সফরে থাকাকালীন সালাত পালন করবেন কীভাবে?

সালাত Contributor
মতামত
সালাত
© Prasit Rodphan | Dreamstime.com

বর্তমান সমাজে অন্য অনেক কিছুর মতোই কর্মক্ষেত্রের ধরনও পালটে গিয়েছে। বিশেষ করে গ্লোবালাইজেশনের ফলে এখন গোটা বিশ্বই আমাদের হাতের মুঠোয়। সেই কারণেই কর্মক্ষেত্রের প্রসার হয়েছে। কাজের সূত্রে একদেশ থেকে আরেকদেশ ঘুরে বেড়ানো এখন জলভাত।

আমার চাকরির ধরনটাও এমন। কাজের সূত্রে আমাকে আমেরিকা সহ আরও নানা দেশের ব্রাঞ্চে ঘুরে বেড়াতে হয়। ঝটিকা সফরের এই দিনগুলোতে নানাবিধ অসুবিধা ও চাপের মধ্যেও একটা জিনিস আমার মাথায় সবসময় থাকে… ইমানদার মুসলমান হিসাবে আমার নমাজ আদায় করায় যেন কোনও ফাঁকি না পড়ে।

প্রাত্যহিক সময়মতো সালাত, সঠিক হালাল খাদ্য গ্রহণ, ইসলামে বৈধ এমন পরিচ্ছন্নতা এইসমস্ত বিষয় গুলো অফিসের দায়িত্বের মতোই আমার মাথায় রাখতে হয়। অফিসের কাজের মতো আমার নিজের ইমানও নিজের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃত মুসলমান হলে যেকোনও প্রকারে এই বিষয়গুলো সে পালন করবে। আর আল্লাহ সদিচ্ছা দেখলে সবসময় সহায় হয়ে থাকেন।

মাস্টারকার্ড-ক্রিসেন্ট রেটিং মুসলিম বিজনেস ট্রাভেলার ইনসাইটের সম্প্রতি করা এক সমীক্ষায় এর সত্যতা দেখা গিয়েছে। ৭৮ শতাংশ মুসলমান ব্যবসায়ী ও চাকুরীজীবী, যাদের ঘুরে বেড়াতে হয়, সালাতের পরিচ্ছন্ন স্থান ও হালাল খাদ্যের সন্ধানে থাকেন।

সুতরাং, এই প্রতিবেদনে আমি চেষ্টা করব আমার মুসলমান ভাইদের এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ দেওয়ার। যেগুলো আমি ব্যক্তিগত ভাবে মেনে চলি।

সফরে থাকাকালীন প্রাত্যহিক সালাতের নিয়ম

সফরে আমি কখনওই সালাতকে অবহেলা করি না। কতগুলি নিয়ম মেনে চললে অতি সহজেই আপনি দৈনিক উপাসনা করতে পারবেন।

প্রথমত, আমি কাজা নমাজ আদায় করি। মহান আল্লাহ আমাদের মতো সফরে থাকা মানুষের জন্য এই নমাজের সৃষ্টি করেছেন। এর ফলে আমি একসঙ্গে দুটি নমাজ একসঙ্গে আদায় করতে পারি।

আমি যোহর ও আসরের নমাজ একসঙ্গে আদায় করি। সাধারণত আমার প্রাত্যহিক সফরসূচিতে এই দুই নমাজ আদায় করার স্থান হয় এয়ারপোর্ট বা অফিস।

এরপর, কাজের শেষে আমি মাগরিব ও এশার নমাজ পড়ি। আর ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে হোটেলের ঘরে ফজরের নমাজ দিয়ে আমার দিন শুরু হয়।

যদি আমি এমন কোনও শহরে যাই যেখানকার সময় আমার শহরের সময়ের থেকে আলাদা, তাহলে আমি ইন্টারনেটে দেখে নিই নমাজ আদায় করার সহিহ সময় কোনটা।

আমার অনেক সহকর্মী রাতের ফ্লাইটে সফর করা পছন্দ করেন। এর কারণ আমাদের সালাতের সবচেয়ে লম্বা পার্থক্য রয়েছে ফজর ও এশার মধ্যে। রাতে জার্নি করলে এয়ারপোর্ট বা ফ্লাইটে উপাসনার ঝক্কিটা থাকে না।

তবে, একা সফরের ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত,

‘রাসুল (সা.) কোনো ঘরে একাকী রাত যাপন ও একাকী সফর করতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫৬৫০)

এছাড়া আরও কিছু টিপস…

এয়ারপোর্টে সালাত

অনেক এয়ারপোর্টে সুন্দর ভাবে সালাত আদায়ের জায়গা রয়েছে। সালামওয়েবে দেখে নিতে পারেন কোন কোণ এয়ারপোর্টে এই ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সব এয়ারপোর্টে খুব সহজেই আপনি আপনার ব্যক্তিগত উপাসনা করতে পারবেন।

অফিসে উপাসনা

অনেক অফিসেই ‘ওয়েলনেস রুম’ বা ‘স্লিপিং রুম’ বলে বিশ্রাম নেওয়ার স্থান থাকে। সময়মত সেখানে আপনি উপাসনা করতে পারেন। আমি বহুবার মিটিং শেষে ও নতুন মিটিং-এর মাঝে নমাজ আদায় করেছি। যদি এই ধরনের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে যেকোনো ফাঁকা মিটিং রুমে আপনি নমাজ পাঠ করতে পারেন।

বিশ্বাস করুন, বেশিরভাগ মানুষ ইসলামকে সম্মান দেয়। আপনার ব্যক্তিগত উপাসনা ক্ষেত্রকে কেউ কলুষিত করবে না।

