শিয়া ও সুন্নি উত্তরাধিকার আইনে কী পার্থক্য রয়েছে?

অর্থনীতি ০৭ মার্চ ২০২১ Contributor
মতামত
শিয়া ও সুন্নি উত্তরাধিকার
© Andrei Dodonov | Dreamstime.com

শিয়া ও সুন্নি মুসলিমদের মাঝে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে মতের মিল থাকলেও বেশ কিছু দিকে মতভেদ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ধর্ম কোনো ধরনের ভেদাভেদ সমর্থন করে না। শিয়া ও সুন্নি-র পার্থক্য যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার- এরকম মতও অনেকে পোষণ করেন।

আমাদের সমাজে শিয়া ও সুন্নি উভয় মতাদর্শের মানুষই রয়েছে। তবে শিয়া ও সুন্নি উত্তরাধিকার নীতিতে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। উভয় মতাদর্শের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধান কুরআন থেকে উদ্ভুত হলেও ব্যাখামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিয়া উত্তরাধিকার আইনে অংশ বন্টনের ক্ষেত্রে কতিপয় মৌলিক পাথক্য লক্ষ্য করা যায়। শিয়া উত্তরাধিকার আইনে উত্তরাধিকারীরা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত।

১) স্বগোত্রীয় উত্তরাধিকারী, অর্থাৎ, রক্ত সর্ম্পকীয় উত্তরাধিকারী এবং

২) বৈবাহিক সম্পর্ক সুত্রে উত্তরাধিকারী, অর্থাৎ, স্বামী ও স্ত্রীর মাধ্যমে আগত উত্তরাধিকারী

রক্ত সর্ম্পকীয় উত্তরাধিকারী

রক্ত সম্পর্কীয় উত্তরাধিকারীরা আবার তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রত্যেক শ্রেণী আবার দুটি শাখায় বিভক্ত। নীচে এই তিন শ্রেণী ও তাদের শাখাসমূহের তালিকা প্রদান করা হল-

১) ক) পিতামাতা ও খ) সন্তানসন্ততি ও তাদের বংশধরগণ, যতই নিম্নগামী হোক।

২) ক) দাদাদাদী, নানানানী ও তাদের পূর্বপুরুষগণ ও খ) ভাইবোন ও তাদের বংশধরগণ, যতই নিম্নগামী হোক।

৩) ক) মৃতের পিতৃকুল থেকে উদ্ভুত চাচা,ফুফু প্রভৃতি ও খ) মৃতের মাতৃকুল থেকে উদ্ভুত মামা, খালা প্রভৃতি এবং তার পিতামাতা দাদা-দাদী যতই উর্ধ্বের হোক এবং যতই নীচের হোক।

উপরোক্ত তিন শ্রেণীর মধ্যে ১ম শ্রেণীর ওয়ারিশরা কেউ বর্তমান থাকলে ২য় শ্রেণীর ওয়ারিশরা উত্তরাধিকার থেকে বাদ পড়ে এবং ২য় শ্রেণীর ওয়ারিশরা কেউ বর্তমান থাকলে ৩য় শ্রেণীর ওয়ারিশরা উত্তরাধিকার থেকে বাদ পড়ে। আবার প্রত্যেক শ্রেণীর অধীন অন্তর্ভুক্ত উত্তরাধিকারীরা অধিকতর নিকটবর্তীরা অধিকতর দূরবর্তীদেরকে মিরাস থেকে বঞ্চিত করে।

বৈবাহিক সম্পকের্র উত্তরাধিকারী

স্বামী-স্ত্রী কখনও পরস্পরের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়না ৷ মৃত ব্যক্তির রক্তের সম্পর্কের কাছে নিকট-আত্নীয়দের সাথে স্বামী বা স্ত্রীও উত্তরাধিকার লাভ করে ৷ স্বামী ক্ষেত্রবিশেষে এক-চতুর্থাংশ (১/৪) বা অর্ধেক (১/২) এবং স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ (১/৮) বা এক-চতুর্থাংশ (১/৪) অংশ পেয়ে থাকে।

