শিশুকে সঠিক ব্যবহার শেখাবেন কীভাবে?

Photo <a href="https://www.dreamstime.com/stock-photo-small-child-s-hand-reaches-big-man-grand-father-hand-isolated-white-background-image65059465">65059465</a> © <a href="https://www.dreamstime.com/krishnadasekm_info" itemprop="author">Krishnadas Chandrasekharan</a> - <a href="https://www.dreamstime.com/photos-images/grand-father-daughter.html">Dreamstime.com</a>

ভাল ব্যবহার বললে প্রথমেই আমাদের মাথায় কী আসে?

বাড়ির কাজে মাকে সাহায্য করা??

মায়ের সঙ্গে তর্কের সময় গলার স্বর উচ্চগ্রামে না তোলা?

বাবাকে তাঁর কাজে সাহায্য করা?

খুব উৎশৃঙ্খল ব্যবহার না করা?

এগুলোর সবকটিই কি আসলে ভাল ব্যবহারের উদাহরণ?

উত্তর হ্যাঁ হলেও আদতে এই প্রত্যেকটা অভ্যাস এক পরিবার থেকে আরেক পরিবার অনুসারে পালটে যায়।

সুতরাং, সন্তানকে বড় করে তোলার সময় সবার আগে নজর দিতে হবে সন্তানের ব্যবহারের সময়। এটা অনস্বীকার্য যে সন্তান যদি খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করে তবে তার থেকে দুঃখজনক আর কিছু নেই। কিন্তু তাতে ব্যাকুল বা ব্যথিত হলে চলবে না। আমাদের সকলের আগে নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, সন্তান কোথা থেকে এই খারাপ ব্যবহার শিখছে, বা সন্তানের মনের মধ্যে কোনও কষ্ট আছে কিনা যেখান থেকে তার এই খারাপ ব্যবহারের সূত্রপাত। 

সমাজবিজ্ঞানী, শিশু চিকিৎসকদের মতে, নিম্নল্লিখিত কারণগুলোর জন্যই শিশুরা খারাপ ব্যবহারের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং বারবার বোঝালেও ভাল ব্যবহার করতে পারে না, 

১। শাসন করতে না চাওয়াঃ আমরা অনেকেই হয়তো ছোটবেলায় আমাদের পিতামাতার কাছে নানাভাবে শাসিত হয়েছি। কেউ মার খেয়েছি, কাউকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে।। এই তিক্ত স্মৃতি থেকে আমরা অনেকেই সিদ্ধান্ত নিই যে যেভাবে আমরা বড় হয়ে উঠেছি সেভাবে কিছুতেই আমাদের সন্তানকে বড় করব না। এটি নিঃসন্দেহে একটি যুক্তিগত সিদ্ধান্ত, কিন্তু অনেকেই এই সিদ্ধান্তের বশবর্তী হয়ে শিশুকে একেবারেই শাসন করেন না। এটা ঠিক নয়। ভুল কাজের জন্য শিশু যদি কোনওভাবেই শাসন না পায় তাহলে কিছুতেই সে তার ভুল কাজটি ঠিক করতে চাইবে না। অকারণ প্রশ্রয়ে আপনার শিশুর ক্ষতিই হবে।

২। নিজের পিতা-মাতার মতো করে বড়করতে চাওয়াঃ অনেকেই আবার নিজ পিতা মাতা যেভাবে তাঁদের বড় করে তুলেছেন সেই পদ্ধতিতে শিশুকে বড় করতে চান। এটায় ভুল কিছু নেই যদি সেই পিতামাতার অভিভাবকত্বের মধ্যে দায়িত্ব ও উদারতা থাকে। যদি অবৈজ্ঞানিক উপায়ে চরম শাসনের মাধ্যমে শিশুকে বড় করার চেষ্টা করা হয় তাহলে শিশুর মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। সেই অসন্তোষ খারাপ ব্যবহারের বীজবপন করে।

