রোজা বা সিয়ামে অপারগ? এই ৫ উপায়ে রমজানকে পূর্ণতা দিন

Tarawih refleksi diri © Leo Lintang | Dreamstime.com

আপনি কি রমজান মাসে ওজরবশত ইবাদাত করতে বা সিয়াম পালন করতে পারছেন না? এমন অনেক মানুষ আছেন যারা কোনো শরয়ী ওজরবশত রমজান মাসেও রোজা রাখতে পারছেন না বা এই বরকতময় মাসেও দ্বীনের সকল দায়িত্ব পুরোপুরি ভাবে আদায় করতে পারছেন না।

হতে পারে তিনি এমন একজন রোগী যিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন অথবা হতে পারে তিনি সেই বোন যিনি কোনো সন্তান জন্ম দিয়েছেন এবং এই কারণে রোজা রাখতে অপারগ। আবার এমনও হতে পারে তিনি সেই বোন যার মাসিক চলার কারণে তিনি রমজান মাসের কিছু সময় ব্যাপি রোজা রাখতে অপারগ।

এমনও অনেক মানুষ আছেন যারা পেশাগতভাবে ডাক্তার বা সার্জন এবং অনেক লম্বা সময় ব্যাপি তাদেরকে সেবা দিয়ে যেতে হয়, যে কারণে তারা তারাবিহ ও তাহাজ্জুদের মত বরকতময় সালাত থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। তাহলে যারা এই ধরনের অবস্থার মধ্যে আছেন তাঁরা কি করবেন? এখানে এমন ৫টি উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো যার মাধ্যমে অনেক প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও আমরা রমজান মাসকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে পারি।

১। আপনাকে বুঝতে হবে, আপনার আগ্রহ আল্লাহর কাছে মুল্য রাখে

সহীহ মুসলিম শরীফে একটি বিখ্যাত হাদিস আছে যেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবয়ব বা সম্পদ দেখেন না, বরং আল্লাহ তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন”। এর অর্থ হলো, আপনি যদি (শরয়ী সমর্থিত) প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে রাত জেগে সালাত আদায় করতে বা সিয়াম পালন করতে না পারেন, তাহলে আপনার অন্তরে উপস্থিত আগ্রহের কারণেও আপনি আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ পুরস্কার পেতে পারেন। আপনার অন্তরের জাগ্রত হওয়া এই অনুভূতি যে, আমি কিছুই করতে পারছিনা, এটির কারণেই আল্লাহর তরফ থেকে আপনি কোনো একটি আমল না করতে পেরেও সেই আমলের পুরোপুরি পুরস্কার পেতে পারেন, যদিও এটি আপনার বোধগম্য না হয়।

মাসিক চলা অবস্থায় বা প্রসবের পর রক্ত ক্ষরণের জন্য বোনেরা সালাত বা সিয়াম ইত্যাদির ব্যাপারে যে অপারগ হয়ে যান, এতে আপনিও নিঃসন্দেহে এই সওয়াবের ভাগি হবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ কুরআনে বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করে সেই বিজয়ী হয়”। (আল কুরআন-২৪:৫২)

সুতরাং শরয়ী ওজরবশত নামাজ না পড়ে, রোজা না রেখে এবং কুরআন না পড়েও আপনি আল্লাহর ইবাদত করছেন কারণ আপনি আপনার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁর আদেশ ও রাসূলের আদেশ মানছেন। অতএব, কখনই এটা মনে করবেন না যে, আল্লাহ আপনাকে সুযোগ দিচ্ছেন না। আসলে, আপনি যেই অবস্থাতেই থাকেন না কেন আপনাকে পুরষ্কার দেওয়া হচ্ছে। একজন আলেম বলেছেন, “সাধারণ অবস্থায় একজন বোনের সালাত, সাওম ইত্যাদি যেমন ইবাদত তেমনি মাসিকের সময় তাঁর সালাত, সাওম ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও ইবাদত। তাঁর সবই ইবাদত।

২। অনেক বেশি বেশি দু’আ করুন

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দু’আ স্বয়ং ইবাদত”। (আবু দাউদ)

