SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

শোষণমূলক ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার কান্ডারী ভাস্কো দা গামা 

সংস্কৃতি ০৩ আগস্ট ২০২০
vasco da gama
Vasco da Gama statue in Lisbon. ID 30216262 © Pepe14 | Dreamstime.com

১৪৯৭ সালে দা গামা যুগের সূচনা। এই জমানায় প্রচুর ধন-সম্পদ-প্রাচুর্যে ভরে উঠেছিল ইউরোপ কিন্তু উপনিবেশভুক্ত ব্যক্তিদের কখনওই জিজ্ঞাসা করা হয়নি যে তারা এই অধিগ্রহণ স্বীকার করতে চান কি না,বলেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক গেলি।

ভাস্কো দা গামা ছিলেন এক পর্তুগিজ নাবিক, যিনি ১৪৯৭ সালে ৮ জুলাই লিসবন থেকে ভারতে আসার জন্য তিনটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কেপ অফ গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ পেরোনোর পরে তিনি  ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে ভারতের কালিকটে এসে পৌঁছন ১৪৯৮ সালে। এরপরেই ভাস্কো দা গামা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক নতুন যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, যার ভিত্তি শুধুই বাণিজ্য ছিল না, ধর্মও ছিল। তিনি পর্তুগালে এতটাই জনপ্রিয় যে তিনিই হলেন পর্তুগালের জাতীয় কবিতা লুসিয়াদসের নায়ক। 

পঞ্চদশ শতাব্দীর কথা

১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মেহমেটের কাছে কনস্টান্টিনোপালের পতন এবং ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ইউরোপীয়দের পূর্ব দিকে নতুন বাণিজ্যিক রুট সন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। মরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, জায়ফল, আদা এবং অন্যান্য মশলা তখন পাশ্চাত্যের  মানুষের কাছে খুবই লোভনীয় পণ্য ছিল। তাদের একঘেয়ে খাবারে এই ধরনের মশলা যোগ করলে দারুণ স্বাদ ও গন্ধ হত। অনেক মশলা আবার ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হত, যেহেতু তাদের মধ্যে রোগ নিরাময়ের গুণ রয়েছে। দা গামার সমুদ্রসীমা পেরোনোর প্রচেষ্টার জন্য তিনি অসাধারণ পুরস্কার পেয়েছিলেন কারণ তিনি ভ্রমণ থেকে ফিরে আসার পরে ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া মশলা আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি হয়েছিল।

ইতিহাসে এও কথিত রয়েছে, প্রাচ্যের এক শক্তিশালী খ্রিস্টান রাজা প্রেষটার জনের কাছে দূত হিসেবে অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামাকে প্রেরণ করেন পর্তুগালের রাজা ম্যানুয়েল। মূল লক্ষ্য ছিল, ওই খ্রিস্টান শাসকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটানো। কিন্তু এই তত্ত্বের তেমন জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যাই হোক অন্তরীপ পেরোনোর পরে, পূর্ব উপকূলীয় আফ্রিকা অঞ্চলে পর্তুগিজ নাবিকরা বুঝতে পারে যে, যে সব মানুষদের তাদের পরিচয় হচ্ছে তারা সকলেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। দা গামা তাই মনে করেছিলেন, মুসলমান হওয়ার ভান করাই তখন সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত কাজ। কিন্তু মোজাম্বিকের সুলতান এই নাবিককে বিশ্বাস করেননি। সর্বোপরি, এই অপরিচিত ব্যক্তিরা যে উপহার নিয়ে এসেছিল তার মধ্যে রূপো বা সোনা ছিল না এবং পর্তুগীজদের আচরণে বিরক্ত জনগণও বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। এরপরে যত জায়গায় জাহাজটি তীর স্পর্শ করেছিল, সর্বত্র অনুরূপ নেতিবাচক অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন দা গামা। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত 8 জুলাই পর্তুগীজরা ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছেছিল।

