর দিয়ে খেতে পারেন। এর জন্যে চিকেন, বিফ, ভেড়ার মেটে, কিডনি, হার্ট কাজে লাগাতে পারেন।
  • গ্রিক ইয়োগার্ট, ফুল ক্রিম ইয়োগার্ট, নারকেলের দুধ বা এমনি দুধ দিয়ে নাট অ্যান্ড সিড গ্র্যানোলা খেতে পারেন। এতে ফ্যাট, প্রোটিন, ফাইবার ইত্যাদি ঠিকঠাক পরিমাণে থাকে, যা দীর্ঘক্ষণ আপনার পেট ভর্তি রাখতে সাহায্য করে।
  • অ্যাভোকাডো, পিয়ার, কলা, বেরিজাতীয় টাটকা ফল খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। এগুলিকে হয় স্যালাড বানিয়ে খান, নয়তো স্মুদি বানিয়েও খেতে পারেন।
  •  নারকেলের দুধ, চিয়া সিড, সানফ্লাওয়ার সিড, কুমড়ার বীজ, প্রোটিন পাওডার, পিনাট বাটার ও টাটকা ফল দিয়ে স্মুদি বানিয়ে নিন। তবে স্মুদি বানালে রিফাইনড সুগারের বদলে মধু দিতে পারেন। এছাড়া খেজুর, ডেট সিরাপ, মেপল সিরাপও দিতে পারেন।
  • যদি গরম কিছু খেতে ইচ্ছে করে, তাহলে ওটস নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করে খেতে পারেন। এর মধ্যে দারচিনির গুঁড়ো বা পাম্পকিন স্পাইস দিয়ে খেতেও মুখরোচক হবে।
  • যাদের গ্লুটেন সহ্য হয় না, তাঁরা বাড়িতেই পাউরুটি বেক করে নিতে পারেন। এইসমস্ত ঘরে তৈরি পাউরুটিতে কার্বোহাইড্রেট ও চিনির পরিমাণ যেমন কম থাকে, তেমনই নিউট্রিয়েন্টসেও ভরপুর থাকে। পাউরুটি বানানোর সময় মাল্টিগ্রেন আটা ব্যবহার করতে পারেন, এবং ওর মধ্যে বাদাম, সিডস, ডিম ইত্যাদিও দিতে পারেন। এগুলি আপনার পেটকে বেশিক্ষণ ভর্তি রাখতেও সাহায্য করবে।

তাহলে এবার রোজার আগে সেহরিকে গুরুত্ব দিন আর পুষ্টিকর খাবার ডায়েটে রাখুন। তাহলেই রমযানে সুস্থ থাকবেন, করোনাকেও দূরে রাখতে পারবেন।