শাজারাত আল-দুর: একজন শক্তিশালী ‘সুলতানা’ যিনি ক্রুসেড রুখে দিয়েছিলেন

আফ্রিকা ১৫ জানু. ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
শাজারাত আল দুর

শাজারাত আল-দুর বা শাজার আল-দুর ছিলেন এমন একজন মহিলা, যিনি আড়াল থেকে প্রকাশ্যে এসে একজন সুলতান হিসেবে শাসন করেছিলেন। বলা হয় তিনি অবশ্যম্ভাবী সপ্তম ক্রুসেড রুখে দিয়েছিলেন। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মিশরে মামলুক বংশের রাজত্ব স্থাপন করেছিলেন। এই বংশ ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিশরে রাজত্ব করেছিল, যার পতন হয় উসমানীয় সাম্রাজ্যের আক্রমণের ফলে (১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে)।

শাজারাত প্রথম জীবনে ছিলেন একজন তুর্কী বাঁদী, যাঁকে মিশরের সুলতান আস-সালিহের জন্য কেনা হয়েছিল। তবে তিনি শীঘ্রই সুলতানের মন জয় করে নিয়েছিলেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁদের এক পুত্রসন্তান খলিলের জন্ম হয় এবং তিনি সুলতানের পত্নীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন (১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে)। কিন্তু সব গল্পের শেষ মিলনাত্মক হয় না। ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল শাজারাতের সাথে। তাঁর সুখের সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

সপ্তম ক্রুসেড যখন আসন্ন

এই গল্পের ছন্দপতন শুরু হয় মিশরের সুলতান সালিহের মৃত্যুর সাথে। ঠিক সেই সময়েই ফ্রান্সের রাজা নবম লুই কায়রো আ্ক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন (১২৪৯ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে)। সেই ঘটনার হাত ধরে অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল সপ্তম ক্রুসেড।

এই পরিস্থিতিতে শাসনের রাশ নিজের কাঁধে তুলে নেন শাজার। একজন বুদ্ধিমতী এবং দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই পরিস্থিতিতে অন্য কারও সাহায্যের ভরসায় থাকা উচিত নয়। তাই তিনি সেনাবাহিনীর মনোবল অটুট রাখার জন্য সুলতানের মৃত্যুর খবর গোপন রাখেন। এর পাশাপাশি সালিহের বিশ্বাসভাজন মুখ্য সেনাপতি বাইবার্সের সাথে পরামর্শ করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। যুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে না এসে আড়াল থেকেই সমস্তটা নিপুণ ভাবে পরিচালনা করেছিলেন শাজার। সম্মুখসমরে দুই দেশের সেনা মুখোমুখি হলে তাদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু মিশরের সেনার সামনে ফরাসী সেনাবাহিনী বেশি দিন দাঁড়াতে পারেনি। শীঘ্রই ফ্রান্স পরাস্ত হয়। শুধু তা-ই নয়, এই যুদ্ধের শেষে ফ্রান্সের রাজা নবম লুই মিশরের বন্দিতে পরিণত হন। ফরাসী বাহিনীর এই হার গোটা বিশ্বের চোখে মিশরের গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে।

এই খবর যখন ফ্রান্সে পৌঁছয়, তখন দশ হাজার কৃষক তাঁদের রাজাকে মুক্ত করার জন্য মিশরের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু তাঁদের সাংগঠনিক ক্ষমতা এতটাই খারাপ ছিল যে, শেষ পর্যন্ত রাজার মুক্তির বিনিময়ে তাঁরা মিশরকে ৪,০০,০০০ লিভরে টর্নোইজ (livres tournois, মধ্যযুগের ফ্রান্সে ব্যবহৃত মুদ্রাগুলির মধ্যে অন্যতম)দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করে। বলা যেতে পারে এটা ছিল ফ্রান্সের মোট বার্ষিক রাজস্ব পরিমাণের কম-বেশি ৩০ শতাংশ। এই চুক্তির দ্বারা শাজার সপ্তম ক্রুসেড রুখে দিতে সফল হয়েছিলেন।

অন্তর্কলহের মধ্যে শাজারাত আল-দুর

তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। এরপরে শাজারের সামনে নতুন বিপত্তি হিসেবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মিশরের সুলতান পদের উত্তরাধিকারী তথা তাঁর সৎ পুত্র, তুরানশাহ/তুরান। তিনি উপরোক্ত ঘটনাবলীর সময় সাহায্য না করলেও, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই আচমকা এসে হাজির হয়েছিলেন। তবে তিনি খুব ভালো শাসক হতে পারবেন না, সে কথা দেশের শিশুরাও জানত। তিনি ইসলামের নির্দেশ পালন করতেন না। মিশর মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেখানে প্রকাশ্যে মদ্যপান করতেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, শাজারকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিশরের সুলতানের পদ দখল করা।

তুরানের এই অভিসন্ধি বুঝতে শাজারের বিশেষ সময় লাগেনি। তুরান যাতে কোনও ভাবেই এই উদ্দেশ্যে সফল হতে না পারেন, তার জন্য সেনাবাহিনী শাজারের পাশে থাকার আশ্বাস প্রদান করে। কিছু দিনের মধ্যেই তুরানের মৃত্যু হয় এবং শাজার আনুষ্ঠানিক ভাবে মিশরের সুলতানের আসন গ্রহণ করেন (১২৫০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি নিজের নামে মুদ্রা ছাপিয়েছিলেন এবং জুম্মার খুতবায় নিজের নাম পাঠ করার নির্দেশও দিয়েছিলেন।

সুলতানা শাজারাত আল-দুর

দুর্ভাগ্যবশত, এখানেও এই গল্পের শেষ নয়। মিশরের সমস্ত অংশ একজন মহিলার শাসন মেনে নিতে রাজি ছিল না। বাগদাদ সরাসরি ঘোষণা করে যে তারা শাজারের শাসন মানবে না এবং তারা বিশ্বাস করে যে, কোনও মহিলা শাসকের আসন গ্রহণ করার যোগ্য নয়। বাগদাদের খলিফা মিশরবাসীর উদ্দেশে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, “যদি আপনাদের মধ্যে এমন কোনও পুরুষ মানুষ না থাকে যিনি সুলতান হতে পারেন, তাহলে আমাকে বলতে পারতেন, আমি আপনাদের জন্য একজনকে পাঠিয়ে দিতাম।” এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য, শাজার তাঁর প্রয়াত স্বামীর বিশ্বাসভাজন আমীর আয়বেক/আইবাক-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁকে সুলতান পদে বসালেও, শাজারই শাসনক্ষমতা সামলাতেন। এমনকী তিনি নিজেকে সুলতানা বলেও পরিচয় দিতেন।

এইভাবে কয়েক বছর চলার পরে, আয়বেক তৃতীয় বিবাহ করেন নিজের ক্ষমতাবৃদ্ধির জন্য। এরপরের ঘটনা সম্পর্কে বহু মতবাদ প্রচলিত রয়েছে, কিন্তু প্রতিটির সারমর্ম একই – আয়বেকের তৃতীয় বিবাহের সিদ্ধান্তে শাজার খুশি হননি এবং তাঁর নির্দেশে স্নানাগারে আয়বেককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

এই ঘটনার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই শাজারের মৃত্যু হয় বলে কথিত রয়েছে (১২৫৭ খ্রিস্টাব্দ)। তবে সেই ঘটনা কোথা্য় বা কীভাবে ঘটেছিল- সেই সম্পর্কে বহু লোকশ্রুতি থাকলেও সঠিক তথ্য আজও অজানা।