মিরাস বন্টনের নীতি ও প্রক্রিয়া

কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকলে অংশীদার হিসেবে যে অংশ পেত তার অধঃস্তন পুরুষরাও অংশীদার হিসেবে উক্ত অংশই গ্রহণ করবে। এবং কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকলে অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে যা গ্রহণ করত তার অধঃস্তন পুরুষরাও অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে উক্ত অংশই গ্রহণ করবে।

একজন শিয়ার বৈপিত্রেয় ভাই জীবিত থাকলে অংশীদার হিসেবে পবিত্র কুরআনে নিধারিত অংশই সে পাবে, অর্থাৎ এক-ষষ্ঠমাংশ (১/৬ অংশ)। এবং আপন ভাই জীবিত থাকলে অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে ছয়ভাগের-পাঁচ ভাগ সম্পত্তি গ্রহণ করবে। বৈপিত্রেয় ভাইয়ের পুত্র একজন অংশীদারের বংশধর হওয়ায় একজন অংশীদার হিসেবে সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবে এবং পিতার প্রতিনিধিত্ব প্রদানের মাধ্যমে সে তার পিতার অংশ ,অর্থাৎ এক-ষষ্ঠমাংশ (১/৬ অংশ) লাভ করবে।

আপন ভাইয়ের কন্যা একজন অবশিষ্টাংশভোগীর সন্তান হওয়াতে সে-ও একজন অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে সম্পত্তির অংশ গ্রহণ করবে এবং পিতার প্রাপ্য ছয়ভাগের-পাঁচ ভাগ অংশ সে পাবে। সুন্নী আইন অনুযায়ী আপন ভাইয়ের কন্যা ও বৈপিত্রেয় ভাইয়ের পুত্র উভয়ই তৃতীয় শ্রেণীর দূরবর্তী আত্নীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ইমাম আবু মুহাম্মদ (রহ)-এর মত অনুযায়ী শিয়া আইনে প্রথমোক্ত ব্যক্তি ছয়ভাগের-পাঁচ ভাগ এবং শেষোক্ত ব্যক্তি এক-ষষ্ঠমাংশ (১/৬ অংশ) পাবে।

শিয়া উত্তরাধিকার আইনে উত্তরাধিকারীদের শ্রেণী বিভাগের ভিত্তিতে উত্তরাধিকারদের সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ক্রমনীতি অনুসরণ করা হয়ঃ

ক) প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারী থাকলে পরবর্তী দুটি শ্রেণী বঞ্চিত হয়।

খ) দ্বিতীয় শ্রেণীর উত্তরাধিকারী উপস্থিত থাকলে তৃতীয় শ্রেণী বঞ্চিত হবে।

গ) কিন্তু তৃতীয় শ্রেণীর এক ভাগ অন্য কোনো শ্রেণীকে বঞ্চিত করে না।

যেমনঃ উদাহরণ ১

একজন শিয়া মুসলমান যদি কন্যার পুত্র, পিতা মাতা ও ৩ জন আপন ভাই রেখে মারা যায়, তবে কন্যার পুত্র সম্পূণ অংশ পাবে, পিতামাতা এক-ষষ্ঠমাংশ (১/৬ অংশ) পাবে এবং আপন ভাই ছয়ভাগের-পাঁচ ভাগ পাবে।

উদাহরণ ২

একজন শিয়া মুসলিম মৃত্যুর সময় নিম্নোক্ত উত্তরাধিকারী রেখে গেলঃ

পিতা (১ম শ্রেণীভুক্ত), মাতা (১ম শ্রেণীভুক্ত), ১ কন্যা (১ম শ্রেণীভুক্ত), ১ পুত্রের কন্যা (১ম শ্রেণীভুক্ত), এক ভাই (২য় শ্রেণীভুক্ত) এববং ১ চাচা (৩য় শ্রেণীভুক্ত)

অতএব এই ব্যক্তির উত্তরাধিকারী প্রাপ্ত হবে শুধু তাঁর পিতা, মাতা ও কন্যা।