সবর ইবাদতের সুস্বাদু নেয়ামত

আল্লাহ তাআলা সবরকে ইবাদতের সুস্বাদু ফল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সবরকারী ব্যক্তিকে সফলকাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

বিশ্বনবী এই ছোট অথচ অত্যন্ত কার্যকরী আমলের ব্যাপারে অসংখ্য নেয়ামতের কথা তুলে ধরেন। এটি শুধু মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং মহান আল্লাহতালার অন্যতম গুণ। মহান রাব্বুল আলামিন মানুষকে তার এ গুণে নিজেদের রঙিন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

যেসকল বান্দা আল্লাহর পথ অনুসরণের কাজে নিজেদেরকে ধৈর্যশীল হিসেবে প্রস্তুত করবেন, আল্লাহ তাদের অবশ্যই সাহায্য করবেন। ইহকাল ও পরকালে তিনি শুধু নেয়ামতই দান করবেন না বরং তিনি সবরকারীদের সঙ্গে থাকবেন। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেনঃ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে ধৈর্য এবং নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৫৫)

আমরা এখন জানার চেষ্টা করবো কি কারণে সবরকারীদের মর্যাদা বেশি?

সকল কিছুই ভেতরে সবচেয়ে বেশি ধৈর্য ধারণ করেন মহান আল্লাহ। এবং এর ভেতরে রয়েছে আমাদের জন্য এক মহান শিক্ষা। তিনিই সে মহান সত্তা যিনি সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি জগতে যেসকল সৃষ্টিরা আল্লাহর নির্দেশনা অমান্য করে, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করেন। তার নিয়মের বাইরে, তার আদেশ-নিষেধের কোন তোয়াক্কা না করে যারা স্বেচ্ছাচারিতা তথা নিয়মের বাইরে নিজেদেরকে পরিচালিত করেন, তাদের ক্ষেত্রেও আল্লাহ ধৈর্যশীল।

আল্লাহ তো সেই মহান সত্তা যিনি সকল কিছুর মালিক এবং সর্বশক্তিমান। তিনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই সকল অবাধ্যকারীকেই ধ্বংস করে দিতে পারেন। কিন্তু পরম দয়ালু তিনি তা করেননা। বরং সবরের সঙ্গে তিনি বান্দার সকল অন্যায় অনিয়ম সহ্য করেন। শুধু তাই নয়, তিনি অকৃতজ্ঞ বান্দাদেরও আলো বাতাস, সুস্বাস্থ্য সহ সকল নিয়ামত দিয়ে তাদেরকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখেন। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি সবর মহান আল্লাহতালার একটি গুণ। আল্লাহতালার পছন্দ এই যে, এই গুনে আমাদের নিজেদেরকে গুণান্বিত করা।

হাদিসে পাকে হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সবর ৩ ধরনের।

>> বিপদাপদের সময় সবর অবলম্বন;

>> পাপাচার পরিহার করতে সবর অবলম্বন; এবং

>> আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ পালনে সবর অবলম্বন করা।

মহান রাব্বুল আলামিন নিজেই চান যে, তার বান্দারা তারই ধৈর্যের গুণে নিজেদের রঙিন করুক।

আল্লাহ তা’আলা মানুষকে হতাশা, বিপদ দিয়ে মানুষের সবরের পরীক্ষা নিবেন। মানুষকে সকল ধরনের বিপদ, হতাশায়, ধৈর্য্য হারা হয়ে সবরের সাথে এ পরীক্ষায় পাস করতে হবে। যেভাবে আল্লাহর সৃষ্টি জগতের সৃষ্টির অবাধ্যতায় নিজে ধৈর্য ধারণ করেন ঠিক একইভাবে ইমানদার বান্দাও ধৈর্য ধারণ করবেন।

আসলে এই সবরের পরীক্ষায় মানুষ উত্তীর্ণ হয়ে, সে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাক এটাই আল্লাহর ইচ্ছা। কেননা হাদিসে পাকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, ‘সবর বা ধৈর্যধারণ ঈমানের অঙ্গবিশেষ।’ তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’

ধৈর্যধারণ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসংখ্য নেয়ামতের ঘোষণা দিয়েছেন। যাতে মানুষ ধৈর্যধারণে উদ্বুদ্ধ হয়। অধৈর্য না হয়। আর তাহলো-

>> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহ তাআলা তার ধৈর্যগুণ আরও বাড়িয়ে দেন।’

>> ধৈর্য মানুষের জন্য অনেক বড় নেয়ামত। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিন পুরুষ-নারীদের দৈহিক, আর্থিক ও পারিবারিক বিপদ-আপদ মৃত্যু পর্যন্ত আসতেই থাকে। যারা এতে ধৈর্যধারণ করে, এ দ্বারা তাদের গুনাহ ক্ষমা হয়।’

>> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘যে মুসলমান মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে এবং তাদের অত্যাচার-উৎপীড়ন ধৈর্যের সঙ্গে বরণ করে নেয়; নির্জনবাসী সুফিসাধক ব্যক্তি থেকে তারা বহুগুণে উত্তম।’

>> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা কোনো লোককে যে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, তা কোনো ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা অর্জিত হয়। বরং শুধু ধৈর্যজনিত কারণেই আল্লাহ তাআলা তা দান করেছেন।’

>> ধৈর্যধারণ মুমিনের জন্য কত বড় নেয়ামত। যে ব্যক্তি নিজের জান-মালের ক্ষতি গোপন করে ধৈর্যধারণ করবে, আল্লাহর জন্য সে ব্যক্তিকে ক্ষমা করা ওয়াজিব হয়ে যায়। হাদিসের ঘোষণা-

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন, যার জানমালের প্রতি বিপদ এসেছে, কিন্তু সে তা গোপন রেখেছে; (হাহুতাশ ও হৈচৈ করে) লোকের কাছে তা প্রকাশ করেনি, তাকে ক্ষমা করা আল্লাহ তাআলার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়।

>> আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকেই বেশি বেশি বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। আবার যারা এ বিপদে ধৈর্যের পরীক্ষায় পাস করেন তাদের ব্যাপারে হাদিসে ঘোষণা-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, মানুষের সাওয়াবের প্রাচুর্য বিপদের প্রাচুর্যের প্রতি নির্ভরশীল। আল্লাহ যে সম্প্রদায়কে অধিক ভালোবাসেন, তাদের প্রতি অধিক বিপদ দিয়ে থাকেন। যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করে, কেয়ামতের দিন ওই বান্দার সন্তুষ্টিলাভ সুনিশ্চিত। আর যে ব্যক্তি বিপদে অধৈর্য হয়ে পড়ে, কেয়ামতের পেরেশানিও তার জন্য সুনিশ্চিত।

পরিশেষে বলা যায় যে, জীবনে যত ধরনের বাধা-বিপত্তি কষ্ট দুঃখ বেদনা সমস্যা যত কিছুই আসুক না কেন, আমাদের দায়িত্ব হবে সবরের সাথে সকল কিছু মোকাবেলা করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সবর ধারণ করার তৌফিক দান করুক ।