এবং আল্লাহ বলেছেন, “আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব”। (আল কুরআন-৪০:৬০)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, “রমজানের প্রতি দিন এবং প্রতি রাতে প্রত্যেক মুসলমানের একটি দু’আ কবুল করা হয়”। (আল বাযযার – শাইখ আলবানীর তাহকীককৃত)

দু’আ করতে তো কোনো ক্ষতি নেই। বরং প্রকৃতপক্ষে দু’আ এমন আশ্চর্যজনক একটি ইবাদত যা যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় এবং যেকোনো জায়গায় করা যায়। এই কারণে অনেক বেশি বেশি দু’আ করতে থাকুন। আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থণা করতে থাকলে আর কোনো কিছুর প্রয়োজন আপনার হবে না। এমনকি যদি আপনি হাসপাতালের বিছানায়ও রুগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকেন তবে আপনি তাঁর কাছে দু’আ করতে থাকেন এবং তিনি আপনার দু’আই অবশ্যই সাড়া দেবেন।

৩। আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করতে থাকুন (যিকির) 

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে উত্তম আমলের কথা বলব না, যেটি তোমাদের রবের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়, যেটি অন্য সকল আমল থেকে (মীযানের পাল্লায়) বেশি ভারি এবং আল্লাহর রাস্তায় সোনা,রূপা দান করার চাইতেও বেশি উত্তম? সাহাবীরা বললেন, “অবশ্যই বলুন, ইয়া রাসুলাল্লাহ!” নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেলেন, “আল্লাহকে স্মরণ করা (অর্থাৎ যিকির করা)” – (তিরমীযী)

আল্লাহ আপনার জন্য যে সৎকর্মের দ্বার উন্মুক্ত করে রেখেছেন, তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করুন। এর পদ্ধতি হলো আপনি যে অবস্থায় থাকুন না কেন সর্বদাই তাঁকে স্মরণ(যিকির) করুন।

বিখ্যাত হানাফী ফকীহ, ইবনে আবিদীন বলেন, “একজন ঋতুস্রাবগ্রস্ত মহিলা প্রত্যেক সালাতের সময় ওযু করে, সাধারণত তাঁর সালাতে যতক্ষণ সময় লাগে ততক্ষণ সময় ব্যাপি প্রাত্যাহিক সালাতের স্থানে বসে যিকির (আল্লাহর স্মরণ) করতে থাকবে, যাতে তাঁর প্রাত্যাহিক সালাতের যে অভ্যাস সেটা যেন বাকি থাকে।”

৪। রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা

আল্লাহ কুরআনে বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর উপর সালাত ও সালাম প্রেরণ করেন, তাই হে ইমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করো।” (আল কুরআন ৩৩:৫৬)

একমাত্র নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ প্রেরণ ব্যতীত অন্য কোনো কাজ সম্পর্কেই আল্লাহ এই কথা বলেননি যে, আমি এটা করি, ফেরেশতারাও এটা করে, তাই মুমিনরা তোমারাও এটা করো!

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ প্রেরণকে নিজের অভ্যাস বানিয়ে নিন। শুধু এতটুকুই বলুন যে, “সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম” অথবা “আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা মুহাম্মাদ”। এটিই নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি প্রেরিত দরূদ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে দরূদ প্রেরকের জন্য অসংখ্য পুরষ্কারের ওয়াদাও রয়েছে।

৫। দরিদ্র মানুষদের প্রতি দান সদকার হাতকে প্রশস্ত করুন

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “রমজানে মাসের দানই শ্রেষ্ঠ দান”। তিনি আরও বলেছেন, “দান করা ঈমানের প্রমাণ এবং দান জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে”। ইবাদাত অথবা সিয়াম পালনে অক্ষম হয়েও আপনি নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারেন!

আমি আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে, এই রমজানই হোক এই নিবন্ধটির সমস্ত পাঠকদের জন্য সেরা রমজান। আমি আরও আশা করি যে, আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে নিবন্ধটি লিখেছি যেটি বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য অনেক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সফল ও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য এমন রমজানের জন্য দোয়া করি।