সন্তানকে মানুষ করতে গেলে নিজের মধ্যে যে গুণগুলি আবশ্যক

Enfant apprend Salat pour la première fois, père – fils
© Rawpixelimages | Dreamstime.com

সন্তানকে নিজের মনের মতো করে মানুষ করে তুলতে কোন বাবা মা-ই বা চায় না? আমাদের উম্মাতের মূল উদ্দেশ্য হল সন্তানকে আমাদের চিন্তাধারা অনুসারে ইমানদার মুসলমান বানিয়ে তোলা। কিন্তু, সন্তানের মঙ্গলার্থে শাসন ও শিক্ষা দিতে দিতে পিতা মাতা অনেকসময়ই বিস্মৃত হন যে আমাদের একটি প্রবাদ রয়েছে, ‘আপনি আচরি ধর্ম পররে শেখাও।’ অর্থাৎ সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার আগে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন, আপনি ঠিক সেই শিক্ষাগুলোই নিজের জীবনে মেনে চলছেন বা চলেছেন কী না। 

শিশুকে জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি আছে, 

সদর্থক ও সৎ পথপ্রদর্শক হয়ে উঠুনঃ
পিতা মাতার এটা মাথায় রাখা উচিৎ যে সন্তান সবচেয়ে বেশি অনুকরণ করে আপনাদের। সবচেয়ে যুক্ত থাকে আপনাদের সঙ্গে। তাই আপনার ব্যবহারের প্রকট প্রভাব তার উপর পড়বে সবচেয়ে বেশি। সন্তানের সঙ্গে পজিটিভ ব্যবহার করুন। আপনার মূল্যবোধ, ভাবধারা, ব্যবহারের সদর্থক উদাহরণ যেন সবসময় তার সামনে থাকে। আল্লাহর ইবাদত করুন, সন্তান যেন দেখে আপনি আল্লাহর উপাসক ও তিনিই আপনার পথপ্রদর্শক। 

ন্যায়ের পথে থাকুনঃ
সন্তানের উপর অতিরিক্ত প্রশ্রয়হেতু তার অন্যায়কে সমর্থন করবেন না। আপনার দুই সন্তানের মধ্যে প্রশ্রয়হেতু বিভেদ করবেন না। যদি আপনার এক সন্তান বোঝে যে আপনি অপরজনকে একটু বেশি পছন্দ করেন তাহলে তার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। সেই ক্ষোভ থেকে সে আপনাকে ভুল বুঝবে। তাছাড়াও মহান আল্লাহ আমাদের নিরপেক্ষ থাকতে বলেছেন সবসময়, সেই দিক থেকে ন্যায়ের পথে থাকা সবচেয়ে সমীচিন। 

সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানঃ
কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে কিছুতেই জিকির করতে পারবেন না কেন দিনের মধ্যে অন্তত তিরিশ মিনিটও কেন নিজের সন্তানের কাছে এসে বসতে পারেননি। মনে রাখবেন আপনার সন্তানকে আল্লাহর পথে তৈরি করার জন্য আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত আল্লাহ ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে আলোচনা করুন। তাকে দায়িত্ববান হতে শেখান। মানুষের উপকার করতে শেখান। নিজের কাজে বা আমোদ প্রমোদে মত্ত হয়ে সন্তানের দায়িত্ব অন্য কারোর হাতে দিলে পরবর্তীতে সন্তান যদি ইমানের পথে না থাকে তাহলে নিজেকেই দায়ী করতে হবে। শিশুর মনোজগত ভীষণ সুন্দর। তার কল্পনার অংশীদার হয়ে উঠুন। আজ শিশুর সঙ্গে সময় কাটালে আপনার বৃদ্ধ বয়সে শিশু পরিণত যুবক হয়ে আপনার সঙ্গে সময় কাটাবে।

সহ্যশীল হোনঃ 

সন্তানের একটু দুষ্টুমিতে মেজাজ হারিয়ে ফেলে তাকে দোষারোপ করবেন না। শিশু স্বভাবতই চঞ্চল, সে চঞ্চলতা করবেই। আপনি শান্ত থাকবেন, নির্দোষ দুষ্টুমিতে আনন্দ নেবেন কিন্তু ক্ষতিকারক সুষ্টুমিতে শান্ত ভাবে বোঝাবেন। আপনি যদি লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়ার কথা ভাবেন তাহলে শিশুর চোখে আপনার সম্মান থাকবে না আর। আনস যখন নবীর সেবাযত্ন করছিলেন দশ বছরের জন্য তখন আনস নবীজির মুখ থেকে কখনও কোনও অভিযোগ বা ধমক শোনেননি। 

