সন্তানকে দিন আল্লাহর দেখানো সহজ জীবনযাপন

shitota-yuri-p0hDztR46cw-unsplash.jpg
Fotoğraf: Shitota Yuri-Unsplash

বাংলা ভাষার বিখ্যাত এক লেখক বলেছেন, ‘উপকরণ প্রচুর থাকিলে মনটা কুঁড়ে হইয়া পড়ে, সে কেবলই বাহিরের উপরেই সম্পূর্ণ বরাত দিয়া বসিয়া থাকে, ভুলিয়া যায় আনন্দের ভোজে বাহিরের চেয়ে অন্তরের অনুষ্ঠানই গুরুতর।’

বর্তমান সমাজে দাঁড়িয়ে এর থেকে সত্যি কথা সম্ভবত আর কিছু নেই। আর এই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সন্তানকে মানুষ করার সময়। সামাজিক নানাপ্রকার ভ্যালিডেশন ও প্রতিযোগিতার চোটে বাবা-মা শিশুকে খুব তাড়াতাড়ি বড় করতে চান, ফলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির যে আনন্দ সেটা থেকে সে বঞ্চিত হয়।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আজকাল প্রত্যেকটা বাচ্চার খেলনাই এমন যাতে তার বুদ্ধির চূড়ান্ত বিকাশ হয়। ম্যাথ পাজল, জিগস পাজল, ওয়ার্ড গেম, প্রতিটা খেলাই এমনভাবে বানানো যাতে শিশুর সম্পূর্ণ বিকাশ হয়। সে যেন মগজ খাটাতে পারে। আমরা শুরু থেকে ছোট্ট আইনস্টাইন, ছোট্ট রামানুজন বানাতে চাইছি আমাদের সন্তানদের। কিন্তু বাস্তবে এটা কতটা ফলপ্রসূ? আদতে কি ছোট্ট মাথাগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি হয় না এভাবে? বাচ্চাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি তখনই হয় যখন তাদের নিজের মতো চিন্তা করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধি, চিন্তাশক্তির বিকাশ হয় এভাবেই। কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতারও উন্নতি হয়। 

আদর্শ মুসলমান হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হল সহজ ও স্বাভাবিকভাবে কীভাবে নিজের সন্তানকে ইবাদতের ও আল্লাহের পথের শিক্ষা দেওয়া। প্রাচুর্য্য ও অতিরিক্ত জিনিস শিশুর হাতে তুলে দিলে শিশুর সঠিক বিকাশ হয় না। তাই, অভিভাবকত্বের প্রধান লক্ষ্য হল অল্প আয়োজনে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া। একটা মাটির ঢেলা থেকে আপনি আপনার সন্তানকে মহৎ হতে শেখাতে পারেন। প্রবহমান পানি থেকে অন্যের জন্য ভাবতে শেখাতে পারেন। তার জন্য জটিল খেলনা সামগ্রীর প্রয়োজন হবে না।

নিম্নলিখিত সহজ পদ্ধতি গ্রহণ করলে আপনি আপনার সন্তানকে মিনিমালিস্টিক ভাবেই বড় করে তুলতে পারবেন…

১। চিত্তবিক্ষেপ কমিয়ে মনযোগ বৃদ্ধি করাঃ সন্তানের হাতে প্রচুর জিনিস তুলে দিলে দুটো ব্যাপার হয়, 

প্রথমত; তার মনোযোগ কমতে থাকে। এক জিনিসে ফোকাস করার ক্ষমতা কমতে থাকে। চিত্তবিক্ষেপ ঘটে।

দ্বিতীয়ত; বাবা মায়ের কাজ বাড়ে, চঞ্চল বাচ্চাকে সামলানো কিন্তু মুখের কথা নয়।

সেক্ষেত্রে, খেয়াল রাখতে হবে শিশু কোন খেলনা নিয়ে একেবারেই খেলছে না। কোন জিনিসে তার আর আগ্রহ নেই। সেই খেলনা বা জিনিস তার হাতের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে হবে। অতিরিক্তের প্রতি আকর্ষণ কমতে থাকলেই মনোযোগ বাড়বে শিশুর। 

২। ডিট্যাচমেন্ট ও অ্যাটাচমেন্টঃ সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অ্যাটাচমেন্ট থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অ্যাটাচমেন্ট মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলেই মুশকিল। ইমাম আলি ইবন আবি তালিব (আঃ)-এর মোনাজাত থেকে বর্ণিত, ‘সেদিন গোনাহগার ব্যক্তি পণস্বরূপ দিতে চাইবে তার সন্তান-সন্ততিকে,’ (পবিত্র কোরআন, ৭০:১১)

এইখান থেকেই প্রশ্ন করা যায়, তাহলে সন্তানের প্রতি আমাদের এই স্নেহ, মায়া, মমতা এর আসল কারণ কী? আমরা কতজন মেনে নিতে পারি সন্তান যদি নিজের মতো হতে চায়। 

সন্তান প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহ আসলে আমাদের পরীক্ষা নেন। আমাদের সন্তান আসলে আল্লাহ প্রদত্ত উপহার ও দায়িত্ব, আমাদের কাজ সঠিক ভাবে তাঁদের ইমানদার মুসলমান বানিয়ে আল্লাহের কাছে ফেরত পাঠানো। সন্তান শুধু ‘আমার’ ভাবলে সেই সংযোহ ধীরে-ধীরে বিষবৎ হয়ে উঠবে। সমস্ত অভিভাবকের এটা মনে রাখা উচিৎ, আদতে সমস্তটাই আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি কাণ্ডারী, আমরা তাঁর অনুগামী মাত্র। 

সহজ অধ্যাত্মবাদঃ 

মাতৃত্বের সঙ্গে আসে অধ্যাত্মবাদ। অভিভাবকত্বের সঙ্গে আসে আল্লাহের প্রতি ভরসা। সন্তানের জন্মের পর থেকে তাকে বড় করে তোলা এক সম্পূর্ণ নতুন পথ। সেই পথে সংশয়ব্যাকুল হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। আয়াতুল্লাহ মুহাম্মদ তাকিবেহজাতের মতো বিদ্বজন বলেছেন, ‘ শরিয়া থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করা হয় তা নির্দ্বিধায় মেনে চললে জীবনের সব রাস্তা সহজ হয়ে যায়।‘ তিনি আরও বলেছেন, ‘মানুষ যদি নিজের জানাটুকুর মধ্যে চেষ্টা করে, তাহলে আল্লাহ অজানার রাস্তা বাতলে দেন।‘ সুতরাং, সন্তান কে বড় করে তোলার নতুন পথে যদি আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা যায় তবে আল্লাহই উপায় দেখিয়ে দেন। 

তাঁর কাছে সমর্পণের বিনিময়ে আসে নিত্যদিনের সদর্থক ভাবনা, আনন্দ, উৎসাহ, ও উদ্দীপনা। দিনের শেষে নিজের সবটুকু দিয়ে নিজের পরিবার ও সন্তানের খেয়াল রাখা যায়।