শালীনতা এবং সৌন্দর্যের সমন্বয় রেখে পোশাক সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম

Musulmans habillés en blanc chacun face à l'autre
© Fabio Formaggio | Dreamstime.com

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের দিকনির্দেশনা। পোশাক পরিচ্ছদের বিষয়েও ইসলামে রয়েছে দিকনির্দেশনা। একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের পোশাক কেমন হওয়া উচিত, আমরা কি পড়বো, পুরুষের পোশাক কেমন হওয়া উচিত, আবার নারীর পোশাক কেমন হওয়া উচিত এই বিষয়টি নিয়ে আজকে আমরা আলোচনা করব।

প্রথমে আমাদের একটি কথা ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার আর তা হলো, ইসলাম কোন নির্দিষ্ট পোশাক কারো উপর চাপিয়ে দেননি। পুরুষ ও নারীদের জন্য শালীনতা এবং সৌন্দর্যের সমন্বয় দিকনির্দেশনা ও বিধিমালা দেয়া হয়েছে। যার আলোকে একজন পুরুষ বা নারী তার পোশাক নির্বাচন করবে। তবে অবশ্যই তাতে যেন পর্দা এবং পোশাকের পূর্ণ অর্থের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

পোশাক পাঁচ ধরনের

(১) ফরজ পোশাক : এমন পোশাক, যা দ্বারা সতর ঢেকে যায়।

(২) মুস্তাহাব পোশাক : এমন পোশাক, যা রাসুল (সা.)-এর পোশাকের মতো বা তাঁর পোশাকের খুব কাছাকাছি অথবা সমকালীন নেককার লোকদের পোশাকের মতো হয়।

(৩) মুবাহ ও জায়েজ পোশাক : এমন পোশাক, যার মধ্যে শরিয়তের সীমানার ভেতর থেকে সৌন্দর্যের প্রতি খেয়াল রাখা হয়।

(৪) মাকরুহ পোশাক : এমন পোশাক, যা পরিধান করার দ্বারা পরিধানকারীর অহংকার, প্রসিদ্ধি বা অন্যকে ছোট করা উদ্দেশ্য হয়।

(৫) হারাম পোশাক : পুরুষ মহিলার মতো এবং মহিলা পুরুষের মতো পোশাক পরিধান করা হারাম পোশাকের অন্তর্ভুক্ত। নাবালক ছেলে-মেয়ের বেলায়ও এ মাসআলা প্রযোজ্য। তবে যে এলাকায় নারী ও পুরুষের পোশাকের খুব বেশি পার্থক্য থাকে না, সেখানে পোশাক এক হওয়া হারামের মধ্যে গণ্য হবে না। তাদের পোশাকের মধ্যে পার্থক্য হবে হিজাব বা টুপি ইত্যাদি দ্বারা। (ফাতাওয়া শামি : ৫/২২৩, ফাতহুল বারি : ১০/৩৪৫, বুখারি : ২/৮৭৪, ইবনে মাজাহ : ১/৩৪৮, ২/২৯৯, নাইলুল আউতার : ৬/১২৬)

পুরুষের পোশাক

যারা প্রকৃত অর্থে রাসুলকে (সা.) ভালবাসতে চান তাদের জন্য পবিত্র কোরআনে বলা আছেঃ “ তোমাদের জন্য রাসুলের জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।” রাসুল (সা.) কখনো চাদর গায়ে দিতেন এবং লুঙ্গি পরতেন। তাঁর চাদর প্রায় ছয় হাত লম্বা থাকতো। তাঁর ব্যবহৃত পোশাকের মধ্যে আরও ছিল, জামা, জুব্বা, পাগড়ি। তিনি যে কামিজ পড়তেন এর বর্ণনা হচ্ছে- হাতের দিকে কব্জি পর্যন্ত আর লম্বায় টাখনুর উপর পর্যন্ত। তিনি হাঁটুর নিচে আধাআধি পর্যন্ত পোশাক পরার অনুমতিও দিয়েছেন। তবে সর্বোচ্চ সীমায় টাখনু পর্যন্ত লম্বা হলেও তা যেন টাখনুর নিচে না ঝুলে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেছেন। তিনি কখনো পাগড়ি মাথায় দিতেন এবং পাগড়ির নিচে টুপি পরতেন। তিনি টুপি ছাড়া পাগড়ি এবং পাগড়ি ছাড়া শুধু টুপিও পরতেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে ইসলাম যেসব নির্দেশনা দিয়েছে এগুলোর অন্যতম হল- স্বর্ণ কিংবা রেশম সম্বলিত কোনো পোশাক পরা যাবে না। সতর (শরীর) আবৃত হয় না, এমন যে কোনো পোশাক বর্জনীয়।

