SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

শেভিয়ের ইসলামী শাসনের উত্থান ও পতন

বিশ্ব ০৫ ফেব্রু. ২০২১
জানা-অজানা
শেভিয়ের
Photo by Rodrigue Boudine from Pexels

শেভিয়ের নাম মূলত আমরা জানি তার বিখ্যাত ফুটবল টিমের সৌজন্যে। কিন্তু এই শহরের ইসলামী ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে ইসলামী শাসনের অধীনে এই শেভিয়ে শহর মধ্যযুগে পশ্চিমী দুনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত শহরে পরিণত হয়েছিল।

শেভিয়ের ইসলামী শাসনের সূত্রপাত

৬৯৪ সালে, অর্থাৎ ৯২ হিজরির মধ্যে, ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তর আফ্রিকা, পারস্য এবং শ্যাম দেশে। আল-আন্দালুস (স্পেন) সেই সময় ভিসিগথ রাজা রোডেরিকের অত্যাচারী শাসনের অধীনে ছিল, যিনি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের শোষণ করার পাশাপাশি নির্দ্বিধায় গ্রেপ্তার ও হত্যা করতেন। ইতিহাস অনুসারে, একজন খ্রিস্টান চিফ জুলিয়ান, তিনি স্পেন থেকে পালিয়ে যান এবং অপর প্রান্ত থেকে মুসলিমদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করেন।

উত্তর আফ্রিকার উমাইয়া গভর্নর, মুসা বি. নুসায়ের, তার উত্তরে নিজের এক সাহসী জেনারেল এবং ১২ হাজার সেনার একটি বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। এই সেনাবাহিনী এমন একটি স্থানে পৌঁছয় যা ভূমধ্যসাগরে প্রবেশপথের নিকটবর্তী। সেই বছর রমজানের সময়, তাঁদের মোকাবিলা করার জন্য রোডেরিক স্বয়ং ৯০ হাজার সৈন্য নিয়ে হাজির হন। এর ফলে মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে ভয় ও সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে। সে কথা জানতে পেরে মুসলিম জেনারেল তাঁর অনুগামীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তাদের জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই নির্ভীক জেনারেল হলেন, তারিক বি. জিয়াদ। সব জাহাজ পুড়িয়ে ফেলার পরে, তিনি সেনাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “ এবার আমরা হয় শত্রুদের পরাজিত করে জয়লাভ করব, কিংবা এই সমুদ্রের জলে ডুবে কাপুরুষের মতো মৃত্যুবরণ করব।“

তাঁর এই কথা শুনে সেনাবাহিনী অনুপ্রেরণা পায় এবং সাহেসর সাথে শত্রুর মোকাবিলা করে এবং আল্লাহের করুণায় তাঁরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। এর এক বছর পরে, মুসা বি. নুসায়ের স্পেনে অবতীর্ণ হন ১৮ হাজার দক্ষ মুজাহিদের সাথে। তাঁরা দ্রুত সিদোনিয়া, কারমোনা এবং, দীর্ঘ যুদ্ধের পরে হিসপালিস দখল করে। এই শহরের নাম হিসপালিস রেখেছিলেন রোমানরা, এবং পরবর্তী কালে ভিসিগথরা তার নামকরণ করেছিল স্পালিস। মুসলিমরা এই শহরের ক্ষমতা দখল করার পরে এর নতুন আরবী নামকরণ করা হয় ইসবিলিয়াহ। এই নাম স্পেনীয়রা উচ্চারণ করত শেভেলিয়া, এর থেকেই এই শহরের বর্তমান নাম শেভিয়ে রাখা হয়েছে।

