সংকলিত কুরআন এই প্রথম খলিফার প্রচেষ্টার ফল

dreamstime_xs_122016427
Al-Quran yang mulia © Rawpixelimages | Dreamstime.com

ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা:)। তিনি আশারাতুল মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত। হজরত মুহাম্মদ (স:) এর প্রিয় সাহাবি ছিলেন। মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাল্য নাম ছিল আবদুল্লাহ্, আবু বকর ছিল তার ডাক নাম।

ইসলাম গ্রহণ করিবার পর তিনি সিদ্দীক (সত্যবাদী) এবং আতিক (দানশীল) খেতাব লাভ করেছিলেন। আবু বকরের পিতার নাম ছিল ওসমান, কিন্তু ইতিহাসে তিনি আবু কুহাফা নামেই সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর মাতার নাম উম্মুল খায়ের সালমা। আবু বকরের মাতাপিতা উভয়েই বিখ্যাত কুরাইশ বংশের তায়িম গোত্রের লোক ছিলেন। তার মা প্রথমদিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পিতা হিজরীর অষ্টম বৎসরে ইসলামে দীক্ষিত হন।

আবু বকর ছিলেন ইসলামের এক জ্বলন্ত নক্ষত্র । তাঁর শাসনামলে ইসলাম ও জনগণের জন্য তিনি যুদ্ধও করেছেন। আবু বকরের খিলাফত ২৭ মাস অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাকে বেশ কিছু অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনি তা সফলভাবে মোকাবেলা করেন। নতুন নবী দাবিকারী বিদ্রোহীদেরকে তিনি রিদ্ধার যুদ্ধে দমন করেছেন। তিনি বাইজেন্টাইন ও সাসনীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরে উমর ইবনুুল খাত্তাব ও উসমান ইবনে আফফান এই অভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব অভিযানের ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য কয়েক দশকের মধ্যে শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়। খলিফা হওয়ার পর তিনি অন্যান্যদের পরামর্শক্রমে তার কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা গ্রহণ করতেন।

ইসলামের এই প্রথম খলিফা চির স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় রয়েছেন। হজরত আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বয়সে দুবছর ছোট ছিলেন। তিনি ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ১৮ বছর বয়সে নবীজি (সা.) এর বন্ধু হওয়ার অমূল্য দৌলত অর্জন করেন। তিনি তৎকালীন সময়ে মক্কার নেতৃস্থানীয়দের একজন ছিলেন। নবীজি (সা.)-এর বয়স তখন ২০ বছর ছিল। এটিই ছিল তাঁদের পরস্পর বন্ধুত্বের সূত্রপাত। যা পরবর্তী সময়ে এমন গভীরতা লাভ করে যে তার নিদর্শন দুনিয়ায় বিরল। এবং তিনি ১৮ বছর বয়স থেকে ৬১ বছর পর্যন্ত জীবনের এ ৪৩টি বছরে নবীজি (সা.)-এর নবুওতয়াতের স্বাদ ও সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন।

নবী করিম (সা.) কতৃক নবুওয়াতের ঘোষণার পর হজরত খাদিজা (রা.) ছাড়া যিনি সর্বপ্রথম নবীজি (সা.)-এর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন আবু বকর (রা.)।

বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ইন্তেকালের আগে স্পষ্টভাবে কাউকে খলিফা নিযুক্ত করে যাননি। তাই মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খলিফা নির্বাচন নিয়ে মুসলমানরা আনসার ও মুহাজির দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন। উভয় দলই তাঁদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচনের দাবি করছিল। “সাকিফায়ে বনি সায়েদাহ” এ বিষয়ে বাক-বিতান্ডা চরম আকার ধারণ করে। একদিকে এখনো নবীজি (সা.)-এর দাফন-কাফনের কাজ সমাধা হয়নি। অন্যদিকে খেলাফত নিয়ে তুমুল বিতর্ক, এমন পরিস্থিতিতে হজরত আবু বকর (রা.) এগিয়ে আসেন এবং তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস শোনালেন। “কোরাইশ খেলাফতের দায়িত্বের অধিকারী”। আনসারগণ এটা মেনে নেন এবং তাঁরা তাঁদের দাবি প্রত্যাহার করে নেন। এভাবেই তিনি উম্মতের ঐক্যকে সুদৃঢ় করেন।

