সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিন ছোট থেকেই

শিশু ১৬ মার্চ ২০২১ Contributor
মতামত
সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা
© 9dreamstudio | Dreamstime.com

সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা কীভাবে দেবেন, এটি এখন বিশ্বজুড়েই একটি চর্চার বিষয়। সমগ্র পৃথিবীতে এখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার এক অদ্ভুত বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। ধর্মে-ধর্মে ভেদাভেদ তীব্র থেকে তীব্রতর আকার আকার ধারণ করছে, আর সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে একে অপরকে অবিশ্বাসের আবহ। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্সে বা বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকার মতো পশ্চিমী দেশগুলিতে, ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ এক ধর্মের মানুষদের বা বলা ভাল, মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে।

তৈরি হয়েছে নতুন এক শব্দবন্ধ, ‘ইসলামোফোবিয়া’, অর্থাৎ ইসলাম ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি ঘৃণা। এই পরিস্থিতিতে আপনার সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ ছোট থেকে সে কোনটা ভাল-মন্দের তফাৎ করতে শেখে। স্কুলে বা কলেজেও তাকে অন্য ধর্মের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়। তাই ছোট থেকেই সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেওয়া উচিত? কিন্তু কীভাবে দেবেন এই শিক্ষা? কীভাবেই বা সে অন্যের ধর্মকে, অন্যের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে? আজকের আলোচনায় আপনার সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হল।

১. আপনার সন্তানের কাছে আদর্শ হয়ে উঠুন

এটা সকলেই জানেন যে বাচ্চারা বাড়িতে আম্মু-আব্বুকে দেখেই বড় হয়ে ওঠে। অনেকসময় বাবা-মা যা করেন, সে তা-ই নকল করে চোখ বুজে। তাই আপনার নিজের আচার-আচরণ, কথাবার্তায় সতর্ক হওয়া উচিত। আপনার ছোট সন্তানের সামনে এমন কোনও কথা বলে ফেলবেন না, যাতে আপনি না চাইতেও সে সেটি শিখে ফেলে। তাই সন্তানের সামনে অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কোনও খারাপ কথা বলা বন্ধ করুন। নিজে মনে-প্রাণে পরধর্মসহিষ্ণু, উদার হয়ে উঠুন, দেখবেন, আপনার সন্তানও সেরকমভাবে বড় হয়ে উঠবে। সেও নিজের ধর্মের পাশাপাশি অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান নিয়ম করে প্রার্থনা করুক, তাহলে নিজেও তার সামনে প্রার্থনা করুন।

২. সন্তানকে নিজের ধর্ম ও মূল্যবোধ বোঝান

অন্যের ধর্মকে বুঝতে গেলে বা শ্রদ্ধা করতে গেলে নিজের ধর্মকে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। তাই, নিজেদের ধর্মের মূল্যবোধ, বিশ্বাসগুলি তাকে জানান। ইসলামের ইতিহাস, নবী, খলিফাদের কাহিনি সম্পর্কে তাকে ওয়াকিবহাল করে তুলুন। ইসলামি ঐতিহ্যে যে বিশেষ উৎসবগুলি রয়েছে, সেগুলির গুরুত্ব, উৎস সম্পর্কে আপনার সন্তানকে জানান। খানিক বড় হলে তাকে পবিত্র কোরান পাঠের অভ্যেস করান। এতে সে মানুষ হিসেবেও সৎ ও উদার হয়ে উঠবে।

৩. সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে তাকে অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানান

শিশু যখনই ছোট থেকে কেবল নিজের ধর্মকে জেনেই বড় হয়, তখনই সে বড় হয়ে অন্যের ধর্মকে বুঝতে চায় না। এর পাশাপাশি অন্যের ধর্মকে ছোট করে নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলেই ধর্মীয় বিভেদ, ‘আমরা’-‘ওরা’র দ্বন্দ্ব আরও বেশি করে তৈরি হয়। তাই যেভাবে তাকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাবেন, সেই একইভাবে তাকে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মগুলির উৎসব, ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানান। বোঝান যে, সমস্ত ধর্মের মূল সুর

আদতে এক, তা কোথাও গিয়ে আসলে শান্তির কথাই বলে। এইভাবে বাড়িতে ধর্মীয় উদারতার পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকলে সে স্বাভাবিকভাবেই উদারমনস্ক হবে।

