শরীয়াত দৃষ্টিতে জীবন বিমা; জুয়া না সহায়তা

পুরুষ Tamalika Basu
A man holds a red arrow up above the word Rate and a wooden house. The concept of raising interest rates on mortgages. The increase in property tax rates. Real estate capitalization. Insurance.
ID 143719317 © Andrii Yalanskyi | Dreamstime.com

বিমা মূলত বিমা কোম্পানি ও আবেদনকারীর মধ্যবর্তী এক চুক্তি। এর পদ্ধতি হল, বিমা কোম্পনি নির্দিষ্ট মেয়াদে গ্রাহক থেকে নির্ধারিত হারে কিস্তির আকারে এক নির্দিষ্ট অংকের অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। মেয়াদ শেষে উক্ত নির্দিষ্ট অংকের টাকার সাথে আরো কিছু টাকা বৃদ্ধি করে গ্রাহককে বা গ্রাহক কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিকে ফেরৎ প্রদান করা হয়ে থাকে। উক্ত বাড়তি টাকাকে পরিভাষায় বোনাস অভিহিত করা হয়। যেমন, কোন গ্রাহক থেকে যদি পাঁচ বছরে কিস্তি আকারে ৬,০০০ টাকা সংগ্রহ করে থাকে তাহলে মেয়াদ শেষে উক্ত গ্রাহককে ৬,০০০ টাকার সাথে আরো এক দেড় হাজার টাকা বৃদ্ধি করে দিয়ে দেওয়া হয়। পরিভাষায় এই অতিরিক্ত বাড়তি টাকাকেই বোনাস বলা হয়।

সাথে সাথে কখনো কোন গ্রাহক যদি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয় তাহলে সেই বিমা কোম্পানি তাকে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করে থাকে। এটা হল গ্রাহকের লাভের দিক। এক্ষেত্রে কোম্পানির লাভের দিকটা হল – গ্রাহক থেকে গ্রহণকৃত অর্থ উচ্চসুদে লাগিয়ে বিশাল অংকের মুনাফা অর্জন করা। চাই সেটা ব্যবসার মাধ্যমে হোক বা অন্যকোন খাতের মাধ্যমে। আর গ্রাহকের অর্থ দ্বারা অর্জিত সেই বিশাল মুনাফার সামান্যতম অংশ গ্রাহককে বোনাস হিসেবে প্রদান করে থাকে। কখনো প্রয়োজন হলে সেই সামান্যতম অংশ দ্বারাই দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা অর্জন।

বিমার সূচনা :

বর্ণিত আছে বিমার সূচনা ঘটে চতুর্দশ শতকের দিকে। তৎকালীন সময়েও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বর্তমান সময়ের মত সাগর পথে মালামাল আমদানি রপ্তানি হত। অনেক সময় পণ্যবাহী জলজাহাজ দুর্যোগে ডুবে যেয়ে মাল সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেত। এতে করে ব্যবসায়ীরা নিঃসম্বল অসহায় হয়ে পড়ত। এর কোন সুরাহা করা যায় কি না?

এ নিয়ে তদানীন্তন সময়ে ব্যাপক গবেষণার পর সর্বপ্রথম ইটালিয়ান বণিকরা একটি পদ্ধতি আবিষ্কার কররে সক্ষম হন। সেই পদ্ধতিটি ছিল এমন – যদি কোন ব্যক্তির পণ্যবাহী জাহাজ মালামালসহ সাগরে নিমজ্জিত হয় তখন অন্যান্য সকল বণিকরা তাকে সাহায্য করার জন্যে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট হারে অর্থ সঞ্চয় করত। সে ফান্ড থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত বণিককে সহায়তা প্রদান করা হত। এতে করে কোন ব্যক্তির পণ্যবাহী জাহাজ সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হলেও সে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ত না। এ উদ্যোগটিই পরবর্তীতে নৌবিমা হিসেবে পূর্ণতা লাভ করে।

বিমা কি তখন শরীয়াত মেনে চলত?

বিমার সূচনা যে উদ্দেশ্য নিয়ে হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ সঠিক। বিমার মাধ্যমে শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা করাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। যেন অন্যান্য বণিকদের মতই একজন বণিক নিয়তির পরিহাসে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন যাপন না করে। আর একথা তো সুস্পষ্ট যে, পারস্পরিক সাহায্যের মাধ্যমে সহায়-সম্বলহীন ব্যক্তিকে সহায়তা করা নিঃসন্দেহে অতিপ্রশংসনীয় উদ্যোগ। ইসলাম ধর্ম বরাবরই এব্যাপারে গুরত্ব প্রদান করে আসছে। কিন্তু বড় পরিতাপের বিষয় হল এই যে, তৎকালীন যুগেই বিমার এ মহৎ উদ্দেশ্যটি আপন অবস্থায় বাকী থাকেনি। বিমা যখন ইহুদীদের হাতে যাওয়ার পর তারা এর মাঝে সুনিপুণভাবে সুদ ও জুয়ার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে দিল।

