সংসারে আপনার গুরুত্ব নিয়ে চিন্তিত? হাল ছেড়ো না বন্ধু

নারী ১৭ জুলাই ২০২০ Tamalika Basu
সংসারে গুরুত্ব
Fotoğraf: ID 101130370 © Fsstock | Dreamstime.com

কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর…” (আল-কোরআন,৩:৯২ )

অন্যান্য দিনের মতোই সে-দিন ঘরের কিছু কাজ করছিলাম, হঠাৎই আমার স্বামী বেশ অভিমানের সুরে বললেন: “তুমি সব সময় বাকিদের জন্য কাজে ব্যস্ত থাকো। আমার জন্য তোমার কাছে কোনও সময় নেই।” কথাটা শুনে প্রথমে আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, এই রকম অভিমানী কথাবার্তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়েই থাকে। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব খুব একটা ছিল না। কারণ আমরা একসাথে অনেক সময় কাটাই। এই রকমই নানা বিষয় যখন মনে ভিড় করে আসছিল, তখন মনে পড়ল সেদিন সকালেই আমার কন্যাও ঠিক একই কথা বলেছিল, “তুমি আমার কথা শুনছ না। আর কাজ করতে হবে না মা, তুমি আমার সাথে খেলা করো।” সংসারে আমাদের গুরুত্ব এভাবেই বজায় থাকে। 

এটা জেনে অবশ্যই ভালো লাগে যে, আমার প্রিয়জনেদের জীবনে এখনও আমার গুরুত্ব আছে।

তবে তাঁদের প্রত্যেকের দিকে নজর রাখা, তাদের হাতের কাছে সব এগিয়ে দেওয়া, খুবই পরিশ্রমের কাজ।

আমার মেয়ে ছোট, সে অবুঝ হতে পারে। কিন্তু আমার স্বামী প্রাপ্তবয়স্ক, তাঁর তো সব বোঝার ক্ষমতা আছে। তিনি কী ভাবে আমাকে এই কথা বললেন!

সকলেই চায় যে আমি তার দিকে বেশি নজর দিই। নাহলে তার মনে হয় যে, আমি তাকে অবহেলা করছি।

তাই আমি বসে বসে ভাবছিলাম, সত্যিই , সংসারে আমার প্রয়োজন কার বেশি। 

সংসারে ত্যাগ স্বীকারঃ

সংসারে ত্যাগ স্বীকার করতে আমরা মহিলারা পিছপা হই না, কিন্তু পরে নানা সময় মনে হয় সেই সিদ্ধান্ত হয়তো সঠিক ছিল কি না। এক একটা সময় দেখি, আমার পছন্দ-অপছন্দের দিকে কারও নজর নেই। যে জিনিসগুলো আমার ভালো লাগে, সেগুলো আমি করতে পারি না।

এক-আধ দিন মনে হয়, একটু গান শুনি বা বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাই, কিন্তু সে সব করার সময় কোথায়!

সব মিলিয়ে আমি আস্তে আস্তে এমন একটা মানসিক অবস্থায় প্রবেশ করেছিলাম, যেখানে ক্রমাগত মনে হত যে, আমি নিজে ভালো নেই। হয়তো এর চেয়ে বেশি খারাপ থাকা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

অতীতে একাধিক বার মনে হয়েছে, আমি ভালো নেই, কিন্তু নিজের কাছে সেই কথা স্বীকার করতে নিজেই লজ্জা পেয়েছি।

কিন্তু এই বিষয় নিয়ে ভাবনা-চিন্তারও সময় আমার কাছে থাকে না, কারণ ছোট অবোধ শিশুর দিকে নজর দিতেই গোটা দিন চলে যায়।

নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক রেখে ঘরের, বাচ্চার সমস্ত কাজ করি। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সংসারে মন দিয়েছিলাম। 

সংসারের অর্থ বুঝতে কুরআন পড়াঃ

কিছু দিন আগে থেকে, যখন আমি একজনের পরামর্শ শুনে রোজ রাতে পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং তার অনুবাদগুলি পড়া শুরু করি।

যিনি আমাকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি আগেই বলেছিলেন, অনেক কিছুই হয়তো পড়ে বুঝতে পারব না, অনেক কিছু অস্পষ্ট মনে হবে, অনেক নতুন সত্য আবিষ্কার করব।

তবে নিজের উপরে বিশ্বাস বাড়বে এবং অনেক কিছু শিখতে পারব। 

যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর…’ আমি আগে যখনই এই আয়াতটি পড়েছি বা শুনেছি, সর্বদা ভেবেছি এটা আর্থিক ব্যয় সংক্রান্ত পরামর্শ।

তবে এখন বুঝতে পেরেছি, রূপকার্থে এই কথা বলা হয়েছে। শুধু অর্থ নয়, এই আয়াত এমন আরও অনেক কিছুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা আমাদের প্রিয়।

যা আমাদের কাছে ভীষণ মূল্যবান, যেমন সময়।

সময় এমন একটা জিনিস, যার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে রয়েছে বলে আমরা মনে করি, এবং সর্বদা সেই নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাই।

অনেক সময়ে আমরা সমস্ত কিছু থেকে, সবার থেকে কিছু ক্ষণের জন্য আলাদা হয়ে যেতে চাই, যার কারণ হল শুধু নিজের সাথে কিছুটা সময় কাটানো

এই বিষয়ে আমি যত ভেবেছি তত বুঝতে পেরেছি, যখন আমি নিজের সাথে এভাবে কিছু সময় কাটানোর চেষ্টা করছি, তখন আমি প্রকৃত অর্থে একা ছিলাম না।

আমরা জানি, আল্লাহ সব সময় আমাদের সাথে থাকেন, কিন্তু সত্যি সত্যি সেটা আমরা কতটা অনুভব করি এবং স্বীকার করি?

যে আধ ঘণ্টা আমরা একা থাকতে চাই বা নিজের সাথে সময় কাটাতে চাই বলে ভাবি, সেই সময়টা আসলে আমরা আল্লাহের সাথে থাকি।

মনে হয় যেন তিনি প্রশ্ন করছেন, ‘আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? আমাকে কি অবশেষে খুঁজে পেয়েছ? তুমি কি সত্যিই আমাকে খুঁজছ?‘ 

উপসংহারঃ

এভাবেই আমি উপলব্ধি করেছি যে, নিজের জন্য যে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টা আমি সরিয়ে রাখতাম, সেগুলো আসলে আমার ছিল না।

সময় হল উপহার, আল্লাহের কাছ থেকে পাওয়া ঋণ।

আমার কাছে তত ক্ষণ এই সময় রয়েছে, যত ক্ষণ না আল্লাহ তা ফেরত নিয়ে নিচ্ছেন এবং আমাকে তাঁর কাছে ডেকে নিচ্ছেন।

যে জিনিসটা আমি সবচেয়ে বেশি নিজের বলে মনে করতাম।

যার উপরে আমার কর্তৃত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল বলে ভাবতাম, সেই মালিকানার ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্ত করা – এটাই হল সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ, সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার।  

কিন্তু কিছুই যদি আমার না হয়, এমনকী আমার সময়টাও যদি নিজের না হয়, তাহলে সেই জিনিসটা আমি অন্যের কাছে থেকে কীভাবে নিতে পারি?

আমি স্ত্রী হয়েছি, মা হয়েছি আল্লাহর দয়ায়। ফলে সেই ভূমিকা যথার্থ ভাবে পালন করার অর্থ হল আল্লাহের দেখানো পথে চলা। একমাত্র এভাবেই জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব।