লেখালিখি: সৃজনশীলতা ও মানসিক শান্তির অপর নাম

শিক্ষা Contributor
ফোকাস
লেখালিখি

মানুষ যা ভাবে তা অনেকসময়ই মুখে প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু একটুকরো কাগজ ও কলমের সাহায্যে লেখালিখি করলে সেই না বলা কথাগুলোই হয়ে ওঠে তার মনের খতিয়ান। একটা ঘটনার মাধ্যমে খুব সহজেই এই বিষয়টি বোঝানো যায়।

আলিয়ার লেখালিখি না করার অভ্যেস

আমার বন্ধু আলিয়া যখন আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিল তখনই তাকে দেখে বুঝেছিলাম সে খুব ক্লান্ত ও উত্তেজিত। কথা বলতে বলতে তার উত্তেজনা উত্তরোত্তর বাড়ছিল, চঞ্চল হয়ে উঠছিল সে। আমি কিন্তু শান্ত ভাবে অপেক্ষা করছিলাম। আমি জানি, সাধারণত এই মুহূর্তে মানুষকে বলতে দিতে হয়। আমি অপেক্ষা করছিলাম সেই মুহুর্তের জন্য যখন আলিয়া শান্ত হবে একটু, তখন আমি তাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব। যে প্রশ্নের উত্তরও কিন্তু আমি জানি।

প্রায় মিনিট দশেক নিজের কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের সমস্যার কথা বলার পর সে যখন একটু থামল আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ তুমি কি এই সমস্যাগুলো নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছ?’

যথারীতি, সে করেনি। আমি জানতাম এই উত্তরই সে দেবে। না লিখার কারণ হিসাবে সে যেগুলো বলল তার মধ্যে অন্যতম হল, সে সময় পায়নি একেবারেই।

আমরা অনেকেই মনে করি আমাদের সময় খুব কম। জীবন যুদ্ধে লড়াই করতে করতে নিজের জন্য সময় বার করাই মুশকিল হয়ে যায় আমাদের অনেকের কাছে। আর এই সময় নিয়েই আল্লা’তালা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন…

‘সময়ের কসম, নিশ্চয় সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত, তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ [কুরআন অধ্যায় ১০৩, স্তবক ১-৩]

আলিয়া মনে করেছিল যে এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে লিখতে বসলে তার দৈনিক কাজের সময় নষ্ট হবে, কিন্তু বাস্তবে কিন্তু তার বিপরীত হত। নিজের মনের উদ্বেগগুলি যদি লিখিত অবস্থায় চোখের সামনে দেখা যায় তাহলে সমাধান বেরিয়ে আসে অনেক ক্ষেত্রেই।

লেখার মাধ্যমে তার চিন্তাভাবনার ক্ষমতা বৃদ্ধি তো পেতই, মানসিক অশান্তিও কমত বেশ খানিক। লেখার থেকে বড় ক্যাথারেসিস সম্ভবত আর কিছুই নেই।

লিখন বা লেখালিখি: আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

লেখালিখি বা লিখন ইসলামের কাছে একেবারেই অপরিচিত নয়। ইসলাম ধর্মের সূচনাকাল থেকেই লেখালিখির প্রতি আমাদের আকর্ষণ সহজাত। মহানবী রাসুল(সাঃ)-ও লিখন বিশেষ পছন্দ করতেন। লিখন আমাদের ধর্মের অন্যতম অংশ বলেই আজ মহান আল্লাহর বানীর লিখিত রূপ আমরা কুরআনে পাই। আমাদের নবীর জীবনের খতিয়ান হাদিসে লিখিত রূপে আমাদের জন্য রয়েছে। আরবি অক্ষর ও সুন্দর ক্যালিগ্রাফিও আমাদের লিখনপ্রেমের অন্যতম নিদর্শন।

আমাদের পূর্বপুরুষ ও বুজুর্গরা লিখে গিয়েছেন বলেই তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এবং সময়ের পরিচয় বর্তমান যুগেও আমাদের জীবনযাপনের পাথেয় হয়ে উঠেছে। মহান নবীর জীবনের গল্প থেকেই আমরা জানতে পারি যে আধুনিক সাইকোলজি ও বিজ্ঞানের বহু আগেই তিনি লেখালিখিকে মানসিক শান্তি, মনের রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্য সঞ্চয় ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির উপায় হিসেবে চিহ্নিত করে গিয়েছেন।

স্বয়ং আল্লা’ তালা ১৪০০ বছর আগেই আমাদের নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন যে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য লিখন ও লেখনীর কোনও বিকল্প নেই।

‘পাঠ করঃ আর তোমার রাব্ব মহা মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতনা।’ [কুরআন অধ্যায় ৯৬, স্তবক ৩-৫]

