সংক্রামিত ক’জন? জানতে অ্যাপ তৈরি সিঙ্গাপুরে

Virus design with hazmat suit doctor in background
© Buddhilakshan4 | Dreamstime.com

বর্তমান বিশ্ব এমন একটি ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে আধুনিক মানবসভ্যতা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে এক অদৄশ্য আততায়ীর সামনে। করোনাভাইরাস অথবা Covid-19 এমনই এক ভাইরাস, যার কবলে বিশ্বের ১৯৮ টি দেশ(লেখার সময় পর্যন্ত)। যদিও মারণক্ষমতার বিচারে এই ভাইরাস ইবোলা বা স্প্যানিশ ফ্লু-এর সমকক্ষ নয় তবে এর হাতিয়ার হলো মারাত্মক সংক্রমণক্ষমতা, যা কয়েক সপ্তাহে বদলে দিতে পারে একটা দেশের চিত্র। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একটি অ্যাপ তৈরি করেছে সিঙ্গাপুর যা সহজেই খুঁজে বের করবে আক্রান্তের বিবরণ ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষদের।

কী এই অ্যাপ?

ট্রেসটুগেদার নামক এই অ্যাপটি কাজ করে একটি স্বল্প দূরত্বের ব্লুটুথ সিগন্যালের মাধ্যমে। যে সমস্ত ফোনে এই অ্যাপ ইনস্টল করা থাকবে, সেই সমস্ত ফোন গুলি পারষ্পরিক সংস্পর্শে এলে স্বংয়ক্রিয় ভাবেই তথ্য সংরক্ষণ করে রাখবে। এই অ্যাপ মজুত করে রাখে ২১ দিনের সমস্ত তথ্য যেমন, কোনো ব্যক্তি কোন করোনা আক্রান্তের সংস্পর্শে কোথায় এসেছিল, কতসময়ের জন্য ছিল ইত্যাদি। যদিও ম্যাপের মাধ্যমে ঠিকানা সংগ্রহ করে না এই অ্যাপ। যখনই কোনো ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে যাবে, এই অ্যাপ জানিয়ে দেবে এই ব্যক্তি কোথা থেকে ভাইরাসের সংক্রমণে এসেছে এবং ব্যক্তি কতজনকে সংক্রমিত করেছে। এর ফলে অতি সহজেই সিঙ্গাপুর স্বাস্থ্যমন্ত্রক টেস্ট-ট্রিট-ট্র্যাক পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারবে।

তথ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা

এই ধরনের অ্যাপের ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, কারণ রাষ্ট্রব্যবস্থা সরাসরি নাগরিকের গতিবিধির উপর নজর রাখে। যদিও আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য এই ব্যবস্থা বস্তুতই কার্যকর। সিঙ্গাপুর স্বাস্থ্যমন্ত্রক একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায় না এই অ্যাপ, ফোনের কন্ট্যাক্ট তালিকাতেও এই অ্যাপের কোনো গতিবিধি নেই। এই অ্যাপ দ্বারা সংগৃহীত সমস্ত তথ্যই জমা থাকে সাংকেতিক আকারে। অ্যাপ ব্যবহারকারী সমস্ত ব্যক্তিদের পরিচয়ও থাকবে সাংকেতিক পরিচয়পত্রের আকারে, এর জন্য কোনো মোবাইল নম্বর বা অন্যান্য কোনো সরকারি অথবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রয়োজন নেই।
করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ট্রেসটুগেদার নামক অ্যাপটি প্রারম্ভিক পর্যায়ে যথেষ্ট কার্যকর হয়েছে। এখনও পর্যন্ত পাঁচ লক্ষেরও বেশি বার ডাউনলোড হওয়া এই অ্যাপ যদিও প্রশ্নের মুখে পরেছে সাধারণ মানুষের ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে।

অন্যান্য দেশের প্রচেষ্টা

বিশ্বজুড়ে যখন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছ-লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে তখন সারা বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশগুলো চাইছে চিকিৎসার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য এর সুরাহা খুঁজতে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসাবেই বিভিন্ন দেশ তৈরি করছে এই ধরনের অ্যাপ।

দক্ষিণ কোরিয়া করোনাআক্রান্ত ব্যক্তিদের ট্রেস করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে জিপিএস তথ্য, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ। এই ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত ভীষণ ভাবে উপযোগী হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়।

ইজরায়েল করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এরকমই একটি অ্যাপ নিয়ে এসেছে যা নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে কেউ করোনা আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে।

ভারতবর্ষ এই অ্যাপ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাখ্যামূলক উদ্যোগ নিয়েছে। করোনা-কবচ নামক একটি অ্যাপ খুব শীঘ্রই আসতে চলেছে সাধারণ মানুষের কাছে, যেখানে স্পষ্ট ভাবেই জানা যাবে কোনো সুস্থ ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছে কিনা। ভারতের দুই সরকারি দপ্তর তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক ও নীতি আয়োগ আলাদা ভাবে দুটি সিস্টেম তৈরি করছে, যা পরীক্ষা করে উপযুক্ত সিস্টেম গুলো নিয়ে তৈরি হবে এই অ্যাপ। ভারতবর্ষের সমস্ত প্রধান ভাষাতেই ব্যবহার করা যাবে অ্যাপটি।
এই অ্যাপটি চলবে মোবাইল নম্বর ও লোকেশনের মাধ্যমে। ভারতের মেডিক্যাল রিসার্চ কাউনসিলের ডেটাবেসের সাথে সাধারণ মানুষের গতিবিধি পরীক্ষা করে এই অ্যাপ জানাবে অন্তিম সিদ্ধান্ত। এই অ্যাপটিও ব্লুটুথের মাধ্যমেই কাজ করবে এবং অনেকাংশেই সিঙ্গাপুরের ট্রেসটুগেদার অ্যাপের সদৃশ।

পৃথিবীর এই দুঃসময়ে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা কতটা কার্যকারী হবে তা দেখার সময় এসে গেছে। প্রকৃতি ও প্রযুক্তির যুদ্ধের অন্তিম পরিণতি কী হবে তা অবশ্যই পর্যবেক্ষণযোগ্য।