৩। পিতা-মাতার মতভেদঃ একটি শিশুকে পৃথিবীতে পিতা মাতা একযোগে আনেন। তাই তাকে বড় করে তোলার ব্যাপারে দু’জনের একমত হওয়া ভীষণ প্রয়োজনীয় পিতা একরকম বোঝাচ্ছেন, মাতা আবার অন্যরকম জিনিস শেখাচ্ছেন এমন হলে শিশু বিচলিত ও উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই হয় খারাপ ব্যবহারের সূত্রপাত।

৪। শিশুকে ভুল ঠিক সম্পর্কে অবহিত করাঃ শিশু ভুল করবেই, পৃথিবীতে প্রথম পা রেখেছে সে। সেই ভুলকে ঠিক পথে নিয়ে যাওয়া একান্তভাবেই অভিভাবকের দায়িত্ব। তবে, হিংস্রতা কখনোই সেই পথ হতে পারে না। মারধোর করা কখনোই উচিৎ না। অনেকসময় কাকা, মামা, বা ঠাকুর্দা এদের কথায় প্রভাবিত হয়ে বাবা মা কঠিন শাস্তি দিয়ে ফেলেন। এটা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখবেন, সন্তান আপনার। তাকে আপনি বাদে আর কেউ বুঝবে না সেভাবে।

৫। শিশুর চাহিদাঃ অনেক বাবা মা-ই গতে বাঁধা কিছু দায়িত্ব সামলে নিয়ে ভাবেন তাঁরা তাঁদের সন্তানকে খুব সুস্থ জীবন দিচ্ছেন। অনেকে আবার অন্যের অনুকরণ করে শিশুকে বড় করতে চান। এটা সর্বৈব ভুল। প্রত্যেকটা মানুষ একে অপরের থেকে আলাদা। প্রত্যেকটা শিশুও তাই সুতরাং, আপনার শিশুর চাহিদা বুঝতে শিখুন। বিবেচনা করতে শিখুন। শিশুর চাহিদা পূরণ হলেই তার মধ্যের অসন্তোষ ও ক্ষোভ কেটে যাবে। সে হয়ে উঠবে হাস্যোজ্জ্বল ও আনন্দিত। 

৬। এড়িয়ে যাবেন নাঃ দশ মাসের সন্তান রাগ হলে খেলনা ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে, দেখতে ভারী মিষ্টি লাগছে। তিন বছরের সন্তান এটা করলে কিন্তু একেবারেই মিষ্টি লাগবে না। বরং এটা বিপজ্জনক। সুতরাং, শুরুতেই রাশ টানুন। আস্তে আস্তে বোঝাতে শুরু করুন কেন এটা ঠিক ব্যবহার নয়। দেখবেন, একসময় আপনার শিশু নম্র মৃদুভাষী হয়ে গিয়েছে।

৭। শরীয়া মেনে চলুনঃ আল্লাহ আমাদের সমাজের জন্য কিছু নিয়ম ঠিক করে দিয়েছেন, সেই নিয়ম অনুসারে শিশুকে বড় করে তুলুন। অকারণ প্রশ্রয় দেবেন না, অকারণে অন্যের কথাও শুনবেন না। যেমন আপনি যদি আপনার শিশুকে দরজা দিয়ে প্রবেশের আগে অনুমতি চাইতে শেখান তাহলে অনেকেই হয়তো বলবে তা না করতে। অনেকেই বলবে যে আপনার সন্তান এখনও ছোট আর ওর এগুলো এখনই শেখার দরকার নেই। আপনি বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের বক্তব্য শুনবেন, কিন্তু শিশুকে নিষেধ করবেন না। ছোট থেকেই সততা ও সঠিক ব্যবহারের শিক্ষা আপনাকেই দিতে হবে। আল্লাহ তো কোর-আনে বলেইছেন,আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।‘ (কোর-আন ৭:১৯৯)

সুতরাং, সবশেষে বলা যায় যে নিজের শিশু সন্তানের সামনে যদি ভাল ব্যবহারের নিদর্শন ও উদাহরণ রাখা যায় তাহলে তারা শিখবে, ও আল্লাহর ইচ্ছানুসারে ভাল মানুষ হয়ে উঠবে। আল্লাহর পথে চললেই ভাল ব্যবহারের সূত্রপাত হয়, অন্যলোকের মতামত সেখানে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।