হিজ্জ্বাতুল বিদা (বিদায় হজ্ব) এর পরে, যখন মহানবী (সাঃ) গুরুতরভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ) কে দৈনন্দিন নামাজে ইমামতী করার নির্দেশ দেন। হজরত মুহম্মদ (সাঃ) এর শোকাবহ ইন্তেকালের পর, হজরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁকে মহানবী (সাঃ)-এর আকস্মিক মৃত্যুতে উদ্ভূত একটি অত্যন্ত সমস্যা সঙ্কুল পরিস্থিতির সামাল দিতে হয়।
সর্বপ্রথম সমস্যা এই ছিল যে, কিছু গোত্র প্রকাশ্যে ইসলামকে অস্বীকার করে বসে, কেবল এই কারণে যে, তাদের গোত্রীয় প্রধান মহানবী (সাঃ) এর খলীফার প্রতি অনুগত্ থাকার আর প্রয়োজন মনে করেনি। শুধু তাই নয়, তারা বরং নবপ্রতিষ্ঠিত খিলাফতকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাদের অভিসন্ধি জানতে পেরে, সৈন্য প্রেরণ করেন এবং তাদের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন।
দ্বিতীয়তঃ হযরত আবু বকর (রাঃ) বড় যে সমস্যার সম্মুখীন হন, তা ছিল যে, বহু লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করে, যা ইসলামী রাষ্ট্রের বিবিধ চাহিদা পূরণ এবং দরিদ্রদের তত্ত্বাবধানের জন্য জন্য অপরিহার্য ছিল। হযরত আবু বকর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন যে, প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তিকে যাকাত দিতে হবে এবং তিনি এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন।
তাঁর খিলাফতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের একটি হলো পবিত্র কুরআনকে একস্থানে সংগৃহিত করা। যদিও মহানবী (সাঃ) স্বয়ং পবিত্র কুরআনের লিখন ও বিন্যস্তকরণ কাজ সুসম্পন্ন করেছিলেন,কিন্তু তখন পর্যন্ত তা বিবিধ চামড়ার টুকরা, বৃক্ষ পত্ররাজি এবং পাথরের ফালিতে লিখিত ছিল। হজরত আবু বকর (রাঃ) এই সকল বিছিন্নভাবে লিখিত অংশকে সংগ্রহ করে একত্রিত করেন এবং কুরআন সংরক্ষণের নিমিত্তে হিফযকারীদের ব্যবস্থাপনাকে পদ্ধতিগত ভাবে পুনর্বিন্যস্ত করেন।

মহানবী (সাঃ) তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে রোমানদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করার জন্য এক সৈন্য বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন, যারা উত্তর সীমান্তে উপদ্রব করছিল। এই সৈন্যবাহিনী তখনও মদীনাতেই অবস্থান করছিল, যখন মহানবী (সাঃ) পরলোকগমন করে গেলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) খলীফা হওয়ার পর মদীনার ভিতর এবং বাইরের অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে পড়লো। এই মহা বিপদের আশঙ্কা করে, মহানবী (সাঃ) এর অনেক সাহাবী তাঁকে এই পরামর্শ দিলেন যেন এই সৈন্য বাহিনী রোমানদের বিরুদ্ধে তখনই প্রেরণ করা না হয়। কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ) জোরের সাথে জবাব দিলেন, “আবু কোহাফার পুত্রের কি অধিকার আছে যে মহানবী (সাঃ) এর দ্বারা সূচিত কোন কাজকে রোধ করে”। মুসলিম সেনারা হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে বাহরাইনে এক বিদ্রোহকে নাস্তানাবুদ করে দেয়। তারপর পারস্যরা পরাজিত হয়, যারা বাহরাইনের বিদ্রোহীদের মদদ করছিল। মুসলিম সৈন্যবাহিনী অতঃপর ‘আজনাদান’ এবং ‘ইয়ারমুকে’র যুদ্ধে রোমান পরাশক্তিকে পরজিত করে এবং এভাবে গোটা সিরিয়া ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
হজরত আবু বকর (রাঃ) পক্ষকাল অসুস্থ্য থাকার পর ৬৩৪ খ্রীস্টাব্দের ২৩ অগাস্ট পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন সেই দশ আশীর্বাদপুষ্টদের একজন যাঁদেরকে মহানবী (সাঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে তাঁদের জান্নাতে ভূষিত করা হবে।