রোযায় পাঁচ উপকারিতা পেতে ইফতারে ইসবগুলের ভুসি

স্বাস্থ্যকর খাদ্য ০৪ মে ২০২১ Contributor
ফিচার
ইফতারে ইসবগুলের ভুসি
Photo : Dreamstime

ইফতারে ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার কথা শুনে আপনারা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ইসবগুলের ভুসি খেতে বলা হয়। কিন্তু জানেন কি, সারাদিন রোযা রাখার পর যদি আপনার ইফতারে ইসবগুলের ভুসি রাখেন, তাহলে দুর্দান্ত কিছু উপকারিতা পেতে পারেন। আজ সেই নিয়ে আলোচনা করব।

ইফতারে ইসবগুলের ভুসি কেন খাবেন?

ইসবগুলের ভুসি বা সিলিয়াম হাস্ক হল একধরনের দ্রবণীয় ডায়েটারি ফাইবার। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার শুষ্ক, শীতল জলবায়ু যুক্ত এলাকা, ভারত, পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই ইসবগুলের গাছ বা প্ল্যান্টাগো ওভাটা দেখতে পাওয়া যায়। এই গাছে প্রায় ৩০% অদ্রবণীয় এবং ৭০% দ্রবণীয় ফাইবার থাকে। যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসবগুলের ভুসি উৎপাদন করা হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম ইসবগুলের ভুসিতে ৭৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৩০ গ্রাম শর্করা থাকে। এছাড়া পটাশিয়াম, সোডিয়াম, আয়রন ইত্যাদি খনিজ উপাদানও এতে যথেষ্ট পরিমাণে থাকে।

১. কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ইফতারে ইসবগুলের ভুসি

দীর্ঘ একমাস ধরে রোযা রাখার পর ইফতারে ভাজাভুজি, তেল-মশলাদার খাবার খেলে অনেকেরই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা যায়। ইসবগুলের ভুসিতে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে এবং শরীরে পানি ধরে রাখতে ও পানি শোষণে এটি কার্যকরী। পরিপাকের সময় পেরিস্টলসিস প্রক্রিয়াতেও এটি সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্যের কোনওরকম অসুবিধায় নিয়ম করে ইসবগুলের ভুসি খান। দেখবেন সহজে মল নিঃসরণ হচ্ছে। এছাড়া রমযানে খাওয়ায় অনিয়মের ফলে ডায়েরিয়া, পেটখারাপ ইত্যাদি হলে, তাহলে সেগুলি থেকে মুক্তি পেতেও ইসবগুল খেতে পারেন। যাদের অ্যাসিডিটির প্রবণতা থাকে, ইসবগুলের ভুসি তাঁদের পেটের মধ্যে একটি রক্ষাকারী আস্তরণ তৈরি করে, এবং অ্যাসিডভাব দূর করে।

২. উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে

যাদের কোলেস্টেরল রয়েছে তাঁদের খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিষেধাজ্ঞা থাকে। ইসবগুলের ভুসির হাইপোকোলেস্টেরলেমিক প্রভাবের ফলে এটি দেহে খারাপ কোলেস্টেরল ভাঙতে সহায়তা করে ও রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে। ইসবগুল ফ্যাট এবং পিত্তরসে থাকা অ্যাসিডের মিশ্রণ ঘটিয়ে তাদের দেহ থেকে নিঃসরণে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়ার সময় পিত্তরস শরীর থেকে বের হয়ে যায়, তখন আমাদের যকৃৎ বাড়তি কোলেস্টেরলের সাহায্যে সমপরিমাণ পিত্তরস উৎপাদন করে। এভাবেই কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ছ’সপ্তাহ ধরে নিয়ম করে প্রতিদিন ৬ গ্রাম ইসবগুলের ভুসি খেলে তাৎপর্যপূর্ণভাবে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সক্ষম। এছাড়া ইসবগুল শরীরে ভাল কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধির পক্ষেও সহায়ক। অনেকসময় দেখা যায়, চেষ্টা করেও আপনি হয়তো ইফতারে ভাজাভুজি খাওয়াটা কমাতে পারলেন না। সেক্ষেত্রে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাই ইফতারে ভাজাভুজি, তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার পাশাপাশি ইসবগুলের ভুসি খান। উপকার পাবেন।

