সন্তানহীনতার হতাশা কাটাবেন কীভাবে?

childless couple
Paper figure of a childless couple holding hands on gray surface. ID 142387464 © Merkushev | Dreamstime.com

সন্তান প্রতিটা মানুষের একটা অসম্ভব ভালোবাসা ও আবেগের বস্তু। একটা ছেলে ও মেয়ে উভয়েই পড়াশোনা শেষ করে চাকরি শুরু করেও তারপর বিয়ের কথা ভাবে। আজকাল বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই অনেকেই নতুন অতিথির কথা মাথায় আনে না, বছর পার করে নিজেদের বন্ধন ঠিক করার জন্য। শহরাঞ্চলে এভাবে ২৮-৩০ বছর বয়স হয়ে যায় একটি চাকরিজীবী মেয়ের প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে। অনেকেই প্ল্যানিং করার সঙ্গে সঙ্গেই সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। যত দেরি হয়, তত মানসিক চাপের মাঝে পড়ে যায়।

সমাজে এই মুহূর্তে নিঃসন্তান দম্পতিদের  সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে এটা মানবসমাজে হতাশার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইসলাম যদিও সন্তান পালন এবং সংসারী জীবনযাপনে উত্সাহ দিয়ে থাকে, তবুও হতাশাগ্রস্তদের জন্যও পবিত্র কুরআনে কিছু নির্দেশনা রয়েছে। সন্তানহীনতার সমস্যা শুধু আজকের নয়। পূর্বেও ছিল। তবে এমন ব্যাপক হারে হয়তো নয়।

কুরআনে বর্ণিত ঘটনা। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন বার্ধক্যে উপনীত, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একদল ফেরেশতা এসে তখন তাঁকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ শোনাল। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন- আমাকে তো বার্ধক্য পেয়ে বসেছে, এরপরও তোমরা আমাকে এ সুসংবাদ দিচ্ছ?! কীসের ভিত্তিতে তোমরা এ সুসংবাদ দিচ্ছ? ফেরেশতারা বলল, আমরা তো সত্য কথাই বলছি। আপনাকে সত্য সুসংবাদই দিচ্ছি। বার্ধক্য আপনাকে স্পর্শ করেছে করুক, এ বৃদ্ধ বয়সেই আপনার সন্তান হবে। আপনি নিরাশদের দলে যাবেন না। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাদের কথার জবাবে বললেন, পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কে আপন প্রতিপালকের রহমত থেকে নিরাশ হতে পারে? (সূরা হিজ্র, ৫৩-৫৬ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)

আরেকজন নবীর আরেকটি ঘটনা। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সর্বাধিক প্রিয় সন্তান ছিলেন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম। কিন্তু তাঁর ভাইয়েরা বাবার এই আদরকে সহজে মেনে নিতে পারেনি, তাই কৌশলে তাঁকে একদিন বাবার কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে কূপে ফেলে দিল। আল্লাহর অসীম কুদরতে কূপ থেকে উঠে এসে একদিন তিনি মিশরের ধনভান্ডারের দায়িত্বশীল হলেন। আর যে ভাইয়েরা তাঁকে নিয়ে চক্রান্ত করেছিল, দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে তারা খাবার আনতে হাজির হলো তাঁর কাছে। এরপর এক কৌশলে তিনি তাঁর সহোদর বিনইয়ামীনকে নিজের সঙ্গে রেখে দিলেন। দুই ছেলে হারিয়ে বাবা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম অন্য ছেলেদের বললেন, (তরজমা) ‘হে আমার ছেলেরা! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান করো। তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহর রহমত থেকে তো কাফের ছাড়া অন্য কেউ নিরাশ হতে পারে না।’ -সূরা ইউসুফ (১২) : ৮৭

এ দুই নবীর শেষ কথা- এক আল্লাহকে যারা বিশ্বাস করে, যারা মুমিন, যারা সঠিক পথের অনুসারী, তারা তো কিছুতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে পারে না। তাঁরা উভয়েই ছিলেন পার্থিব বিপদের শিকার। একজন সন্তানহীন অবস্থায় পুরো জীবন কাটিয়ে বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন, আরেকজন এক সন্তানের শোকেই যখন পাথর হওয়ার অবস্থা, তখন হারালেন আরেক সন্তান! তবুও তাঁরা আল্লাহর অসীম কুদরতের কাছে আশাবাদী ছিলেন। হতাশা তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। পরিশেষে তাঁরা উভয়েই এই পৃথিবীতে থেকেই এর ফল ভোগ করে গেছেন।

দেখা যাচ্ছে, প্রাপ্তির আশা যেমন রয়েছে আমাদের জীবনে, তেমনি রয়েছে হারানোর বেদনা এবং হতাশা। জীবন ধারণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন আদান-প্রদান বা লেনদেনে অনেক কিছু না পাওয়ার আঘাতে হতাশ হই আমরা। আজকের বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে দেরি করে হলেও সন্তান ধারণে সক্ষম হচ্ছেন মধ্য বয়স্ক দম্পতিরা। উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ওষুধ আশা দেখাচ্ছে সন্তান কাঙ্খিত পরিবারগুলিকে। কিন্তু সমাজের মানসিক নিপীড়ন, অমঙ্গল চিহ্নিতকরণ এই দম্পতিদের অসামাজিক প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। পরম করুণাময় ঈশ্বর কিন্তু তাঁদের পাশে রয়েছেন। সর্বক্ষণ।

“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব সামান্য ভয় ও ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফসলের কিছুটা ক্ষতি দিয়ে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও- যাদের ওপর কোনো মসিবত এলে বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’- নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর আর অবশ্যই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব।” -সূরা বাকারা (২) : ১৫৫-১৫৬