সন্তান প্রতিপালনে ভালোবাসা ও শিক্ষার সমন্বয় কীভাবে ধরে রাখবেন?

dreamstime_s_95685000

আল্লাহ তা’আলা মানবশিশুকে নিষ্পাপ এবং ভবিষ্যৎ সফলতার এক সম্ভাবনা নিয়ে দুনিয়ায় পাঠান। সৃষ্টিগত কোনো যোগ্যতাই শিশু তার মায়ের পেট থেকে নিয়ে আসে না। বরং পৃথিবীতে দৃষ্টি মেলার পর তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পিতামাতা, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা-দীক্ষাই তার ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুকে ইসলাম যেমন স্নেহ-মমতা দিয়ে প্রতিপালনের আদেশ দিয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে সুন্দর নাগরিক ও পরকালীন উপযুক্ত পাথেয় হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাকে শৃঙ্খলা ও শাসনের মধ্যে প্রতিপালনের নির্দেশও দিয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই নিবন্ধে শিশুদের প্রতিপালনের কিছু দিক নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হল।

ছোট শিশুদের শারীরিক ভাবে যত্ন নেওয়া যেমন প্রয়োজন তেমনি তাদের তাদের মানসিক এবং আধ্যাত্মিক বিকাশকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

সন্তান জন্মদানের পর প্রতিপালন হিসেবে প্রথম যেটির কথা বলা যায় সেটি হল মায়ের বুকের দুধ। কারণ মায়ের বুকের দুধে আল্লাহ তা’আলা কুদরতীভাবেই শিশুর সকল শারীরিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন। মায়ের বুকের দুধ শিশুকে বিভিন্ন রোগবালাই এর হাত থেকেও রক্ষা করে। মায়ের বুকের দুধের গুরুত্বের কারণে ইসলামে শিশুর ২ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত বুকের দুধ খাওায়ানোকে মায়ের জন্য ওয়াজীব সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ন দুই বছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়াবার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়…” (আল কুরআন-২:২৩৩)

 শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক প্রতিপালন ও পারিপার্শ্বিকতা শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “পিতা সন্তানকে যা কিছু উপহার দেয় তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম উপহার হলো সন্তানকে উত্তম শিক্ষা দান করা।” তাই সন্তান প্রতিপালনে পিতামাতাকে অনেক বেশি যত্নশীল হতে হবে। সন্তানের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই ভবিষ্যতে সে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। ইসলাম শিশুর প্রতিপালনে কয়েকটি বিষয় লক্ষ রাখতে বলেছে।

-ঈমানী শিক্ষা নিশ্চিত করা

ঈমানী শিক্ষার অর্থ হলো, তাকে ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত, হালাল-হারাম, আল্লাহর পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় কাজ সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা। এই পরিমাণ দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করা পিতামাতার জন্য অবশ্য কর্তব্য।

-চারিত্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করা

শিশুকে শৈশব থেকে ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখাতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মানুষের সেবা, সময়ানুবর্তিতা, পরিমিতিবোধ ও অল্পতুষ্টির উপকার বোঝাতে হবে। একই সঙ্গে অপরিচ্ছন্নতা, মানুষকে কষ্ট দেওয়া, অন্যের ক্ষতি করা, কারো জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা ইত্যাদির মতো মন্দ স্বভাবগুলো সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে।

-বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চিত করা

বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য শিশুকে শৈশব থেকে ধর্মীয় ও শিক্ষনীয় বিষয় পাঠে অভ্যস্ত করা, বুদ্ধির বিকাশ হয় এমন খেলনা ও জ্ঞানচর্চার উপকরণের ব্যবস্থা করা। অর্থহীন গল্প না করে পূর্ববর্তী জ্ঞানী ও নেককারদের জীবনবৃত্তান্ত শোনানো। কুরআন-হাদিসে বর্ণিত গল্প ও ইতিহাস, ইসলামের স্বর্ণযুগের মনীষীদের জীবনী, আল্লাহর পথে তাঁদের ত্যাগ ও আত্মবিসর্জনের বিবরণও শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

-শারীরিক সুস্থতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা

শিশুর শারীরিক সুস্থতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ইসলাম প্রথমে মায়ের দুধে তার অধিকার নিশ্চিত করতে বলেছে।  দুধপানের সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পিতাকে সন্তানের জন্য উদারভাবে খরচ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের জন্য ব্যয়িত অর্থকে আল্লাহর পথে ব্যয়িত অর্থের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ইসলাম শিশুর শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করতে উপকারী খেলাধুলা সম্পর্কেও উৎসাহিত করেছে।

-মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা

শিশুর মানসিক বিকাশে ইসলাম শিশুর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে। শিশুর সামনে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছে। তাদের সঙ্গে মিথ্যা বলতে ও প্রতারণা করতে নিষেধ করেছে। শিশুর সামনে স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তার জন্য বৈধ খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করার নির্দেশনাও ইসলামে রয়েছে।

-সামাজিক শিক্ষা নিশ্চিত করা

শিশু প্রতিপালনে সামাজিক শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিশু কার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, সেটিই সামাজিক শিক্ষার মূল বিষয়। শিশুর সামাজিকীকরণে ইসলাম যৌথ পরিবারে উদ্বুদ্ধ করে। শিশুকে সামাজিক আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে বলে। বুঝবান শিশুকে মসজিদে, ঈদগাহে সাথে নিতেও উৎসাহিত করে। সমাজের সবার প্রতি ইসলামের নির্দেশ হলো, শিশুর প্রতি সুন্দর আচরণ করতে হবে, যেন সে সুন্দর আচরণ শিখে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যারা বড়দেরকে সম্মান করে না এবং ছোটদেরকে স্নেহ করে না সে আমার দলভুক্ত নয়”