শুকনো গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ, রইল ১০টি টোটকা

স্টাইল Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ
© Elena Schweitzer | Dreamstime.com

সুগন্ধী হিসেবে গোলাপের পাপড়ি আতরে বা রান্নায় আপনারা অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন, কিন্তু গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ কী, সে কথা জানেন কি? ইসলামি সংস্কৃতিতে গোলাপ বা ‘গুলাব’-এর স্থান বিশেষ আলাদা। ইসলামি ঐতিহ্যে গোলাপ হল ‘বেহেস্তের ফুল’। বিয়ে-শাদির মতো আনন্দের অনুষ্ঠানে বা কারওর ইন্তেকাল হলে সেসময় গোলাপের বিশেষ ভূমিকা থাকে। পবিত্র গোলাপ বেহেস্তের সৌন্দর্য ও প্রফেট মহম্মদের প্রতীক চিহ্নস্বরূপ। প্রত্যেকবছর মক্কায় হজের সময় কাবার কালো কাপড়ের উপর ইরান বা তুরস্ক থেকে আনা গোলাপের পানি ছিটানো হয়। কাবার তেলের কুপিগুলিতেও গোলাপের তেল দেওয়া থাকে, ফলে সেই সুগন্ধে আশপাশ আমোদিত থাকে।

মধ্যযুগীয় তুরস্কে জনপ্রিয় ছিল গোলাপ

তুর্কি ভাষায় গোলাপ ‘গুল’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের পাতা উল্টোলে দেখা যাবে, প্রাচীনকাল থেকেই দামাস্কাসের বিখ্যাত গোলাপের পাপড়ি থেকে তৈরি করা গোলাপের পানি এবং গোলাপের তেল তুরষ্কের সুলতান থেকে শুরু করে আমজনতার কাছে বিশেষ প্রিয় ছিল। নানারকম সুগন্ধীর পাশাপাশি সুলতানি খানাতেও স্বাদ ও গন্ধ আনতে গোলাপের পাপড়ি ব্যবহার করা হত। একাদশ শতকে পারস্যের খ্যাতনামা চিকিৎসক ইবন সিনার ‘দ্য ক্যানন অফ মেডিসিন’ গ্রন্থে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও দ্রুত হৃদস্পন্দনের চিকিৎসায় গোলাপকে ব্যবহারের কথা জানা যায়।

চোখের সমস্যায় এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতেও গোলাপের পানির স্টিম নেওয়ার নিদান দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের অটোমান চিকিৎসকদের লেখায় গোলাপের শুকনো পাপড়ির ওষধিগুণের কথা জানা যায়। সেযুগে সুলতানদের বমির সমস্যা দূর করতে গোলাপের শরবত ছিল বহুল প্রচলিত। এছাড়া স্নায়ুর সমস্যা দূর করতে ও অ্যান্টি-ডিপ্রেশান্ট হিসেবেও গোলাপের পানিকে কাজে লাগানো হত। রূপচর্চার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ত্বকের নানা সমস্যা দূর করে ত্বককে নরম ও উজ্জ্বল করতেও সে-যুগে তুরস্কের মহিলামহলে গোলাপের দারুণ কদর ছিল।

তবে প্রাচীনকালে তো বটেই, শুকনো গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণের জন্য এখনও ত্বকের যত্ন থেকে শুরু করে নানাবিধ কাজে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। আজকে আমরা গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ নিয়ে আলোচনা করব।

১. হজমে সাহায্য করে গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ

আগেই বলেছি অটোমান সুলতানদের বমির চিকিৎসায় গোলাপের শরবত ব্যবহার করা হত। গোলাপের পাপড়ির একটি সুন্দর আরামদায়ক ক্ষমতা রয়েছে। এটি অনেকসময় জোলাপ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। পেট ঠান্ডা করতে ও হজমের সমস্যায় প্রাচীনকাল থেকেই শুকনো গোলাপের পাপড়ির ব্যবহার হয়ে আসছে। আপনি পানিতে শুকনো গোলাপের পাপড়ি ভিজিয়ে রেখে, সেই পানি দিয়ে গুলাব শরবত তৈরি করে নিতে পারেন। যে-কোনও পেটের সমস্যায় উপকার পাবেন।

