সততা এবং প্রতিশ্রুতি পালনের দৃষ্টান্ত রাখুন সন্তানের কাছে

Muslim man in white dress, similar and kid praying at Mosque
© Muhammad Annurmal | Dreamstime.com

আমরা যখন নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করি তখন কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা বলা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মীয় দিক থেকে বিবেচনা করে হোক বা অন্য কোন দিক থেকে বিবেচনা করেই হোক, সততা বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও শিশুরা সৎ ও সত্যবাদী হয়ে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু ধীরে ধীরে আশেপাশের পরিবেশের প্রভাবে তারাও মিথ্যা বলা শিখে ফেলে। 

আহলুল বাইত(রাযিঃ) শিশুদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পালনে খুব জোর দিয়েছেন। বর্তমান মনস্তাত্ত্বিক গবেষয়ণাও দেখা যায় যে, বাচ্চারা প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস এবং সততা শেখে যখন তাদের পিতামাতা প্রতিশ্রুতি পালন করে। যদি কোনো পিতামাতা কোনো প্রতিশ্রুতি পালন না করে তবে সেই শিশুটি অসততা শেখে। এমনকি কোনো মিষ্টি কেনার মতো তুচ্ছ জিনিসের প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করা উচিত নয়, কারণ এই প্রাথমিক বয়স থেকেই শিশুদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিকশিত হয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “বাচ্চাদেরকে ভালোবাস। তাদের সাথে সদয় আচরণ কর এবং তোমরা যদি তাদেরকে কোনো প্রতিশ্রুতি দাও, তাহলে তা পূরণ করার চেষ্টা কর। কারণ, শিশুরা মনে করে যে, তোমরাই তাদের জীবিকা নির্বাহকারী”, একইভাবে আলী(রাযিঃ) বলেছেন, “তোমরা যখন বাচ্চাদেরকে কোনো প্রতিশ্রুতি দাও, তখন অবশ্যই তা পালন কর।”

প্রতিশ্রুতি রাখা বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত; আমরা যদি আমাদের প্রতিশ্রুতি পালন করি, তবে আমরা তাদের বিশ্বাসকে মজবুত করি। বিপরীতে, আমরা যদি কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি, তবে আমরা তাদের বিশ্বাসকে ধ্বংস করি। বিশ্বাস সমাজের পাশাপাশি পরিবারেরও একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যখন কেউ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তখন বোঝা যায় যে তিনি যে ব্যক্তিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার মূল্য তাঁর কাছে নেই এবং এটি প্রতিশ্রুতির চেয়েও আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল।

যাদের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয় তারা এটি বুঝতে পারে যে, এই ব্যক্তিটি নির্ভরশীল নয় এবং এর ফলে সম্পর্কের ক্ষতি হতে শুরু করে। তদুপরি, যে ব্যক্তি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সে তার নিজের কথার মূল্য হারায়; এর দ্বারা সে মূলত নিজেকেই অসম্মানিত করে। 

পরিবারের সদস্যদের সাথে সততার মূল্য নিয়ে আলোচনা করা উচিত, কারণ এটি সেই গুণ যা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে, বিশেষত পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। তদুপরি, পিতামাতাদেরকে এটি সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, তারা যে গুণগুলি তাদের বাচ্চাদের মধ্যে প্রতিবিম্বিত দেখতে চান সেগুলো তাদেরকেই প্রথমে নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পিতামাতাকে সর্বদা মনে রাখতে হবে তা হল- সবসময় সন্তানের অসৎ আচরণের কারণে শাস্তি না দিয়ে তাদেরকে সৎ হওয়ার উপর জোর দেওয়া উচিত। 

গবেষণা থেকে এটি জানা যায় যে, শিশুদের সামনে সততার প্রচার করলে তারাও সত্যবাদী হয়ে গড়ে ওঠে। যাইহোক, পিতামাতাদের সর্বদা সচেতন থাকতে হবে যাতে তাদের সন্তানের সামনে এমন সব গল্পই বলা যায় যেগুলিতে সততার শিক্ষা আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনের অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা এক্ষেত্রে অনেক ফলপ্রসু হতে পারে।  এছাড়া কুরআনেও অনেক নবীদের ঘটনা বর্ণিত আছে যেগুলি বাচ্চারা খুব আগ্রহের সাথে শোনে। সর্বোপরি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “লোকদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান ব্যক্তি হল সে, যে সর্বদা সত্য কথা বলে, তা তার পক্ষে হোক বা বিপক্ষে।”

সৎ হওয়া জিহ্বার দ্বারা কথিত কথায় মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রতিটি মুসলিমের চরিত্রের একটি অনবদ্য উপাদান। আন্তরিকতার সাথে আমাদের রবের অনুগত হওয়াও সত্যবাদী হওয়ার অন্তর্ভুক্ত। 

একবার এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পরামর্শ চাইল কারণ সে অনেক সমস্যায় জর্জরিত ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, “মিথ্যা  কথা বলবে না।” এরপর থেকে যখনই সে কোনো মন্দ কাজ করতে যেত, তখনই সে নবীজীর কথাটি ভাবত। আর এ কারণে সে মন্দ থেকেও দূরে থাকতে লাগল। যার ফলস্বরূপ, সে সত্যবাদীতে পরিণত হল আর তার সকল সমস্যা কেটে গেল। 

সূরা আসরে আল্লাহ তা’আলা যে সকল লোককে ক্ষতি থেকে মুক্ত বলেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম এক প্রকার হল যারা অপরকে সত্যের পতি অবিচল থাকতে আদেশ দেয়। সুতরাং, সত্যের প্রতি অবিচল থাকা ও সত্যের প্রতি আহ্বান করার এই গুণটি আল্লাহও অনেক পছন্দ করেন। আল্লাহ আমাদেরকে সত্যবাদী হওয়ার তওফিক দিন। আমীন।