সদ্য মা হয়েছেন? ঘাবড়াবেন না, আপনি সুপারমম!

wes-hicks-Xg_LGdZVPe0-unsplash
Fotoğraf: Wes Hicks-Unsplash

বালুকাময় সমুদ্র সৈকতে বসে অসীমের দিকে চেয়ে থাকা। আমার কাছে এটাই পছন্দের ছুটি। হঠাৎ তীব্র কান্নায় চমকালাম। বুঝলাম ওটা স্বপ্ন ছিল। বাস্তব হল, রাত তিনটে। আমার আদরের ছোট সোনা খিদেতে উঠে পড়েছে। আমার মেয়ের সবে একমাস বয়স।

আগামী তিন মাস অন্তত এই অবস্থা অব্যহত থাকবে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে একটু শান্তির ঘুমও আমার হয় না।

মাঝে মাঝে মনে হয় চিৎকার করে বলি, “হে আলাহ! আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত। আমি এই সমস্ত কষ্টের জন্য খুবই ছোট। প্লিজ, সোনা, আমাকে একটা ঘণ্টা ঘুমাতে দাও। মাত্র এক ঘণ্টা!”

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আগমন

পুরো নয় মাস ধরে এই ছোট বাচ্চাটিকে গর্ভে ধারণ করেছি। নয় মাস যাবত আমি আর আমার স্বামী এই ছোট্ট শিশুটির জন্য অপেক্ষারত ছিলাম। আমরা কখনও ভাবতাম তার নাম কী রাখব, সে ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে, আবার কখনও ভাবতাম সে কার মতো দেখতে হবে।

আমাদের পরিবারের তৃতীয় সদস্যটির জন্য আমরা অনেক উদ্বিগ্ন ছিলাম, সে দুনিয়াতে আসার আগে তাকে কেন্দ্র করে আমার কত মমতাবোধ, ভালোবাসা, চিন্তা আর উদ্বিগ্নতা কাজ করত। তার জন্মের পরে যেন আমার চেতনা ফিরে এল। আমি অস্বীকার করতে পারি না যে এটি পীড়াদায়ক ছিল। কিন্তু সেটাই বোধহয় মাতৃত্বের দাম। হাসপাতালে আমার চারপাশে অনেক কণ্ঠস্বর ছিল, তবে আমি যা শুনেছি তা হল ব্লা ব্লা। আমি কেবল একটি কথা বুঝতে পেরেছিলাম, “ওহ! মাশাআল্লাহ! আপনি একটি চমত্কার বাচ্চা মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। আপনি কি তাকে দেখতে চান? ”

আমি ক্লান্তভাবে মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ!”

সেই মুহুর্তে, আমি অনুভব করছিলাম যেন চারপাশের কোলাহল বন্ধ হয়ে গেছে, এক পলকের জন্য আমি আমার বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরছি। আমি অশ্রু বন্যায় ডুবে ছিলাম – ঠিক কেন জানতাম না তবে বিশ্বের সমস্ত আবেগ যেন ঠিক ওই মুহূর্তে  আমার হৃদয়ে ছেয়ে গিয়েছিল। এটি ছিল ভালোবাসার গভীর এবং খাঁটি অনুভূতি, যা আমি কখনও অনুভব করিনি।

এখন, আমার  স্বামী শুধু আমার নয়; আমরা এখন তিনজনেই তিন ভাগে বিভক্ত। বাচ্চাটিই আমাদের সবকিছু এবং তার চাওয়া পাওয়াই আমাদের সব। গর্ভকালীন সময়ে যে চিন্তা ছিল এখন সব কেটে গেছে। বাচ্চাকে নিয়ে ২৪/৭ ব্যস্ত থাকতে হয়, তার পাশাপাশি গৃহাস্থালির সব কাজ গুছাতে হয়, এছাড়া বাচ্চার ডায়াপার পরিবর্তন করা, নার্সিং করা, তার পোশাকে লন্ড্রি করা ইত্যাদি কাজ নিয়েই আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়।