৪. সন্তানকে ধর্মীয় ভেদাভেদের খারাপ দিকগুলি দেখান

এই শিক্ষাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বাচ্চাকেই দেখা যায় তারা স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অন্য ধর্মের সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশাকে এড়িয়ে চলে। আপনার সন্তান যদি এটা করে, তাহলে তাকে বোঝান। তবে বকাবকি করবেন না, বন্ধুর মতো বোঝালে উপকার পাবেন। কেন সে এটা করছে, সে সম্পর্কে জানতে চান। তারপর আপনার কথা তাকে বলুন। ধর্মীয় ভেদ যে হানিকারক, তা কীভাবে মানুষের ক্ষতি করছে, সে সম্পর্কেও সম্যক ধারণা দিতে থাকুন।

৫. বিভিন্ন ধর্মের মিলগুলো তাকে দেখান

বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে বেশ কিছু সংস্কৃতিগত ফারাক থাকে। আর এই ফারাকের ফলেই আমরা অন্য ধর্মের মানুষদের এড়িয়ে চলি। কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখবেন, ইসলাম, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদি ইত্যাদি সমস্ত ধর্মের মধ্যেই বেশ কিছু তত্ত্বগত মিল রয়েছে। এই মিলের জায়গাটি ছোট থেকে আপনার সন্তানকে বোঝান। তবে এই বোঝানোর কাজটি কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ এইসব কথা বাচ্চাকে সহজ কথায়, গল্পচ্ছলে বোঝানো নেহাত মুখের কথা নয়! এইভাবে দেখতে শিখলে আপনার সন্তান অনেক বেশি পরধর্মসহিষ্ণুতা হয়ে উঠবে।

৬. সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দিন

বাচ্চারা ছোটবেলায় স্বভাবতই কৌতূহলী হয়। সে আপনাকে নানা প্রশ্ন করতেই থাকবে। তার স্কুলের পাশের বেঞ্চে বসা বন্ধু কেন অন্যভাবে প্রার্থনা করে, এই প্রশ্ন সে করতেই পারে। তাই এগুলোর জন্য তৈরি থাকুন। তাকে উত্তর দিন। তবে বারবার বেশি প্রশ্ন করলে অনেক বাবা-মায়েরই রেগে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। এটি একেবারেই করবেন না।

৭. সন্তানকে যুক্তিবোধ শেখান

এর জন্য বাবা-মায়ের যুক্তিবাদী হওয়া জরুরি। অনেকেই মনে করেন, তাঁর ধর্মই বুঝি শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তাই তাঁরা অন্য ধর্মকে বা অন্য ধর্মের মানুষকে একেবারেই মেনে নিতে পারেন না! আপনার মানসিকতা যদি এরকম হয়, তাহলে সাবধান। এটি কিন্তু আপনার সন্তানের উপরেও প্রভাব ফেলবে। নিজে উদার হয়ে উঠুন। যুক্তিবাদী হন। তাহলেই দেখবেন ধর্মীয় বিভেদের ঊর্দ্ধে উঠে আমরা কী সুন্দর হিংসা, হানাহানিহীন একটা পৃথিবী পাচ্ছি!

৮. সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিন

যদি দেখেন আপনার সন্তান অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করছে, তাহলে তাকে বোঝান। যদি পারেন, তাহলে আপনার অন্য ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের কথা, তাঁদের সঙ্গে আপনার কীরকম সম্পর্ক, সেটি তাকে জানান। কোনও একদিন আপনার সেই বন্ধুকে নিজের বাড়িতেও দাওয়াত দিতে পারেন, বা আপনিও সপরিবার তাঁর বাড়ি যেতে পারেন। এভাবেই দেখবেন, আপনার সন্তানের মনে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে এবং সে অন্যের ধর্ম বা সংস্কৃতিকে সহজেই মেনে নিতে পারছে।

মনে রাখবেন, আপনার সন্তানই কিন্তু এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সুস্থ রাখার দায় তার ঘাড়েও একদিন বর্তাবে। ফলে ছোট থেকেই সন্তানকে পরধর্মসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিন, উদার হতে শেখান। দেখবেন হিংসা, ধর্মীয় বিভেদ ভুলে একদিন এই পৃথিবীও সুন্দর হয়ে উঠেছে!