এই পবিত্র স্তবক আমাদের দুটি বিষয়ে শিক্ষা দেয়,

প্রথমত, আমরা সহজাত ভাবে কোনও বিদ্যা বা জ্ঞানই আহরণ করতে পারি না যতক্ষণ না মহান আল্লাহ আমাদের জ্ঞান আহরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, প্রাণীদের থেকে আমরা আলাদা, কারণ আমরা মহান আল্লাহর ইচ্ছেয় জ্ঞানলাভ করতে পারি। আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই জ্ঞান প্রবাহিত হয় লিখনের মাধ্যমে।

বিজ্ঞানসম্মতভাবে লেখালিখির উপকার

লেখালিখির প্রয়োজনীয়তা অসীম। একটা সময় ছিল যখন আমরা সারাদিনের পর ডায়েরি লিখতাম। সারাদিন আমার সঙ্গে কী কী হল বা কী কী ভাবলাম সেই বিষয় যদি দিনের শেষে লেখা হয় তাহলে নিজের চিন্তাভাবনা অনেকাংশেই সরল থাকে। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন কলম বা পেন্সিলের সাহায্যে লেখার অভ্যাস মস্তিষ্কের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের কার্যকারীতা বৃদ্ধি করে।

সুতরাং বলা যায়, মন খারাপ বা অস্বস্তির অন্যতম ওষুধ হচ্ছে লেখালিখি। কিন্তু, দৈনন্দিন কাজের চাপে অনেকেরই লেখার অভ্যাস চলে যায়। আলিয়ার মতই তারা সময় নেই বলে লেখাকে এড়িয়ে যেতে থাকে।

তাঁদের জন্য রইল সময় বাঁচিয়ে লেখালিখি করার কিছু উপায়,

ডিজিটাল মাধ্যমে না করে কাগজে লেখালিখি করুন

আমাদের কর্মক্ষেত্রর বেশিরভাগই এখন ডিজিটাল। সারাদিন মাউস ক্লিক ও স্ক্রিনে ট্যাপ করে সময় কেটে যায়। সেক্ষেত্রে, যখন আপনি লেখার মাধ্যমে আনওয়াইন্ড করছেন, ডিজিটাল মাধ্যমকে একেবারে ছেড়ে দিন। কাগজে কলমে আবার নতুন করে লিখতে হয়ত শুরুর দিকে অসুবিধা হবে, কিন্তু সেই অসুবিধা কাটিয়ে উঠলে দেখবেন অদ্ভুত একটা অ্যাকমপ্লিশড অনুভূত হচ্ছে।

সঙ্গে সবসময় একটি পেন ও নোটবুক রাখুন

এটার থেকে ভাল অভ্যাস আর হয় না। বাইরে অনেকসময়ই আমরা অনেক কিছু খেয়াল করি, বা জানি। সেগুলো ফোনে লেখার বদলে নোটবুকে লিখুন। নিজের ছোট ছোট ভাবনাও লিখতে পারেন।

লেখার কারণ খুঁজে বের করুন

লিখতে গেলে যে আপনাকে লেখক হতে হবে তা কিন্তু নয়। আপনি আপনার দৈনিক কাজের হিসাবও লিখতে পারেন। কিংবা আপনার পছন্দের সুরা ও হাদিস লিখে রাখলেন, যাতে দিনের মধ্যে মাঝে মাঝে আপনি নোটবুক খুলে সেগুলো দেখে নিতে পারেন। কুরআন পড়ার সময় বিশেষ করে যদি পাশে নোটবুক রাখেন, তাহলে অনেক নতুন ভাবনা চিন্তার দিক খুলে যাবে আপনার জন্য। গ্র্যাটিচ্যুড জার্নাল রাখতে পারেন, এতে মানসিক স্বাস্থ্য বেশ ভাল হয়। কিছু না হোক, নিদেনপক্ষে কিছু অনুবাদই করুন। কিন্তু লেখা থামাবেন না।

কাগজ কলমে বৈচিত্র্য আনুন

সাদা কাগজে লিখতে ভাল লাগে না? রঙিন কাগজে লিখুন। পেনের কালি পালটে পালটে লিখুন। মনে রাখবেন, লেখালিখি আপনার মানসিক উন্নতির হাতিয়ার। সে হাতিয়ার আপনি কীভাবে সজ্জিত করবেন তা একান্তই আপনার ব্যাপার।

মন খুলে লিখুন

লেখা আসলে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। সেখানে কারচুপি করার প্রয়োজন নেই। যা মনে আসে লিখুন, যদি লেখার পর নিজের বিরক্তি আসে তাহলে বুঝবেন সেই ভাবনাটা বিরক্তি উদ্রেক করার মতোই। আপনার ডায়রি যেন আপনার প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠে।

দৈনিক জীবনে সৃজনশীলতা, উন্নতি ও মানসিক শান্তির জন্য লিখন আপনাকে প্রভূত সাহায্য করবে। তাই লেখালিখির অভ্যাস গড়ে তুলুন আর হয়ে উঠুন নিজের শ্রেষ্ট সংস্করণ।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.