সংক্ষিপ্ত ৬টি আয়াত যেগুলি আপনাকে সকল প্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে

dreamstime_s_31432958
© Paulus Rusyanto | Dreamstime.com

সূরা আন-নাস কুরআনের সর্বশেষ সূরা। এই সূরায় ৬টি সংক্ষিপ্ত আয়াত আছে। এই সূরাটিকে ‘আত্মরক্ষার সূরা’ নামেও নামকরণ করা হয়। কারণ এই সূরাটি তার পাঠকারীকে আল্লাহর হুকুমে সকল প্রকার অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে হেফাজত করে।

কুরআনের সর্বশেষ ২টি সূরা- সূরা ফালাক ও সূরা নাস যেকোনো অনিষ্ট থেকে বাচার জন্য পাঠ করা হয়। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম জাদু দ্বারা আক্রান্ত হলে জাদু মুক্তির জন্য আল্লাহ তাঁর উপর এই দুটি সূরা একত্রে নাযিল করেন। এই সূরাগুলি বারবার পড়াত ফলে তিনি জাদু থেকে রক্ষা পান।

এমনকি যেকোনো বিপদে এই সূরা দু’টি পড়ার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নিজেও প্রত্যেকদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে ও সকাল-সন্ধ্যায় এই দুটি সূরার প্রত্যেকটি ৩ বার করে পড়তেন।

নিম্নে সূরা নাসের সংক্ষিপ্ত তাফসীর উল্লেখ করা হলঃ

১-৩ নং আয়াতঃ

“বলুন! আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার, মানুষের অধিপতির, মানুষের উপাস্যের।”

উপরে বর্ণিত আয়াতসমূহে আল্লাহর তিনটি গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার সাথে সদা নিযুক্ত শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে যেন উপরোক্ত তিনটি গুণে গুণান্বিত মহান সত্তা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে।

প্রথম গুণ হিসেবে বলা হয়েছে ‘মানুষের রব’ বা ‘মানুষের পালনকর্তা’। সকল মানুষ আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানলেও পালনকর্তা হিসেবে মানতে অনেকেই আপত্তি করে। যেমন ফেরআউন সরাসরি অস্বীকার করে নিজেকে ‘আমি তোমাদের বড় পালনকর্তা’(৭৯:২৪) বলে দাবী করেছিল । পৃথিবীতে ফেরআউনী স্বভাবের অসংখ্য ধনী, সমাজনেতা ও রাষ্ট্রনেতা রয়েছেন, যারা পরোক্ষেভাবে অনুরূপ দাবীই করতে চায়। তাই আল্লাহ এখানে তাঁর ‘পালনকর্তা’ গুণটিকেই শুরুতে এনেছেন।

দ্বিতীয় গুণ হিসেবে বলা হয়েছে ‘মানুষের অধিপতি’। কিয়ামতের দিবসে আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টিকে আপন কব্জায় নিয়ে বলবেন, “আমিই বাদশাহ। পৃথিবীর রাজা-বাদশাহরা আজ কোথায়?”

দুনিয়াতে একজনের উপর আরেকজন আপন শ্রেষ্টত্ব দেখাতে মানুষ নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে চায়। মানুষের উপরে মানুষের এই নকল কর্তৃত্ব বা প্রভুত্ব জাহিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আল্লাহ তাঁর একাধিপত্য ও একক সার্বভৌমত্বের গুণ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনিই মানুষের অধিপতি। এর দ্বারা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের অধিপতি মানুষ নয়, বরং আল্লাহ। আল্লাহর দাসত্বের অধীনে সকল মানুষের অধিকার সমান।

তৃতীয় গুণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘মানুষের উপাস্য’। ধারণা ও কল্পনার বশবর্তী হয়ে কোনো ব্যক্তি ও বস্ত্তর উপরে অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করে মানুষ তাদেরকে উপাস্য সাব্যস্ত করে থাকে। অথচ যাকে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে বা যাকে পূজা করা হচ্ছে, সে না দেখতে পায়, আর না শুনতে পায়। সে না কোনো ক্ষতি করতে পারে, আর না কোনো উপকার করতে পারে।

মূলতঃ মানুষের উপর এসব শয়তানের ধোঁকা ব্যতীত কিছুই নয়। একল শিরকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে যে, উপাসনা ও ইবাদতের একমাত্র হকদার ও মাবূদ মাত্র একজনই। আর তিনি হলেন আল্লাহ ও তিনিই একমাত্র ‘মানুষের উপাস্য’। এভাবে রুবূবিয়াত, মালিকিয়াত ও উলূহিয়াতের একচ্ছত্র অধিকারী হিসাবে আল্লাহ অত্র সূরার শুরুতে নিজের প্রধান তিনটি গুণের পরিচয় পেশ করেছেন।

৪-৬ নং আয়াতঃ

‘গোপন শয়তানের কুমন্ত্রণার অনিষ্টকারিতা হতে’। ‘যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে’। ‘জ্বিনের মধ্য হতে ও মানুষের মধ্য হতে’

এই তিনটি আয়াতে শয়তানের কুমন্ত্রণার অনিষ্টকারিতা হতে বাঁচার জন্য মানুষকে আল্লাহর আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। কেননা শয়তান মানুষের নিত্যসঙ্গী। বান্দা যখনই আল্লাহর নাম নেয়, তখনই সে পিছিয়ে যায়। এমনকি আযান শুনলে সে বায়ু নিঃসরণ করতে করতে দৌড়ে পালায়। শয়তান মানুষের রগ-রগে চলাফেরা করে। একে আটকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। অথচ শয়তানের প্ররোচনাতেই মানুষ পাপে লিপ্ত হয়। তাই একে দমন করার একমাত্র কৌশল হিসাবে মানুষকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।

ষষ্ঠ আয়াতে শয়তানকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। জ্বিন শয়তান, যারা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয় এবং মানুষ শয়তান, যারা প্রকাশ্যে মানুষকে কু-পরামর্শ দেয় ও পথভ্রষ্ট করে।

আল্লাহ বলেন, “আর এমনিভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষের মধ্য হতে ও জিনদের মধ্য হতে বহু শয়তানকে শত্রুরূপে নিযুক্ত করেছি। তারা একে অপরকে মনোমুগ্ধকর কথা দ্বারা প্ররোচিত করে থাকে। যাতে তারা ধোঁকায় পতিত হয়। যদি তোমার প্রভু চাইতেন, তবে তারা এগুলি করতে পারত না। অতএব তুমি এদেরকে ও এদের মিথ্যা রটনাগুলিকে দূরে নিক্ষেপ কর।” (৬:১১২)