শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ ও সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে কী বলে ইসলাম?

dreamstime_s_24917199

পূর্ববর্তী চারটি নিবন্ধে, আমরা শিশুদের সামগ্রিক অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এই চূড়ান্ত নিবন্ধে, আমরা শিশুদের সাথে সম্পর্কিত এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যেগুলি প্রথম নজরে শিশুদের অধিকার সম্পর্কিত বলে মনে হয় না। এখানে আমাদের আলোচনার বিষয় হল  শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। 

রক্ষণাবেক্ষণ

দ্বাদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী স্কলার ইবনে কুদামা(রহঃ) বলেছেন, “রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্য হল সন্তানকে পরিপূর্ণরূপে দেখাশোনা করা। সুতরাং এটি এমন হওয়া উচিত নয় যা তার কল্যাণ ও ধর্মীয় প্রতিশ্রুতির জন্য ক্ষতিকারক হবে।”

যখন কোনো বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে এবং বাচ্চা কার হেফাজতে থাকবে বা কে তাকে আর্থিক সহায়তা করবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, তখন এর সঠিক সমাধান ইসলামী শিক্ষার মধ্যেই পাওয়া যায়। যতদিন না শিশুর বুদ্ধি পরিপক্ক হয়, ততদিন শিশুর মা তার পিতার চেয়ে তাকে রক্ষণাবেক্ষণের বেশি অধিকারী। তবে মা যদি পুনরায় বিবাহ করেন, তবে এক্ষেত্রে সন্তানকে হেফাজতের দায়িত্ব পিতার। এ বিষয়ে অনেক মতভেদ থাকলেও সকলেই এক্ষেত্রে একমত হয়েছেন যে, সন্তান যার কাছে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে সে তার রক্ষণাবেক্ষণেই থাকবে।

একজন তালাকপ্রাপ্ত মহিলার প্রাক্তন স্বামী যখন তার সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের দাবি করেছিলেন, তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলেন এবং বললেন, “এই শিশুটিকে আমি গর্ভে ধারণ করেছি এবং বুকের দুধ পান করিয়েছি। এখন শিশুটির পিতা আমাকে তালাক দিয়েছেন এবং তিনি শিশুটিকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে চান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে ঐ মহিলাকে বললেন, “যতক্ষণ না তুমি পুনরায় বিবাহ না করো ততক্ষণ এই সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার তোমার রয়েছে।”

সুতরাং, এ থেকে একটি মূলনীতি পাওয়া যায় যে, সন্তানের মা যদি নতুন বিবাহ না করেন এবং সন্তানকে ভরণপোষণের ক্ষমতা রাখেন তবে তিনিই সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন; অন্যথায় তা পিতার দায়িত্ব হবে।

সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা

বর্তমান সমাজে দেখা যায় যে, মানুষ পরস্পরের মাঝে ন্যায়-ইনসাফ করা থেকে বিরত থাকছে অথচ আল্লাহ তা’আলা সকলের মাঝে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিভিন্ন আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং আশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” (আল কুরআন-১৬:৯০)

সকল মানুষের সাথেই ইনসাফ বজায় রাখা আবশ্যক। বিশেষ করে সন্তানদের ব্যাপারে সর্বদাই ইনসাফ ও সমতা রক্ষা করতে হবে, তাতে কোনোপ্রকার কম-বেশী করা কখনই উচিত নয় রবং তা জুলুম। পিতামাতার উচিত সকল সন্তানকে সর্বদা সমান নজরে দেখা। কোনো সন্তান যদি গরীব হয় এবং অন্যান্য সকল সন্তানের সম্মতি ও সন্তুষ্টিতে তাকে যদি অতিরিক্ত কিছু দেওয়া হয় এবং তাতে অন্য কারও যদি কোনো অভিযোগ না থাকে তবে তা বৈধ হবে, অন্যথায় তা বৈধ নয়; বরং তা জুলুম ও অন্যায় বলে বিবেচিত হবে। কাজেই আল্লাহকে ভয় করে সকল সন্তানের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো।”

একদিন এক সাহাবী বশীর ইবনে সাঈদ(রাযিঃ) তার এক সন্তান নোমানকে কিছু দান করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটে এসে তার সাক্ষী থাকার জন্য আরজ করলেন। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে বশীর! তাকে ছাড়া তোমার কি আরও কোনো সন্তান আছে?” সে বলল, “জ্বি, আছে।” তিনি তাকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি তোমার অন্য সন্তানদেরকেও তার মতো দান করেছো?” সে বলল, “জ্বি, না।” তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তাহলে তুমি আমাকে এ ব্যাপারে সাক্ষী রেখো না, কেননা আমি কোনো অন্যায় বা জুলুমের ব্যাপারে সাক্ষ্য হই না।”

অন্য বর্ণনায় এসেছে, এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত সাহাবীকে এটাও আদেশ করলেন যাতে দানকৃত বস্তু সে ফিরিয়ে নেয়।

সুতরাং, এটা প্রমাণিত হলো যে, কোনো সম্পদ সন্তানদের মাঝে সমানভাবে বিতরণ না করলে তা জুলুম হিসেবে বিবেচিত হবে। আর এই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে। কাজেই কোনো পিতামাতার উচিত নয় সন্তানদের মধ্যে বেইনসাফী ও অন্যায় করা। চাই সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক।

এ বিষয়গুলি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সচেতন হওয়ার তৌফিক দান করেন।