সন্তান জন্মের পর নতুন মায়ের মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিক, এর সঙ্গে যুঝবেন কীভাবে?

baby and new mom

সন্তান ও মায়ের সম্পর্ক নিয়ে আল্লাহর অভূতপূর্ব সুন্দর একটি বাণী রয়েছে, 

‘আর আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি তোমার পিতামতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।‘ [কুরআন ৩১:১৪] 

আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সন্তান জন্মের সময় ও সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের জীবন কীভাবে অন্যরকম হয়ে ওঠে। কেন বলা হয় যে মা হওয়া নয় মুখের কথা? কারণ নারী থেকে মা হয়ে ওঠার মধ্যে রয়েছে এক অনুপম সৌন্দর্যময় জীবনবোধ। যে জীবনবোধ একজন নারীকে পরিপূর্ণ করে তোলে।

নারী থেকে মা হয়ে ওঠার সবচেয়ে কঠিন সময় সন্তান জন্মের ঠিক পরে পরে, বিশেষ করে সেই সন্তান যদি নারীর প্রথম সন্তান হয়। নাড়ি কেটে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার আনন্দ ও দায়িত্ব যুগপত সেই নারীকে বহন করতে হয়। সন্তান জন্ম দেওয়ার এই পদ্ধতিতে মায়ের মধ্যে আবেগ, বিশ্বাস, ভালবাসা, ভয়, অধিকারবোধের এমন অপূর্ব মিশেল দেখা যায় যে মা নিজে নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করেন। দায়িত্ব নিতে শেখেন। এই দায়িত্ব যদিও অপত্য থেকে আসে তবুও এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মায়ের কিছু বিশেষ জীবনের শিক্ষারও প্রয়োজন হয়। মা হয়ে ওঠার পর যে বিশেষ মানসিক পরিবর্তন হয়, খানিক শিক্ষা ও অনেকখানি ভরসা দিয়ে সেই পরিবর্তনের যত্ন নেওয়া যায় অনায়াসেই। 

একজন সদ্য মা হয়েছেন এমন নারীর জীবনে নিম্নলিখিত মানসিক পরিবর্তনগুলি খুব স্বাভাবিক ,

সাধারণ মানসিক পরিবর্তন
সন্তানের জন্মের পর একটি নারীর ভাবনাচিন্তার আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রথমেই যেটা আসে সেটা হল অপত্য এবং ভয়। অপত্য কারণ নিজের শিশুকে আগলে রাখার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি আসে। আর ভয় কারণ প্রতি মুহূর্তে সে প্রশ্ন করে যে সে আদৌ ভাল মা হয়ে উঠতে পারবে কিনা। তাছাড়া অনেকসময় এই ভয় থাকে যে সে হয়তো নারী হিসেবে তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে, তার পরিচয় হয়ে উঠছে শুধু কারোর মা। এর ফলে নিজের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা অনেকসময়ই বেশ অসংলগ্ন হয়ে ওঠে। এই সময় পরিবারের লোকের, বিশেষ করে শিশুর পিতার পাশে থাকা ভীষণভাবে প্রয়োজন। মা কে বোঝাতে হবে যে শিশুর জন্ম মানে তার জীবনের এক নতুন দিক উন্মোচন হয়েছে। সেই দিক তার অন্য জীবনের সঙ্গে মিলে তাকে আরও সম্পূর্ণ করে তুলবে।

বেবি ব্লুজ
শতকরা ৮০ শতাংশ মা সন্তানের জন্মের পর বেবি ব্লুজ নামক একটি অবস্থায় ভোগেন। সন্তানের জন্মের পর থেকে এক দু সপ্তাহ পর্যন্ত এই অবস্থা বজায় থাকে। এটি মূলত সন্তানের জন্মের পর হরমোনের পরিবর্তনের জন্য হয়। সাধারণত মুড সুইং (কখনও খুব আনন্দ, কখনও খুব দুঃখ), হঠাত হঠাত কান্না, অধৈর্য্য মনোভাব, রেগে থাকা সবসময়, উদ্বেগ, একাকীত্ব ইত্যাদি অনুভূতিগুলি প্রকট থাকে।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন
মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নতুন মায়েরা এই ডিপ্রেশনটিতে ভোগেন। শুরুতে অনেকটা বেবি ব্লুজের মতো মনে হলেও এই উপসর্গ ক্রমশ বাড়তে থাকে। একসময় মা একটি গভীর বিষাদের মধ্যে চলে যেতে পারে। সাধারণত সন্তান জন্মের এক বছর পর্যন্ত এই ডিপ্রেশন থাকে। এই সময় মা হয় বাচ্চার প্রতি ভীষণ প্রোটেক্টিভ হয়ে ওঠে অথবা সন্তানের প্রতি তার কোনও আগ্রহই থাকে না। ইনসোমনিয়া দেখা দেয়, নিজের প্রতি যত্ন থাকে না। খাওয়া দাওয়ার ইচ্ছে কমে যায়, অখিদে, ওজন হ্রাস, হঠাত হঠাত কেঁদে ওঠা, ভয় পাওয়া ইত্যাদির সম্মুখীন হয় নতুন মা। 

এই ডিপ্রেশনের সমূহ চিকিৎসা প্রয়োজন। বাড়ির লোকের খেয়াল রাখা ও আগলে রাখা, স্বামীর ভালবাসা, ডাক্তারি কাউন্সেলিং, প্রয়োজনে ওষুধ খেয়ে এই অসুখের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

পোস্টপার্টাম সাইকোসিস
মাত্র ১ শতাংশ নতুন মা এই সমস্যার সম্মুখীন হয়। সন্তান জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যে ভুল বকা, হ্যালুসিনেশন, ডিলিউশন, অসংলগ্ন কথাবার্তা, হঠাত হঠাত ভয়ানক রাগ, বাচ্চার ও নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা ইত্যাদি এর মূল উপসর্গ। অবসম্ভাবিভাবে ডাক্তারের চিকিৎসা প্রয়োজন এই ক্ষেত্রে। 

মানসিক পরিবর্তন সামলে নেওয়া
সন্তান জন্মের পরের মানসিক চাপ সামলে নিতে একজন নারীর সবার আগে প্রয়োজন বিশ্রাম, সুষম খাদ্য ও ঘুম। এর পর প্রয়োজন পরিবারের তার প্রতি যত্ন। অল্প ব্যায়াম করলেও উপকার হয়। স্বামীর সহযোগিতা খুব প্রয়োজন এই মুহূর্তগুলিতে। স্বামী যদি বন্ধু হিসাবে পাশে থেকে সমর্থন জানান তার থেকে ভাল আর কিছু নেই। 

এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে মা হওয়া মানে সে মানুষজন্মের উর্ধ্বে উঠে যাওয়া কোনও মহান নারী নয়। তার জীবন শুধু একটা পর্যায় থেকে আরেকটা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তাই নিজের মাতৃত্ব থেকে সাংঘাতিক কিছু আশা করতে শুরু করলে আখেরে সেটা নিজেরই ক্ষতি।

আল্লাহ বলেছেন, ইমানদার ও সহি মুসলমান রমণী মাতৃত্বকে উপহার হিসেবে আলিঙ্গন করবে এবং নিজের জীবনের সঙ্গে সঠিক ভারসাম্য রেখে সন্তানকে মানুষ করে তুলবে।