২. স্মৃতি ও চোখের সমস্যায় গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ

শুকনো গোলাপের পাপড়ির মধ্যে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান থাকে। স্মৃতিশক্তি জনিত সমস্যায় ও চোখের সমস্যায় একে আপনি টনিক হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন।

৩. সর্দিকাশির সমস্যায় রোজ পেটাল টি

আজ্ঞে হ্যাঁ। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি এমন গালভরা নামের চা কিন্তু হাল আমলে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি টোটকা! এই চা আদতে শুকনো গুঁড়ো করা গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি হয়। আপনি অনায়াসে এটি বাড়িতেও বানিয়ে নিতে পারেন। গলা ব্যথা, শ্বাসনালীতে শ্লেষ্মা জমে বন্ধ হয়ে যাওয়া, ঠান্ডা লাগার ঘরোয়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে আপনি এটি ব্যবহার করতে পারেন। দেখবেন, রোজ পেটাল টি আপনাকে সর্দিকাশির ক্ষেত্রে সুন্দর আরামদায়ক একটি অনুভব দেবে। এছাড়া গোলাপের পাপড়ি মেশানো ‘রোজ হানি’ খেলে আপনি গলা ব্যথা থেকেও দ্রুত মুক্তি পাবেন।

৪. পিরিয়ডের ব্যথায় গোলাপের পাপড়ি

প্রাচীন চিনে পিরিয়ডের ব্যথা কমাতে গোলাপের ব্যবহার ছিল বহুল প্রচলিত। বর্তমানেও এই টোটকাটি সমান কার্যকরী। পিরিয়ডের সময় আপনার যদি অত্যধিক পেট ব্যথা করে বা অস্বাভাবিক বেশি পিরিয়ড হয়, তাহলে আর দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই। অনিয়মিত পিরিয়ড থেকে শুরু করে পিরিয়ডের সময় পেট ব্যথা, এমনকী বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যা, যৌনচাহিদা সংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রেও শুকনো গোলাপের পাপড়িকে কাজে লাগাতে পারেন। গোলাপের পাপড়ির পলিফেনলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা এই পেট ব্যথা সহজেই দূর করে।

৫. ক্যানসার রোধে গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ

এছাড়া ক্যাফেইন মুক্ত এই রোজ পেটাল টি নিয়ম করে খেলে তা শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয় এবং শরীর থেকে ফ্রি র‍্যাডিকালকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা গ্যালিক অ্যাসিড, অ্যান্থোসায়ানিনের অ্যান্টি-ক্যানসার, অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট ক্যানসারের মতো মারণ রোগকেও দূরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক। তবে এক্ষেত্রে দোকান থেকে কিনে আনা রোজ পেটাল টি-এর বদলে বাড়িতেই গোলাপের পাপড়ি শুকিয়ে গুঁড়ো করে চা বানিয়ে নিন। সেটি খাঁটি হবে, তাই উপকারও পাবেন।

৬. ত্বকের সমস্যায় ম্যাজিকের মতো সমাধান

প্রাচীনকালে বেগমদের সৌন্দর্যের রহস্য কিন্তু লুকনো থাকত গোলাপের পাপড়িতেই! তাঁদের মসৃণ, উজ্জ্বল ত্বকের টোটকা ছিল গোলাপ। গোলাপফুলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে। গোলাপ শুকিয়ে গেলেও তার পাপড়ির মধ্যে সেই ভিটামিন সি থেকে যায়। যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় আপনার ত্বক বুড়িয়ে যাচ্ছে তাহলে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ফেসপ্যাক বানিয়ে নিতে পারেন। কাজে লাগাতে পারেন গোলাপের পানিকেও। এটি ত্বকে কোলাজেনের উৎপাদন বাড়িয়ে ত্বককে নরম রাখে। এছাড়া ত্বক কালচে হয়ে যাওয়া, ব্রণর সমস্যা থেকেও দ্রুত মুক্তি দিতে পারে গোলাপের পাপড়িতে থাকা ভিটামিন সি ও ই। ত্বকের কোনও কাটা-ছেঁড়া ইত্যাদি দূর করতেও গোলাপের পাপড়ি কাজে লাগে।

কীভাবে বানাবেন ফেসপ্যাক?