কাটিয়ে উঠার কষ্ট

যদিও মাতৃত্ব একটি দুর্দান্ত স্তর, তবে কয়েকটি কষ্টের স্তর পার করে এই পথে এসে পৌঁছাতে হয়। জন্ম দেওয়ার পরে স্বাভাবিক ব্যথা, স্তন্যপান করানো ইত্যাদি আমার প্রথমে অনেক কষ্টের মনে হয়েছিল, তবে কিছুটা ধৈর্য প্রয়োজন। যখন এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হল, তখন সমস্ত ব্যাথার অনুভূতি কেটে গেল। সেই থেকে এটি আমাদের দুজনের জন্য এক আনন্দের সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মনে রাখবেন,আপনি শিশুর জন্য ২৪ ঘন্টা কাজ করছেন, তাই ডায়েট বা ওজন হ্রাস সম্পর্কে কখনও ভাববেন না। আমাকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সুস্থ-সুষম খাবার পরিমিত পরিমণে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং আমাকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

আপনার শিশুকে স্বাভাবিকভাবে নার্সিং করা আপনার উভয়ের মধ্যকার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। আল্লাহ মায়েদেরকে তাদের শিশুদের দু’বছর দুধ খাওয়ানোর জন্য অনুরোধ করেছেন। এগুলি দুর্দান্ত উপহার যা আপনার সমস্ত ব্যথা এবং পরিশ্রমের প্রাপ্য।

নয় মাস ধরে, আমার স্বামী এবং আমি এই অলৌকিক ঘটনাটি সত্য হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম এবং শিশুটি কেমন হবে তা ছিল আমাদের একমাত্র কল্পনা।

বাচ্চা হওয়ার পর আমার কয়েক সপ্তাহ ঘুমের কষ্টটাই প্রবল ছিল। কিন্তু এটাও ধীরে ধীরে সয়ে গেছে।

সন্তান জন্মদানের কষ্ট,  ক্লান্তি প্রথমে খুব প্রবল হলেও ছোট্ট সোনামনিকে দেখার পর তা একদম মুছে গেছিল।

ক্যারিয়ার গঠন আগে আমার মূল লক্ষ্য ছিল। তবে, আমার স্বামী এবং আমি গর্বের সাথে বলতে পারব যে, আমাদের ছোট রাজকন্যাটিকে লালনপালন করাই এখন আমাদের লক্ষ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পিতৃত্ব

পিতৃত্ব বন্ধনও মাতৃত্ব বন্ধনের মত দ্রুত আবদ্ধ হয়। প্রসবের ঠিক পরে, আমার স্বামীই প্রথম আমাদের বাচ্চাটিকে কোলে নিয়েছিলেন। তিনি সারাটিদিন বিভিন্ন পোজ থেকে ছবি তোলা এবং ছোট্ট রাজকন্যার আগমন উদযাপনে তাঁর সমস্ত বন্ধুদের বার্তা প্রেরণে কাটিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে বাবা এবং সন্তান চূড়ান্তভাবে আবদ্ধ হয়ে ওঠে। মজার অংশটি জন্মের প্রথম রাতে ঘটেছিল। আমার বাচ্চাটি কাঁদলে আমার স্বামী তাকে প্রশান্ত করার চেষ্টা করছিলেন, তবে সে আমার আদর না পাওয়া পর্যন্ত চুপ করছিল না। প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন, অপরদিকে যখন আমাকে বাচ্চার স্তন্যপানের জন্য জেগে থাকতে হয়েছিল, তখন আমার স্বামীর উপর ঈর্ষা হচ্ছিল।

মাতৃত্ব অবশ্যই একটি কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা যখন ছোট তখন মায়েদের বিভিন্ন দায়িত্ব থাকে। বাচ্চার কাজ, সংসারের কাজ, তারউপর রাতে ঘুম না হওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চার রাতের ঘুম বেড়ে যায়। কিন্তু মায়েদের চিন্তার পাহাড় এবং কর্তব্য কমে না। শিশুর এক এক বয়েসে মাতৃত্ব এক এক ধাপে পৌঁছয়। মা যে নিজেও একদিন মেয়ে ছিল সেটা যেন কোন জাদুবলে ভুলে থাকা যায় । পরিণত এই মানসিকতা খুব সাবলীলভাবে চলে আসে মেয়েদের মধ্যে। কারণ অন্তরে সন্তান এবং সংসারের জন্য যে ভালোবাসা সে লালিত করে, তার কাছে সমস্ত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করার এবং কষ্ট সহ্য করার অতিমানবিক শক্তি চলে আসে।

আর সব মা হয়ে ওঠেন সুপারমম!