সালাতের জন্য কিবলার দিক নির্দেশ

সালামওয়েব কিবলার সঠিক দিক নির্দেশ করে। ফোনে সালামওয়েব ইন্সটল করলে কিবলার দিক নিয়ে আপনার কখনওই চিন্তা থাকবে না।

মাগরিবের আগে দুয়া পাঠ করা

কাজা নমাজের জন্য যেহেতু আমি মাগরিব ও এশার নমাজ একসঙ্গে আদায় করি, তাই মাগরিবের আগের ১৫ মিনিট আমি দুয়া পাঠ করি। ইন্টারনেটে আপনি সহজেই সমস্ত দুয়ার তালিকা পেয়ে যাবেন।

হালাল খাদ্যগ্রহণ

সফরে থাকাকালীন হালাল খাদ্যগ্রহণ একটি চিন্তার বিষয়। আমি সাধারণত মাছ ও সবজি খেতে পছন্দ করি। কিন্তু, সেগুলোও হালাল কিনা সেই নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

বাইরে খাদ্য গ্রহণের সময় আমি পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসা করে নিই কীভাবে এই খাবার বানানো হয়েছে। কোনও একটি পদ্ধতি আমার পছন্দ না হলে আমি আর খাই না। এয়ারপোর্টে একেবারেই আমিষ খাই না। মেক্সিক্যান ও মেডিটেরেনিয়ান স্যালাড সেখানে আমার প্রিয় খাদ্য।

এছাড়া আমি সঙ্গে সবসময় শুকনো খাবার রাখি। মাঝেমাঝে আমি সালামওয়েবের হালাল রেস্টুরেন্টের তালিকা থেকে একটি পছন্দ করে সেখানেই লাঞ্চ বা ডিনার সেরে নিই।

তাহারা বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা আমার অন্যতম চিন্তার একটি। শুধুমাত্র ধর্মের জন্যই নয়, শারীরিক সুস্থতার জন্যও সফরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়।

পাবলিক রেস্টরুমের ব্যবহার

এয়ারপোর্টের পাবলিক রেস্টরুম প্রায়শই খুব যে পরিষ্কার থাকে তা নয়। সেক্ষেত্রে আমি দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার পক্ষপাতী। এছাড়া আজকাল নানা প্রকার স্যানিটাইজিং স্প্রে পাওয়া যায়। সেগুলো টয়লেট সিটের উপর স্প্রে করে নিলে তাও খানিক রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া জল বা টিস্যু পেপারের ব্যবহার অবশ্যকর্তব্য।

অজু

পাবলিক রেস্টরুমে ওজুর সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, খুব পরিচ্ছন্ন হয় না এই রেস্টরুমগুলো। তার উপর জুতো মোজা খুলে ফেললে নোংরা মেঝেতে পা দিতে হয়। আমি খুব সন্তর্পনে যতটা সম্ভব কম পা ঠেকিয়ে ওজু করার চেষ্টা করি।

আমাদের ইমাম বলেন মোজার উপর দিয়েও মাশাহ করা সম্ভব। ভাগ্যিস আল্লাহ তালা এই নির্দেশ দিয়েছেন। অনেকসময় প্লেনের রেস্টরুম অপরিছন্ন থাকে। তখন আমি পরিষ্কার দুটি প্রস্তরখণ্ডের মাধ্যমে চটজলদি তায়ামামাম সেরে নিই।

সহিহ মুসলমান সফরের সময় কীরকম ব্যবহার করবে?

ইমানদার ও জিম্মাদার আল্লাহর সেবক হিসাবে আমাদের কতগুলি ব্যবহারিক নিয়ম মেনে চলতেই হবে। তবেই আমরা উম্মাহর প্রতি সম্মান দেখাতে পারব।

প্রথমেই, ইসলামে মদ্যপান হারাম। তাই যেকোনও অফিস পার্টিতে অ্যালকোহল দেওয়া হলেও আমি আগেই জানিয়ে রাখি আমি মদ্যপান করি না। প্রথমে অমুসলিম সহকর্মীরা বেশ অবাক হতেন, এখন তাঁরা আমার ইচ্ছেকে সম্মান করেন।

দ্বিতীয়ত,

মিটিং এর পরে ডিনার পর্যন্ত থাকলেও আমি তারপরে আর কোনও পার্টিতে থাকি না। আমার ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। আমি সেটি বজায় রাখার চেষ্টা করি। এছাড়া কোনও অসম্মানজনক চটুল কথায় আমি অংশগ্রহণ করি না।

তৃতীয়ত,

মহিলাদের সঙ্গে আমি অত্যন্ত প্রফেশনালি কথা বলি। বাড়তি কথা বলি না। সম্মানজনক ভাবে দূরত্ব বজায় রাখি।

চতুর্থত,

অমুসলিম সহকর্মীরা অনেকসময়ই আমার কাজের ধরন বুঝতে পারে না। ওজু করার সময় জুতো মোজা খোলার বিষয়টি অনেকে মজার ছলে নেন, অনেকে অপমানিত বোধ করেন। এক্ষেত্রে ধৈর্য্য হারালে চলবে না। শান্তভাবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমার বর্তমান সহকর্মীরা যেমন আমার প্রত্যেকটি কাজ এখন স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেছেন।

সুতরাং,

এই উপদেশ গুলো মেনে চললে আশা করি আমার মুসলমান ভাইদের সফর সুবিধাজনক হয়ে উঠবে। তবে একটা কথা, এই সমস্ত সমস্যা মূলত অমুসলমান দেশগুলোতে হয়। মধ্যপ্রাচ্য বা ইসলাম ধর্মের দেশগুলিতে সহজেই এই সমস্ত সুবিধা পাওয়া যায়।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.