শোক পালনে কী বিধান দিয়েছে ইসলাম?

muslim woman in grief
ID 76048364 © Mohamed Ahmed Soliman | Dreamstime.com

এই মুহূর্তে শোকস্তব্ধ গোটা বিশ্ব। কয়েক হাজার পরিবার হারিয়েছে তাঁদের প্রিয়জন। বাবা, মা ভাই, বোন, স্বামী স্ত্রী সন্তান সম্পর্ক যাই হোক না কেন রোগ বয়স দেখছে না, জাতি,ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়ছেন। স্বজন হারা হাহাকার শোনা যাচ্ছে ইতালী জুড়ে। এশিয়া ইউরোপ আমেরিকা সর্বত্রই অসহায়তার ছাপ। সকলেই সাহাজ্য চাইছেন। পরম করুণাময় ঈশ্বরের শরণাপন্ন হচ্ছেন। দুঃখ বা শোকের জন্য সান্ত্বনা কখনোই পর্যাপ্ত নয়। তবুও এ সময় একটি মুসলমান পরিবারের করণীয় তা জানতে হাদীসের শরণাপন্ন হতে পারি আমরা।

শোক প্রকাশে কী নিয়ম রয়েছে 

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, (দুনিয়ার) প্রতিটি মানুষকেই মৃতু্যর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। মানুষের আত্মীয় স্বজন মারা গেলে কান্নাকাটি-আহাজারি তথা হাউ-মাউ করে বিলাপ শুরু করে দেয়। অথচ ইসলামে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করা নিষিদ্ধ। তবে হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনদিন পর্যন্ত শোক পালন করা যাবে বলে ঘোষণা করেছেন। জন্ম-মৃত্যু মহান আল্লাহর চিরন্তন বিধান। যে কারো জন্ম আমাদেরকে আনন্দ দান করে এবং যে কোনো মুমিনের মৃত্যুতে আমরা শোকে কাতর হয়ে যাই। অর্থাৎ জন্ম আমাদেরকে আনন্দ দান করে এবং মৃত্যু আমাদেরকে শোকাহত করে। কারো দুঃখে দুঃখিত হওয়া, কারো মৃত্যুতে শোকাহত হওয়াটা স্বাভাবিক। ইরশাদ হচ্ছে ‘মানুষ ধন-সম্পদ প্রার্থনায় কোনো ক্লান্তিবোধ করে না, কিন্তু যখন তাকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে অত্যন্ত নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়ে’ (সূরা : হামীম আস-সাজদা, আয়াত : ৪৯)। কারো দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করা বা শোক প্রকাশ করার বিষয়টি পবিত্র কুরআন দ্বারা স্বীকৃত। কারো মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করার বিষয়টি অগণিত হাদিস দ্বারা সুষ্পষ্ট প্রমাণিত। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমরা রাসুল (সা.) এর কন্যা উম্মে কুলসুমের দাফনে হাজির হলাম। রাসুল (সা.) তখন কবরের পারে বসা আছেন, আমি দেখলাম তখন তাঁর দুচোখ অশ্রু বিসর্জন করছিল’ (বুখারী, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-১৪৯)।

হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে চুমু দিয়েছিলেন এবং তিন দিন কেঁদেছিলেন। যা হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন-

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ায় চড়ে তাঁর বাড়ি থেকে এসে অবতরণ করলেন। অতপর মসজিদে প্রবেশ করলেন। ওই সময় ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কারো সঙ্গে কথা না বলে হজরত আয়েশার ঘরে প্রবেশ করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তায়াম্মুম করাচ্ছেন এ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিবারা তথা চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা (আবৃত অবস্থা থেকে উন্মুক্ত) খুললেন এবং ঝুঁকে পড়ে তাঁর দু`চোখের মাঝখানে চুমু দিলেন এবং কাঁদলেন, অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর নবি! আপনার জন্য আমার বাবা-মা কোরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দু`বার মৃত্যুকে একত্রিত করবেন না। আপনার যে মৃত্যু হলো এটা হয়েই থাকে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত জাফরের পরিবারকে তিন দিনের অবকাশ দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের নিকট আসবেন। অতপর তাদের নিকট আসলেন এবং বললেন আজকের দিন পর তোমরা আমার ভাইয়ের প্রতি আর কেঁদো না।

সুতরাং প্রতিটি মানুষের জন্য মৃত্যুর পর তিনদিন শোক পালন করা যাবে। মৃতব্যক্তির চেহারা উম্মুক্ত করা এবং দু’চোখের মাঝখানে (কপালে) চুমু দেয়া যাবে। তা ইসলামে বৈধ। হাউমাউ করে কান্না কাটি করা বৈধ নয়। তা করা যাবে না। এ কান্নায় চোখের পানি পড়বে কিন্তু শব্দ হবে না।