বুদ্ধিমান হোনঃ

সন্তানকে মানুষ করার জন্য আপনাকে বেশ বুদ্ধির কিছু পদ্ধতি নিতে হবে। গল্পচ্ছলে আল্লাহ ও আমাদের প্রিয় নবীর গল্প সন্তানকে জানাতে হবে। এমনভাবে গল্প বলতে হবে যাতে তা শিশুর হৃদয়ে প্রবেশ করে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসা ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘হে বৎস! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শেখাব। আল্লাহর বিধানগুলো যথাযথভাবে মেনে চলবে, আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। আল্লাহর দাবিগুলো (হুকুমকে) আদায় করো, তুমি আল্লাহকে তোমার সামনেই পাবে। আর তোমার কারো কাছে কিছু চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। সাহায্য চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে। জেনে রেখো! যদি সব সৃষ্টি একত্র হয়ে তোমার কোনো উপকার করতে চায়, তবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ছাড়া কখনোই তোমার উপকার করতে পারবে না। আর যদি সব সৃষ্টি একত্র হয়ে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়, তবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ছাড়া কখনোই তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৬)

আল্লাহ সবসময় আমাদের সন্তানকে খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে বলেন। 

আমি যে রিযক তোমাদের দিয়েছি তা থেকে পবিত্রগুলো আহার কর- সূরাহ আল-বাক্বারাহ ২/১৭২)। তিনি আরও বলেনঃ তোমাদের উপার্জিত পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর- সূরাহ আল-বাক্বারাহ ২/২৬৭)।তিনি আরও বলেনঃ পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর এবং সৎ কর্মশীল হও। তোমরা যা করছ আমি তা জানি- সূরাহ আল-মু’মিনূন ২৩/৫১)।

গল্প বলতে শিখুনঃ
সন্তানকে গল্পের মাধ্যমে শিক্ষাদানের থেকে উপকারী আর কিছু হয়না। সন্তানকে গল্প বলতে গেলে নিজেকেও সেই গল্প সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। কুর-আনের এক তৃতীয়াংশে প্রভূত শিক্ষামূলক গল্প রয়েছে, এছাড়া নবীর প্রভূর চমকপ্রদ কাহিনী রয়েছে। এগুলোই শিশুকে শোনাতে হবে। 

আল্লাহ বলেছেন,তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত হেদায়েত।‘ [কুরআন ১২:১১১]

ধৈর্য্যশীল হোনঃ 

শিশুর কথা ধৈর্য্য নিয়ে শুনুন। জানতে চান তার মনের মধ্যে কী চলছে। আপনি যদি তার প্রতি কথাতেই মেজাজ হারাতে থাকেন তাহলে সে একসময় নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাবে। মহান নবী যখন আয়েষার সঙ্গে কথা বলতেন তখন কখনোই রাগ করতেন না। শান্তভাবে তার প্রতিটি কথা শুনতেন। শিশু কল্পনাপ্রবণ, সে হয়তো সবসময় যুক্তিপূর্ণ কথা বলে না, কিন্তু তার চিন্তাভাবনাকে আপনিই সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারবেন।

সঙ্গী হয়ে উঠুনঃ
আপনিই কিন্তু আপনার শিশুর সবচেয়ে আগে বন্ধু। ছোটবেলা থেকে সে আপনাকে দেখেছে, আপনার সান্নিধ্যে সংস্পর্শে বড় হয়েছে। শিশুর হৃদয় সাদা নিদাগ কাগজের মতো হয়। সেই হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালবাসার বাণী আপনাকেই লিখতে হবে। অন্যান্য দুষ্ট ক্ষতিকারক সংস্পর্শ থেকে আপনাকেই বাঁচাতে হবে আপনার সন্তানকে। 

নজরে রাখুনঃ
সন্তানকে শেখালেন মিথ্যা বলা অন্যায়, তারপর কিন্তু সেই বিষয়টি অবহেলা করবেন না। খেয়াল রাখুন সন্তান মিথ্যা বলছে কিনা, বা আপনাকে লুকিয়ে অন্য কোথাও মিথ্যা বলছে কিনা। সন্তানকে বড় করে তোলা আসলে বীজবপনের মতো। শুধু বীজ পুঁতে দিলেই হয় না। নজরে রাখতে হয়। পানি দিতে হয়।