শরীর ও মনের উন্নতির মেলবন্ধনে শিশুরা বেড়ে উঠুক

ID 41852048 © Sergey Novikov | Dreamstime.com
ID 41852048 © Sergey Novikov | Dreamstime.com

মানুষ খোদা তা’আলার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ প্রাণ, পৃথিবীর আর কোনও প্রাণীর মধ্যে বিবিধ বৈশিষ্ট্যের সমাহার নেই যা মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই জন্যই, মানুষের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন আঙ্গিক একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। জন্ম থেকে পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠা পর্যন্ত একটি মানুষের দেহে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই পরিবর্তন প্রভাবিত করে সেই মানুষের আত্মিক অবস্থানকেও। আত্মা শরীরকে প্রভাবিত করে, শরীর আত্মাকে। এই দুইয়ের মধ্যে যে অমোঘ বন্ধন তা আল্লাহর সৃষ্টি, এদের আলাদা করা যায় না।

পিতা-মাতার কাছে শিশুর পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠা এক অনিন্দ্যসুন্দর অভিজ্ঞতা। তবে, খেয়াল রাখতে হবে শিশুকে সঠিক বৃদ্ধির পরিবেশ দেওয়া হচ্ছে কিনা।  

একটি শিশুর বড় হয়ে ওঠায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ দেখা যায়;

১। শরীরের বৃদ্ধি ও সামাজিক পরিবেশের নিরিখে মানসিক বিকাশঃ

একটি শিশুর সুস্থভাবে বড় হয়ে ওঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সুস্থ বাড়ি ও সামাজিক পরিবেশ। শিশুটি যদি ভয় পেতে থাকে, বা কোনও ঘটনা তার জীবনে উদ্বেগের সৃষ্টি করে তাহল শরীরের বিকাশও ব্যাহত হয়। সে হয়ে পড়ে অত্যধিক লাজুক বা ভীতু। সুস্থ সবল দেহের অধিকারী আর হতে পারে না। নিউরাল  ও সাইকোলজিকাল প্রভাব শরীরের সঠিক বৃদ্ধির জন্য ভীষণভাবে প্রয়োজনীয়। শিশুকে শুরুতেই বোঝাতে হবে যে সে যে পরিবেশে বড় হচ্ছে সেটা নিরাপদ। তাহলেই সে নিজেকে ধীরে-ধীরে বিকশিত করতে পারবে। উদ্বেগ ও ভইয়ের বীজবপনে ফসল রুগ্ন হয়, তা এক ইমানদার পিতা মাতার কাছে কখনওই কাম্য নয়। 

২। মানসিক বৃদ্ধির প্রভাবে শারীরিক বৃদ্ধিঃ

পিতা মাতা যদি মানসিকভাবে উদার হয় তবে সন্তানের মধ্যে সেই সদর্থক প্রভাবে পড়ে। প্রকৃত অভিভাবকত্ব সন্তানকে যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়, সঙ্গে শেখায়ে এমপ্যাথি। একটি শিশু যদি আরেকটি শিশুর দুঃখ, কষ্ট বুঝতে শেখে তবেই সেই প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। আল্লাহ সেটাই বলে থাকেন। প্রকৃত মুসলমান একে অপরের কষ্ট বুঝবে এবং তা লাঘব করার চেষ্টা করবে। মানসিকভাবে  শক্তিশালী একটি শিশু শারীরিকভাবেও সুস্থ হয়ে বেড়ে ওঠে।

৩। মানসিক বৃদ্ধির উপর শারীরিক বৃদ্ধির প্রভাবঃ

সুস্বাস্থ্য, সক্ষমতা, বুক ভরা দম এগুলো আবার মানসিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আসলে, বলা চলে, একটি শিশুর বড় হয়ে ওঠার পিছনে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে। কথায় বলে, ‘সুস্থ শরীর সুস্থ মনের আধার।’ এ কথা যে আদতে অক্ষরে-অক্ষরে সত্যি তা নানাসময় নানা বিদ্বজনেরা বলে গিয়েছেন। আনন্দের চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে শরীর ও মনের নিখুঁত ভারসাম্যের মধ্যে। বড় হওয়ার সময় যদি কোনও শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে সুস্থতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবা-মায়ের তৎপর হওয়া উচিৎ। অসুস্থ শরীর মনকেও অসুস্থ করে দেয়, এভাবেই সবদিক থেকে একটি শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। 