ভারতে পৌঁছে

কালিকটের হিন্দু শাসক জামোরিন প্রথমে অপরিচিত লোকদের স্বাগত জানালেও, তাদের দেওয়া সীমিত উপহার তাঁর মনে হতাশা ও সন্দেহ বাড়ায়। তাঁর মনে সন্দেহ হয়, কোনও রাজার দূত কীভাবে সোনা ছাড়া আসতে পারেন? বরং মুসলিম বণিকরা স্পষ্টতই নিজেদের মতামতে জানিয়ে বলেন যে, দা গামা কোনও রাজার পাঠানো সরকারী বার্তাবাহক নন। এরপরে জামোরিন শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন এবং টাকা চান। এই পরিস্থিতিতে দা গামা বেশ কয়েক জন ভারতীয়কে বন্দি করে এবং জাহাজ মশলায় বোঝাই করে পর্তুগালে ফিরে যান। লিসবনে পৌঁছনোর সময় তিনি একটি জাহাজ হারান এবং তাঁর কর্মচারীদের অর্ধেকে স্কার্ভি এবং অন্যান্য রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। দেশে পৌঁছনোর পরে পর্তুগালের রাজা ম্যানুয়েল তাঁকে কাউন্ট অফ ভিদিগুয়েরা হিসেবে ঘোণা করেন এবং তাঁকে ‘ইথিওপিয়া, আরব, পারস্য এবং ভারতবর্ষ জয়, নৌচালন এবং বাণিজ্যের লর্ড’ হিসাবে প্রশংসা করেছিলেন।

এটা ধরে নেওয়া উচিত নয় যে, শুধুমাত্র মুসলমানরাই ভাস্কো দা গামার শোষণের বিরোধী ছিল। আসলে, তাঁর সাফল্যের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল আরেকটি খ্রিস্টান দেশের, ভেনিস প্রজাতন্ত্র, যার বিশাল সম্পদভান্ডার গড়ে উঠেছিল মূলত মশলার ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই। নিজেদের ধনভান্ডার নিয়ে গর্বিত, ভেনিস স্বাভাবিক ভাবেই পর্তুগালের এই সাফল্যে ক্ষুব্ধ ছিল। তারা মিশরের সুলতান এবং তুর্কিদের পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে এক ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ততদিনে ভেনিসের বাণিজ্যিক গৌরব অস্ত গেছিল। প্রাচীন, ‘অত্যন্ত নির্মল প্রজাতন্ত্র’ ধ্বংস হয়ে গেছিল।

পর্তুগালের আর্থিক রমরমা

এই অভিযানের আগে পর্যন্ত পর্তুগাল ছিল একটি নগণ্য, সীমান্তবর্তী দেশ, যার জনসংখ্যা এবং ভূখণ্ড খুবই কম ছিল। দা গামা এই দেশকে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশ হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, একটি আধুনিক সাম্রাজ্যের শক্তি তার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের উপরে নির্ভর করে না বরং তা রয়েছে সামুদ্রিক শক্তি ও বাণিজ্যের রাশ হাতে রাখার মধ্যে। ইংল্যান্ড অবশ্যই এই শিক্ষা অন্তর থেকে গ্রহণ করেছিল এবং ভবিষ্যতে কাজে লাগিয়েছিল …

বিখ্যাত নাবিক হলেও তাঁকে মানুষ হিসেবে কতটা ভালো বলা যায়, তা বিতর্কিত বিষয়। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতে আসার জন্য দ্বিতীয় বার যাত্রা করার সময়ে দা গামা হজগামী ও হজ থেকে ফিরছে এমন দুটি জাহাজকে আক্রমণ করেছিলেন, যার সকল যাত্রীই ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তিনি সেই সমস্ত যাত্রীদের হত্যা করেছিলেন। এর পরেও তাঁর বিভিন্ন বর্বরতার যে উদাহরণ পাওয়া যায়, তাতে একটা কথা স্পষ্ট, তিনি সুস্থ মনের অধিকারী ছিলেন না। সর্বদাই তাঁর এই ধরনের নৃশংস কাজের মুসলিমরা নিন্দা করেছে।