শোষণ মুক্ত সমাজ গড়তে কাজ করছে ইসলামিক ব্যাংক

islamic banking
ID 67299120 © Bakhtiar Zein | Dreamstime.com

অনেকের ধারণা ব্যাংক তো ব্যাংকই। ইসলামী আর অনৈসলামিক পার্থক্য শুধু নামে। উভয়ই ঋণ দেয়, সুদ নেয়। সরাসরি আর অন্যজন ঘুরিয়ে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী ব্যাংক ও সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাহ্যত ইসলামী ব্যাংক ও সুদি ব্যাংকের লেনদেন, বিনিয়োগ ও অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত না হলেও দুটি ব্যবস্থারই কার্যক্রমের নীতিমালা, পদ্ধতি ও অন্যান্য মৌলিক বিষয়ের মধ্যে রয়েছে বহু বৈপরিত্য।

বিশ শতকের কতিপয় বিখ্যাত ইসলামী মনীষি ও অর্থনীতিবিদদের দীর্ঘ গবেষণার মধ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংকিং বাস্তবতা লাভ করেছে। ষাটের দশকে মিসরে ইসলামী ব্যাংকিং-এর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ক্রমান্বয়ে মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯৬১ সালে মিশরে ইসলামী গবেষণার সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে ‘কলেজ অব ইসলামিক রিসার্চ’ কায়েম করা হয়। ১৯৬৪ সালের ৭ মার্চ এ কলেজের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৪০টিরও বেশী মুসলিম দেশের শতাধিক নেতৃস্থানীয় ইসলামীবিশেষজ্ঞ যোগদান করেন। তাঁরা সুদভিত্তিক প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্পরূপে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি গড়ে তোলার উপায় নির্ণয়ে আলোচনা করেন। ১৯৬২ সালে মালয়েশিয়ায়  কিস্তিতে হজ্বের অর্থ জমাগ্রহণের উদ্দেশ্যে ‘পিল গ্রিমস্ সেভিংস কর্পোরেশন’ নামে সুদমুক্ত একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর পর ১৯৬৩ সালে ডক্টর আহমদ আল-নাজ্জারের উদ্যোগে মিসরের কায়রো থেকে একশ’ কিলোমিটার দূরে মিট গামার নামক এক গ্রামে আধুনিক বিশ্বের প্রথম সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয। সত্তরের দশকে মুসলিম দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইসলাম সম্মেলন সংস্থা’ শরিয়াহ্ ভিত্তিক ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে ইসলামী ব্যাংকিং-এর সূর্যোদয় ঘটে। ১৯৭৪ সালের ওআইসির’র সম্মেলনে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত থেকে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্তে ঐক্যমত পোষণ করেন।

ইসলামী ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা তার মৌলিক বিধান ও কর্মপদ্ধতির সব স্তরেই ইসলামী শরিয়ার নীতিমালাকে মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু সুদভিত্তিক ব্যাংক এমনটা নয়। ইসলামী ব্যাংক সব ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তের নির্দেশনাবলি মেনে চলতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ইসলামী ব্যাংকে একটি তদারককারী শরিয়া বোর্ড থাকে। পক্ষান্তরে সুদি ব্যাংকের অস্তিত্ব যেহেতু সুদের ওপর নির্ভরশীল, সুতরাং সেখানে শরিয়া বোর্ড থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না।

ইসলামী ব্যাংকের মুখ্য উদ্দেশ্য শুধু মুনাফা অর্জন করা নয়। ইসলামী ব্যাংককে সমাজের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। তাই লাভজনক হলেও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো খাতে ইসলামী ব্যাংক অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে না। পক্ষান্তরে সমাজের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতি দৃষ্টি দিতে সুদি ব্যাংকগুলো বাধ্য নয়। এ ব্যাপারে তারা নিরপেক্ষ। সুদসহ মূলধন ফেরত আসবে কি না, এটাই তাদের দেখার বিষয়। সেখানে হালাল-হারামের প্রশ্ন অবান্তর।

ইসলামী ব্যাংক আসলের অতিরিক্ত কোনো অর্থ পাওয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে কোনো নগদ অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদান করে না। কারণ ঋণের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে শুধু আসল ফেরত নেবে, চুক্তির ভিত্তিতে আসলের অতিরিক্ত কিছু নিলে সুদ হবে। অতিরিক্ত নিতে চাইলে বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ অর্থের সাহায্যে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় করতে হবে। সুদি ব্যাংক আসলের অতিরিক্ত কিছু উপার্জনের উদ্দেশ্যে ঋণগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট হারে সুদে নগদ অর্থ লোন বা ঋণ প্রদান করে থাকে। ঋণগ্রহীতার ক্ষতি হলেও সুদি ব্যাংকের কিছু যায় আসে না। তারা তাদের বিনিয়োগ করা অর্থ সুদে আসলে ফেরত পেলেই হলো।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশীদারি কারবারে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়েরই যৌথ দায়িত্ব থাকে এবং পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুসারে ব্যবসার লাভ-লোকসানে অংশ নেয়। ইসলামী ব্যাংক ব্যবসার সব দায়-দায়িত্ব ও লোকসানের বোঝা বিনিয়োগ গ্রহীতার ওপর ছেড়ে দেয় না; বরং ইসলামের বিধান অনুযায়ী লোকসানেরও বোঝা বহন করে। অন্যদিকে সুদি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ব্যাংক সুদসহ আসল পূর্ণভাবে আদায় করে নেয়। ব্যবসার সব দায়-দায়িত্ব ও লোকসানের বোঝা ঋণগ্রহীতাকে একাই বহন করতে হয়। ঋণগ্রহীতার লোকসানের দিকে সুদি ব্যাংক আদৌ কোনো নজর দেয় না।