৪। বৌদ্ধিক পরীক্ষা বা ইন্টালিজেন্স টেস্টঃ

অনেক বিজ্ঞানীর মতে ইন্টালিজেন্স টেস্টে নাকি ধরা পড়ে একটি মানুষ সুস্থভাবে বড় হয়ে উঠেছে কিনা। বিজ্ঞানী স্যান্ডুইক নিজের বইতে পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে বুদ্ধিমান মানুষের শরীর নিরোগ হয়। তিনি ৪২৩ জন ছাত্রের বুদ্ধির পরীক্ষা করেছিলেন যার মধ্যে মাত্র ৪০ জনের বুদ্ধি ছিল সর্বোত্তম। এই ৪০ জনের ডাক্তারি পরীক্ষা করে দেখা যায় প্রায় ৫২ শতাংশ ছাত্রের শরীর নিরোগ, বৃদ্ধি নিখুঁত। অন্যদিকে, ৪০ জন কম বুদ্ধির ছাত্রের কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ছিল। 

অর্থাৎ, একটি শিশুর সুস্থ বৃদ্ধির জন্য শারীরিক ও মানসিক উন্নতি দুইই অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা সম্পর্কে ইসলামে রয়েছে বিশদ আলোচনা। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সতর্কতা সত্ত্বেও কোনো রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হয়ে গেলে এর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রতিও রয়েছে জোরালো তাগিদ। ইসলাম রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্বারোপ করেছে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করেছে। এজন্য আমরা দেখতে পাই, যে বিষয়গুলোর কারণে মানুষের রোগ হয় ইসলাম আগেই সেগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ইসলামে হালাল-হারাম খাবারের বিবরণ দেখলে তা সহজেই অনুমেয়।

ওয়াহাব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে। ’ (বুখারি, হাদিস নং: ৫৭০৩; তিরমিজি, হাদিস নং: ২৩৫০)

স্বাস্থ্য রক্ষা করা শরিয়তের তাগিদ। শরীরের যথেচ্ছ ব্যবহার উচিত নয়।  কোরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামি শরিয়াত স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যেমন গুরুত্ব দিয়েছে তেমনি তা কার্যকরের ফলপ্রসূ উপায় বাতলে দিয়েছে। যেমন, নেশা জাতীয় দ্রব্য হারাম করা এবং পরিমিত আহার ও সময়ানুগ খাবার গ্রহণ ইত্যাদি। কাজেই স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের ঈমান ও বিশ্বাসের দাবি। কোনো কারণে মানুষ অসুস্থ হলে আল্লাহ তাকে তার অসুস্থতার কারণে সওয়াব ও পুণ্য দান করেন। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থ হলে অবশ্যই তাকে কেয়ামতের দিন শাস্তির সম্মুখিন হতে হবে। তাছাড়া অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা গ্রহণের চেয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সুস্থ থাকাকে ইসলাম অধিক উৎসাহিত করেছে।

 শরীরের উন্নতিসাধন ও মানসিক বিকাশকে সুব্যহ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামে শরীরের যত্ন নেওয়াকে বিশেষ নেক কাজ বলে ধরা হয়, মনে করা হয় শরীরেরও অধিকার রয়েছে তার আধারিকৃত মানুষটার উপর। 

ওয়াহাব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে। ’ (বুখারি, হাদিস নং: ৫৭০৩; তিরমিজি, হাদিস নং: ২৩৫০)

এর থেকে বোঝা যায়, ইসলাম ধর্ম অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ভাবে মানুষের বৃদ্ধির উপায় লিপিবদ্ধ করেছে।