শেভিয়ের উমাইয়া শাসন

আল-আন্দালুসে উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ৭৫৫ সালে, যুবরাজ প্রথম আবদ আল-রহমানের আগমনের হাত ধরে। তাঁর পরিবার, যাঁরা দামাস্কাসকে কেন্দ্র করে ৬৬১ সাল থেকে গোটা মুসলিম জগৎকে শাসন করেছিল। সুদূর খুরাসানে উদ্ভূত এক আন্দোলনের জেরে এই বংশের শাসন সমাপ্ত হয়েছিল এবং ৭৫০ সালে, বাগদাদকে নতুন রাজধানী করে শাসন শুরু করে আব্বাসীয় খলিফারা। আবদ আল-রহমান তাঁর পরিবারের গণহত্যার সময় কোনও ভাবে নিষ্কৃতি পেয়েছিলে, এবং পশ্চিমে পালিয়ে এসেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই স্পেনে নতুন ভাবে মুসলিম শাসন শুরু হয়, যা ১০৩১ সাল পর্যন্ত কায়েম ছিল। ইসবিলিয়াহ তিন বছরের জন্য আল-আন্দালুসের রাজধানী ছিল, তারপরে রাজধানী কুর্তুবা (কর্ডোবা)-তে স্থানান্তরিত হয়।

উমাইয়া শাসনের পরবর্তী পর্যায়

১০৩১ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে আন্দালুসিয়াতে উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে এবং এরপরে স্বাধীন রাজাদের শাসন শুরু হয়। সেই সময় আন্দালুসিয়া ছিল ইউরোপের অন্যতম ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র, যা গৃহযুদ্ধে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল।

তার ফলস্বরূপ, এই সাম্রাজ্য ভেঙে একাধিক ছোট ছোট পারস্পরিক শত্রুভাবাপন্ন এমিরেটের উদ্ভব হয় এবং এই পরিস্থিতি তাফিয়া রাজাদের – বা ক্ষুদ্র রাজা (দ্য পেটি কিংস)-দের রাজত্ব শুরু হয়। এই তাফিয়া রাজারা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, কারণ এদের কোনও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিল না। ১০৪২ সালে এমনই এক তাফিয়া রাজা, আল-মুতাদিদ, ইসবিলিয়াহের ক্ষমতা দখল করেন এবং পশ্চিম আল-আন্দালুসে নিজের প্রভাব বিস্তার করার জন্য অবিরাম যুদ্ধ করতে থাকেন এবং ক্রমশ তিনি পর্তুগালের আটলান্টিক দ্বীপে পৌঁছন।

এই সময়, আল-মুতাদিদের পুত্র, আল-মুতামিদকে উত্তরের খ্রিস্টান শাসক, ষষ্ঠ আলফোনসোকে নিয়মিত নজরানা পাঠাতে হত। কিন্তু তিনি তা বন্ধ করতে চেয়ে, উত্তর আফ্রিকার মহান মুসলিম ব্যক্তিত্ব, ইউসুফ বি. তফসিনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ইউসুফ বি. তফসিন সেই সময় আফ্রিকা সংস্কার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তাঁর শক্তিশালী সেনাবাহিনী ১০৮৬ সালে স্পেনে প্রবেশ করে এবং যুদ্ধে ষষ্ঠ আলফোনসো পরাজিত হন। এরপরে ইসবিলিয়াহ সরাসরি ইউসুফ বি. তফসিনের ছত্রছায়ায় চলে আসে। তখন তিনি মরক্কোতে ফিরে যান, কিন্তু ক্রমশ উপলব্ধি করেন যে, এই তাফিয়া রাজাদের পক্ষে নিজেদের মতবিরোধ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। ১০৯১ সালে তিনি পুনরায় স্পেনে আসেন এবং আল-আন্দালুসের সমস্ত মুসলিম রাজ্যের শাসনভার নিজের হাতে নেন। ১০৯১ থেকে ১১৪৭ সাল পর্যন্ত, পরবর্তী ৫৬ বছর তিনি রাজত্ব করেছিলেন।

এরপরে আলমোহাদরা ক্ষমতা দখল করে। ১২৪৮ সালে খ্রিস্টানরা ক্ষমতা দখল করার আগে পর্যন্ত, এরাই শেভিয়ের শাসক ছিল। ১২৪৮ সালের ২২ ডিসেম্বর কাস্তিলের তৃতীয় ফার্নেন্দো ইসবিলিয়াহের দখল নেন এবং এই ঐতিহ্যময় শহরে মুসলিম শাসনের সমাপ্তি ঘটে।