রাসুল (সা.) ওইসব পুরুষদের অভিশম্পাত করেছেন যারা নারীদের বেশ ধারণ করে। (বুখারী-৫৫৪৬)। সাদা রঙের পোশাক পরা মুস্তাহাব। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা সাদা রঙের পোশাক পরিধান করো। কারণ তোমাদের অন্যান্য রঙের কাপড় ও বস্ত্র থেকে এটি উত্তম। এ সাদা কাপড়েই তোমরা মৃতদের কাফন দিও। (তিরমিযী)

সুতরাং এটা আমরা বলতেই পারি যে রাসুল (সা.) যে সমস্ত পোশাক পরিধান করতেন আমরা সুন্নত হিসেবে তা অনুসরণ করতে পারি। তবে আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, সকল আচার, রীতি, মর্যাদা এবং নৈতিকতার সাথে সামঞ্জস্য রয়েছে, আমরা সে সমস্ত পোশাকও পরিধান করতে পারব।

নারীর পোশাক

নারীদের পোশাক পরিচ্ছদ কেমন হওয়া উচিত এ ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম নারীদের সকল ক্ষেত্রে সুরক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। নারীর পোশাক অবশ্যই তার পুরো শরীরকে ঢেকে রাখার জন্য যথেষ্ট হতে হবে। হাত এবং চেহারা নিয়ে কোনো কোনো বর্ণনায় কিছু দ্বিমত থাকলেও বর্তমানের ফেতনা ও নারীর সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষার তাগিদে মুখ ঢেকে পর্দা করার ব্যাপারে ফকীহগণ একমত হয়েছেন। সূরা নূরে আল্লাহ পাক আদেশ দিয়েছেন, ‘নারীরা যেন তাদের গায়ে ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখে।’ সূরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ পাক রাসুলকে (সা.) বলেছেন, “ হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যা ও বিশ্বাসী নারীদের বলো, তারা যেন (জনসমক্ষে) তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের (শালীন মহিলা হিসেবে) চিনতে সুবিধা হবে এবং কেউ উত্ত্যক্ত করবে না। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু”।

নারীর পোশাক যেন এত ক্ষীণ ও পাতলা কিংবা লাগোয়া না হয় যা তার দেহ আবরণের জন্য যথেষ্ট নয়। আবার এমন মোটা পোশাক পরিধান করবে না, যাতে গরমে তার কষ্ট হয়; বরং অস্বচ্ছ মধ্যম পোশাক পরিধান করবে। ঢিলেঢালা এবং শালীন পোশাকেই নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য ও সুরক্ষা নিহীত। শরীরের অবয়ব প্রকাশ পায়—এমন আঁটসাঁট পোশাক মুমিন পুরুষও পরিধান করবে না। আর নারী তো নয়ই। কেননা এমন পোশাক অন্যকে প্রলুব্ধ করতে পারে।

ইসলাম নারীকে নারীসুলভ এবং পুরুষকে পুরুষসুলভ পোশাক পরিধানের নির্দেশ দিয়েছে। শরিয়তের বিধানমতে, নারী যেমন পুরুষের পোশাক পরিধান করবে না, তেমন পুরুষও নারীর মতো পোশাক পরিধান করবে না। আল্লাহ সকল মুসলিম পুরুষ ও নারীকে সঠিক পোশাক নির্বাচন এবং তা পরিধান করার তৌফিক দান করুক।