৩. ডায়াবেটিসে ইসবগুলের ভুসি

একই কথা প্রযোজ্য ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রেও। এঁদের খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রচুর নিষেধাজ্ঞা থাকে। রোযা রাখার পর ইফতারে কার্বোহাইড্রেট, মিষ্টি বা বিশেষ করে উচ্চ গাইসিমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার খাওয়া হয়ে যায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা বেড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে। ইসবগুলের ভুসি কিন্তু এক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এটি রক্তে গ্লুকোজের শোষণ হ্রাস করে এবং মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে। এছাড়া মেটফরমিনের মতো অ্যান্টি-ডায়াবেটিক ওষুধের শোষণেও ইসবগুল কার্যকরী। তাই আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে ইফতার করার পর ইসবগুল খেয়ে নিতে পারেন।

৪. ওজন কমাতে ইফতারে ইসবগুলের ভুসি

রমযান মাসে বাড়তি ওজন কমিয়ে ফেলতে চাইলে ইসবগুলের ভুসিকে রাখতে পারেন। এতে থাকা ফাইবার পেটে গিয়ে সান্দ্র তরল তৈরি করে, ফলে পেট অনেকক্ষণ ভর্তি রয়েছে মনে হয়। এছাড়া এটি পেট বেশিক্ষণ ভর্তি রাখে, ফলে ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ সার্বিকভাবে হ্রাস পায়। যদি মনে করেন ইফতারে একগাদা খাবেন না, তাহলে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করার পর একগ্লাস ইসবগুলের ভুসি মিশ্রিত জল খেয়ে নিন। পেট ভর্তি লাগবে। এছাড়া পেট ভর্তি রাখার জন্য সেহরির সময়তেও আপনি অনায়াসে ইসবগুল খেতে পারেন।

৫. হৃদরোগের সমস্যায় ইসবগুল

কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলেই হৃদরোগের সমস্যাও থাকবে। তাই সেদিকে বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ)-এর মতে, ডায়েটারি ফাইবার কোলেস্টেরল, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ওবেসিটির সম্ভাবনা কমায়। ইসবগুলের ভুসিতে থাকা জলে দ্রবণীয় ফাইবার রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। ফলে রোযার সময় সুস্থ থাকতে ইসবগুলের ভুসি খান ইফতারে।

কীভাবে ইসবগুলের ভুসি খাবেন?

ইসবগুলের ভুসি আপনি উষ্ণ দুধে গুলে খেতে পারেন। তবে সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হল জলে গুলে খেয়ে নেওয়া। এটি ইফতারে তো বটেই, এমনকী সেহরির সময়তেও সারাদিন পেট ভর্তি রাখতে খেতে পারেন।

সতর্ক থাকুন

তবে অনেকেরই ইসবগুল খেলে অ্যালার্জি হয়, শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা যায়। তাঁদের ক্ষেত্রে ইসবগুলের ভুসি যে-কোনও সময়েই এড়িয়ে চলা ভাল। উপকার পাবেন বলে অযথা একগাদা ইসবগুল খেয়ে ফেললে পেটের গোলমাল বা গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ইসবগুল খেলে পরিমাপ অনুযায়ী খান। পানি ছাড়া শুধু ইসবগুল একেবারেই খাবেন না। যথেষ্ট পরিমাণ পানি মিশিয়ে তবেই ইসবগুলের ভুসি খান। নয়তো গলায় আটকে গিয়ে বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।

তাহলে এবার থেকে রমযানের বাকি দিনগুলিতে সুস্থ থাকতে ইসবগুলের ভুসি খান ইফতারে নিয়ম করে। দেখবেন রোযা রেখেও সুস্থ থাকছেন।