ইসলামের মৌলিক বিনিয়োগ পদ্ধতি হচ্ছে মুযারাবা ও মুশারাকা। কারণ এ দু’টিই এমন যুগান্তকারী পদ্ধতি যেগুলোর মাধ্যমে ইনসাফভিত্তিক সামজব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। ইসলামী অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থার সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র এবং কল্যাণমুখিতার প্রমাণ একমাত্র মুযারাবা-মুশারাকার মাধ্যমেই করা সম্ভব। মুযারাবা হচ্ছে এমন একটি কারবার যেখানে ২টি পক্ষ থাকবে। ১টি মূলধন সরবরাহকারী, অন্যটি ব্যবসায়ী। একটি চুক্তির মাধ্যমে কারবারটি সংগঠিত হবে, যাতে ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফায় কে কতভাগ লাভ পাবে তা সুনির্ধারিত থাকবে। লাভের কোনো নির্দিষ্ট অংক কারো জন্য নির্ধারণ করা যাবে না; বরং সম্ভাব্য মুনাফার শতকরা হার নির্ধারিত থাকবে। যেমন মুলধন দাতা ৫০%, ব্যবসায়ী ৫০% অথবা এক পক্ষ ৬০% অন্য পক্ষ ৪০%। এভাবে উভয়ের সম্মতিতে যেকোনো পরিমাণ নির্ধারণ করা যেতে পারে। লাভের পরিমাণ কমবেশি যাই হোক তা উভয়ের মাঝে পূর্ব নির্ধারিত শতকরা হারে বন্টিত হবে। আর যদি লোকসান হয় তবে অর্থদাতার টাকা যাবে আর ব্যবসায়ীর শ্রম বৃথা যাবে।

মুরাবাহ হচ্ছে ইসলামী ফিকহের ক্রয়-বিক্রয়ের একটি প্রকারের নাম। মূলত এটি কোনো বিনিয়োগ পদ্ধতি নয়। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অধিকাংশ বিনিয়োগ মুরাবাহা নামেই হয়ে থাকে। এখানে বলে রাখা দরকার যে, ফিকহের কিতাবাদিতে বর্ণিত মুরাবাহা ও ব্যাংকগুলোতে প্রচলিত মুরাবাহার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। ফিকহে বর্ণিত মুরাবাহা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি তার কোনো বস্ত্ত ক্রয়মূল্যের অধিক দামে অন্যের নিকট বিক্রয় করা। এখানে পণ্যটি আগে থেকেই বিক্রেতার মালিকানায় রয়েছে এবং তা নগদ বা বাকি যেকোনো মূল্যে বিক্রি হতে পারে। কিন্তু ব্যাংকের মুরাবাহায় বিক্রেতার (ব্যাংক) নিকট আগে থেকে কোনো পণ্য থাকে না; বরং ক্রেতার (বিনিয়োগ গ্রহণকারী) সাথে বিক্রয়-চুক্তি সম্পাদনের পর ব্যাংক তা ক্রয় করে থাকে। অতঃপর অধিকমূল্যে বাকিতে/কিস্তিতে বিনিয়োগগ্রহীতার নিকট বিক্রি করে থাকে। এক্ষেত্রে মূল্য আদায়ের সময় বিবেচনায় এনে পণ্যের দাম কমবেশি করে থাকে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবলম্বন করা উক্ত ‘মুরাবাহা’ যদিও শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো আদর্শ বিনিয়োগ পদ্ধতি নয় তথাপি শর্তসমূহ যথাযথ পালন করলে তা জায়েযের পর্যায়ে এসে যায়।

ইসলামী ব্যাংকগুলো সুদের বিনিময়ে টাকা খাটায় না। বরং ব্যাংক নিজে কিংবা উদ্যোক্তার মাধ্যমে ব্যবসা করে থাকে। এই ইসলামী পদ্ধতিতে ব্যবসার মূলধন সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু সুদি ব্যাংকগুলোর আসল ও প্রধান কাজ হলো সুদের বিনিময়ে টাকা খাটানো। ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আল্লাহর নির্দেশিত পথে সমাজ থেকে শোষণের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধন করা। আর সুদি ব্যাংক সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে বাধ্য নয়। অর্থের ব্যবসার মাধ্যমে সমাজের মুষ্টিমেয় শ্রেণির ভাগ্যোন্নয়নেই এর কার্যক্রম প্রধানত সীমাবদ্ধ।