শোকর বা কৃতজ্ঞতা মানুষকে সুখী থাকতে সাহায্য করে

dreamstime_s_173815045

দুনিয়ার বুকে আল্লাহ যেসকল নিয়ামত দান করেছেন তা পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং আল্লাহর সকল ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকাকেই সাধারণভাবে কৃতজ্ঞতা বা শোকর বলে। আর যারা অল্পের প্রতি তুষ্ট থাকেন তারাই হন দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী। কোনো কিছুর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা মানবীয় গুণাবলীর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম গুণ। এ কারণেই আল্লাহর মুমিন বান্দারা সর্বদাই অল্পে তুষ্ট থাকেন এবং শোকর আদায় করেন।

বিশেষ নেয়ামত

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা তার সাধারণ ও বিশেষ নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্বরণ করো। আল্লাহ ছাড়া কি কোনো স্রষ্টা আছে, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযিক দান করে? আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।” (আল কুরআন-৩৫:৩)

আল্লাহর ইবাদত ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায়ের দায়িত্ব আদায়ের জন্যই আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এসব নেয়ামতরাজি দিয়েছেন।

মানুষ অনেক নেয়ামতের কথা জানলেও অধিকাংশই তার জানা থাকে না। মানুষের অজান্তেই বহু নেয়ামত আল্লাহ মানুষকে দিয়ে থাকেন। অসংখ্য বিপদ-আপদ থেকে তাকে রক্ষা করেন। এছাড়া মানুষের কোনো ইচ্ছা ছাড়াই শরীরের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার শরীর ও জীবনের উপকারার্থে অনবরত কাজ করে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, “আর তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে গণনা করতে চাইলেও তা গুনে শেষ করতে পারবে না।” (আল কুরআন-১৪:৩৪)

আল্লাহর আনুগত্য, ইবাদত, পৃথিবীকে সঠিকভাবে বিনির্মাণ ও সংশোধন করতে এসব নেয়ামত দিয়ে আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। এ বিষয়টিই কুরআনে বলা হয়েছে, “আর এভাবেই তিনি তার নেয়ামতকে তোমাদের প্রতি পূর্ণ করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ করো।” (আল কুরআন-১৬:৮১)

যে আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত নেয়ামতরাজিকে তার সন্তোষ ও পছন্দের কাজে ব্যবহার করে, সেগুলোকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক বানায়, সৃষ্টির প্রতি সদাচরণ প্রদর্শন করে, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে, সে ব্যক্তিই নেয়ামতের যথার্থ শোকর আদায় করল। আর যে আল্লাহর অসন্তোষ উদ্রেককারী কাজে সেগুলোকে ব্যবহার করে, তার ওপর ন্যস্ত অন্যের অধিকার আদায় না করে সে নেয়ামতের না-শোকরী করল।

কী নির্দেশ রয়েছে আমাদের জন্য?

আল্লাহ আমাদেরকে তার শোকর আদায়ের জন্য নির্দেশ দিয়ে বলেন, “তোমরা যদি আমাকে স্মরণ করো, তাহলে আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর আমার শোকর আদায় করো। আমার অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো না।” (আল কুরআন-২:১৫২)

আল্লাহ তা’আলার উপর ঈমান আনা সবচেয়ে হল বড় শোকর বা কৃতজ্ঞতা। নেয়ামতের মধ্যে সবচেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা বা না-শোকরী হল কুরআন ও সুন্নাহকে অস্বীকার করা; কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করা। সুতরাং, ইসলামকে অস্বীকার করে অন্য যে কোনো নেয়ামতের শোকর আদায় করলে তা কোনো কাজে আসবে না।

আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দাদের নেয়ামত স্থায়ী, বর্ধনশীল ও বরকতময় করার ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন, “যদি তোমরা শোকর আদায় করো আমি তোমাদের নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি না-শোকরী করো তবে আমার শাস্তি অতি কঠোর।” (আল কুরআন-১৪:৭)

শোকরগুজার বান্দারা দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ লাভে ধন্য হবেন। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারীদেরকে অচিরেই যথার্থ প্রতিদান দেবেন।” (আল কুরআন-৩:১৪৪)

এ কারণেই ইসলামের শিক্ষা হলো সর্বদা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা ও সঠিক পথে অবিচল থাকা। আর ইসলামের শিক্ষা মেনে চলে যারা সর্বাবস্থায় শোকর আদায় করে তারাই মূলত দুনিয়াতে প্রকৃত সুখ লাভ করে। কোনো হতাশা তাদেরকে গ্রাস করে না।

আমরা তাহলে কিভাবে শোকর হাছিল করতে পারি? সে সম্পর্কে কার্যকারী কিছু পন্থা নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

-আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহ সমূহকে সর্বদা স্মরণ করা। তাঁর নেয়ামতরাজি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। সবিশেষ চিন্তা করবে নিজের প্রতি আল্লাহ তা’আলার কত অগণিত নেয়ামত সদা সর্বদা বর্ষিত হচ্ছে সেগুলো সম্পর্কে। তবেই হৃদয়ের গভীর থেকে বের হবে শুকরিয়ার ধারা।

-সব নেয়ামতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনে করা।

-কোনো নেয়ামত সাময়িক হাত ছাড়া হয়ে গেলে তাকেও নিজের জন্য কল্যাণকর মনে করা।

উল্লেখ্য- আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত কোনো নেয়ামতের ভিত্তিতে শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেই শোকর আদায়ের জন্য যথেষ্ট হবে না; বরং প্রকৃত শোকর তো হল নেয়ামতের ভিত্তিতে মনে মনে আল্লাহর প্রতি প্রফুল্ল হওয়া এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে নেয়ামত দাতা আল্লাহর হুকুম পালনে তৎপর হওয়া। তবে এর সাথে সাথে খুশিতে যবান থেকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বের হলে সেটাও ইবাদত বলে গণ্য হবে এবং সওয়াবের কারণ হবে।