আমন্ড বাদাম দুধে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর কয়েকটি শুকনো গোলাপের পাপড়ি এবং ভেজানো আমন্ডগুলি একসঙ্গে নিয়ে অল্প দুধ দিয়ে পেস্ট করে নিন। ওর মধ্যে সামান্য মধু, গোলাপের পানি আর কেশর দিন। একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে ভাল করে লাগিয়ে নিন। মিনিট ২০ রেখে ধুয়ে ফেলুন। নিয়ম করে এই ফেসপ্যাক ব্যবহার করলে দেখবেন ত্বক সুন্দর নরম থাকছে, এবং সমস্ত কালো দাগ দূর হয়ে যাচ্ছে।

৭. লিভারের সমস্যায় গোলাপের পাপড়ি

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, লিভারের সমস্যাতেও শুকনো গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ বিশেষ কাজে দেয়। এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণাবলী লিভারকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ও লিভারের কাজ স্বাভাবিক রাখে।

৮. স্ট্রেস কাটাতে গোসলের পানিতে গোলাপের পাপড়ি

অফিসের স্ট্রেস থেকে শুরু করে সংসারের চাপ… একবিংশ শতকের আধুনিক জীবনে এখন কেবলই স্ট্রেস আর স্ট্রেস! এই স্ট্রেস, টেনশনকে তুড়ি মেরে দূরে সরাতে ভরসা করতে পারেন গোলাপের পাপড়িকে। অফিস থেকে ফিরে বা সমস্ত কাজের শেষে আধকাপ শুকনো গোলাপের পাপড়ি, একমুঠো পুদিনাপাতা আর দু’চামচ পাতিলেবুর রস একসঙ্গে নিয়ে আপনার গোসলের পানিতে মিশিয়ে নিন। ইচ্ছে হলে পানি হালকা গরম করে নিতে পারেন। এরপর ভাল করে সেই পানিতে গোসল করুন। দেখবেন সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষেই কেটে গিয়েছে, আপনিও দিনের শেষে আবার চনমনে বোধ করবেন।

৯. মুড ভাল রাখতে

মুড ভাল রাখতেও কিন্তু গোলাপের পাপড়ির জুড়ি নেই। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি করা গোলাপের পানিই বলুন, কী গোলাপের তেল বা রোজ এসেনশিয়াল অয়েলই বলুন, এর সুন্দর গন্ধ যে-কোনও সময় আপনার মুডকে ভাল রাখার পক্ষে কার্যকরী। গোলাপের পাপড়ি মনকে আরামদায়ক ও রিল্যাক্সড হতে সাহায্য করে। যারা অনিদ্রার সমস্যায় ভোগেন, তাঁরা তাঁদের বালিশের মধ্যে গোলাপের শুকনো পাপড়ি ভরে দেখতে পারেন। সহজে ঘুম চলে আসবে।

১০. ওজন কমাতে গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ

নানারকম উপকারিতার পাশাপাশি গোলাপের শুকনো পাপড়ি দিয়ে তৈরি চা ওজন কমানোর পক্ষেও সহায়ক। ক্যাফেইনের বিকল্প হিসেবে এই চা খিদে কমায় ও মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে। এছাড়া শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন দূর করতেও এর জুড়ি নেই। তাছাড়া গোলাপের শুকনো পাপড়িতে থাকা ভিটামিন সি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।

তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন, বিরিয়ানি, পোলাও ইত্যাদি শাহী খানাতে স্বাদ ও গন্ধ যোগ করতে তো বটেই, শুকনো গোলাপের পাপড়ির ওষধি গুণ থাকার কারণে একে ঘরোয়া চিকিৎসাতেও কাজে লাগাতে পারেন। ফলে আর দেরি করবেন না। মনে রাখবেন, সুস্থ থাকতে গোলাপের পাপড়ি ব্যবহার করা কিন্তু জরুরি।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.