ইসলামের দৃষ্টিতে লাইফ ইন্সুরেন্স বা জীবন বিমা করা বৈধ নয়। শরীয়াত দৃষ্টিতে এটা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম একটি লেনদেন।

ওআইসির শাখা সংস্থা “আর্ন্তজাতিক ফিকহ একাডেমি” এবং সৌদী আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংস্থা “উচ্চ উলামা পরিষদ” সহ বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সকল প্রতিষ্ঠান ও অধিকাংশ ফকীহ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, সকল ধরনের বাণিজ্য বিমা হারাম। চাই তা সম্পদের বিমা হোক বা জীবনের বিমা। উলামায়ে কিরাম এর একাধিক কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন :

১. এতে সুস্পষ্ট সুদ পাওয়া যায়। যেহেতু এতে যে পরিমাণ অর্থ জমা দেয় হয় বিনিময়ে তার চেয়ে অনেক বেশী গ্রহণ করা হয়। আর শরীয়তের পরিভায়ায় সরাসরি আর্থিক লেনদেনে কমবেশী মুনাফা চুক্তিকেই তো সুদ বলা হয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ভায়ায় সুদ হারাম ঘোষণা করেছেন। “আল্লাহ ক্রয়বিক্রয় তথা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সূরা বাকারা : ২৭৫)”

২. এতে ধোকা ও ঝুঁকি বিদ্যমান। যেহেতু বিমাকারীর একথা জানা নেই যে, সে কী পরিমাণ অর্থ দিবে আর কী পরিমাণ গ্রহণ করবে? এমনও হতে পারে যে, বিমা করার কিছুদিনের মধ্যেই সে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হলো। তখন বিমা প্রতিষ্ঠান চুক্তির শর্তানুযায়ী বিশাল অর্থ দিতে বাধ্য হবে। আবার এমনও হতে পারে যে, সারাজীবন তার কোনো দুর্ঘটনাই ঘটলো না। তাহলে এক্ষেত্রেও বিমাকারীকে সকল কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অথচ সে জীবিত অবস্থায় এর কিছুই পাবে না; বরং মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশরা পাবে। হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে : রাসূল সা. পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে (আরবে প্রচলিত বিশেষ এক ধরনের বিক্রয় পদ্ধতি) ও প্রতারণামূলক লেনদেন থেকে নিষেধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ৩৮৮১)

এছাড়াও আরও যে কারণে শরীয়াত বিমাকে হারাম বলে-

৩. এতে জুয়া বিদ্যমান। যেহেতু বিমাকারী কখন মারা যাবে আর সে কতো টাকা পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর শরীয়তের পরিভায়ায় অনিশ্চিত লেনদেনকেই জুয়া বলে। আল্লাহ তাআলা জুয়াকে শয়তানের কর্ম বলে অভিহিত করেছেন এবং এ থেকে বিরত থাকার আদেশ করেছেন। তিনি বলেন: হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ এসবই শয়তানের কার্য বৈ কিছু  নয়। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যেনো তোমরা সফলকাম হও। (সূরা মায়েদা : ৯০)

৪. এতে যুলুম পাওয়া যায়। যেহেতু কোনো বিমাকারী প্রয়োজনবশতঃ হলেও কিস্তি দিতে অপারগ হওয়ায় এটা বাতিল করতে চাইলে প্রতিষ্ঠান তার সমুদয় অর্থ রেখে দেয়, যা সুস্পষ্ট যুলুম ও অমানবিক। আল্লাহ তাআলা বলেন : হে মুমিনগণ, তোমরা এক অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। (সূরা নিসা : ২৯)

৫. এত মানুষকে বিক্রয়লদ্ধ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেহেতেু এতে মানুষের মৃত্যু বা দুর্ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে চুক্তি করা হয়, সেহেতু এতে মানুষকে একপ্রকার পণ্য হিসেবে মূল্যায়িত করা হয়। অথচ মানুষ সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন এক জাতি, যা কিছুতেই বিক্রয়যোগ্য হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।(সূরা বনী ইসরাইল : ৭০)

ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এতে কেউ জড়িয়ে পড়ার নিজের ভুল বুঝতে পারলে আল্লাহর কাছে খালেস দিলে তাওবা করতঃ সঙ্গেসঙ্গে তাকে এ কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে। সম্ভব হলে তাৎক্ষণিকভাবে জমাকৃত অর্থ তুলে ফেলবে। একান্ত তুলতে সক্ষম না হলে যখন বীমা প্রতিষ্ঠান তাকে সমুদয় টাকা প্রদান করবে তখন শুধু নিজের আসল টাকা রেখে বাকী লভ্যাংশ গরীব-মিসকীনদের মাঝে সওয়াবের নিয়ত ব্যতীরেকে দান করে দিবে।