সমতা, উৎসর্গ ও আন্তরিকতা: মরিয়ম(আঃ)-এর গল্প

কুরআনে ঈসা (আঃ) এর মাতা মরিয়ম (আঃ) এর গল্প দুটি সূরায় বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ১৯ নং সূরা যেটির নামকরণ করা হয়েছে সূরা মরিয়ম।

এই সূরার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল ইয়াহুদ ও নাসরাদের শয়তানি চক্রান্তের বিপরীতে ইসলামী শিক্ষাকে তুলে ধরা।

এখানে সূরা আলে ইমরান থেকে মরিয়ম (আঃ) এর কিছু ঘটনা ও শিক্ষা নিম্নে তুলে ধরা হল-

মানবতার সমতা

এই সূরায় মরিয়ম (আঃ) কে ‘ইমরান (আঃ) এর মেয়ে’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মরিয়ম (আঃ) এর মা আল্লাহর প্রতি তাঁর ভক্তি প্রদর্শন করার আকাঙ্ক্ষায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাঁর যে সন্তান হবে তাঁকে আল্লাহর ঘরের খেদমতে নিযুক্ত করবেন। কিন্তু যখন তাঁর মেয়ে জন্ম হল, তখন তিনি হতবাক হয়েছিলেন। তিনি একটি ছেলের প্রত্যাশা করছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন যে, সমাজে মেয়েরা দুর্বল হিসাবে বিবেচিত হয়। সে কিভাবে আল্লাহর ঘরের খেদমত করবে?

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ” অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো, তখন সে বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমি তো কন্যা প্রসব করেছি। বস্তুতঃ কি সে প্রসব করেছে আল্লাহই তা ভালই জানেন। সেই কন্যার মত কোন পুত্রই যে নেই। আর আমি তার নাম রাখলাম মরিয়ম। আর আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে।” (আল কুরআন-৩:৩৬)

আল্লাহর প্রতি উৎসর্গতা 

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি মরিয়মকে আল্লাহর ঘরে খেদমত করার জন্য নিযুক্ত করলেন। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর নামে উৎসর্গীত সন্তান পালন করাকে তখনকার সময়ে খুবই পুণ্যের কাজ মনে করা হত। আর সেকারণে মরিয়মকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ফলে লটারীর ব্যবস্থা করা হয় এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর বয়োবৃদ্ধ নবী হযরত যাকারিয়া (আঃ) মারিয়ামের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই ঘটনা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর তাঁর পালনকর্তা তাঁকে উত্তম ভাবে গ্রহণ করে নিলেন এবং তাঁকে প্রবৃদ্ধি দান করলেন-অত্যন্ত সুন্দর প্রবৃদ্ধি। আর তাঁকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে সমর্পন করলেন। যখনই যাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তার কছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন। জিজ্ঞেস করতেন “মরিয়ম! কোথা থেকে এসব তোমার কাছে এলো?” তিনি বলতেন, “এসব আল্লাহর নিকট থেকে আসে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করেন।” (আল কুরআন-৩:৩৭)

মরিয়মের মায়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কারণে আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেন। তাঁকে জান্নাত থেকে সম্মানিত রিযিক দান করেন।

ঈমানের মধ্যে আন্তরিকতার বিকাশ

সূরা আলে ইমরানের প্রথম দিকে এই দু’আটি বর্ণিত হয়েছে, “হে আমাদের প্রতিপালক! সৎ পথ প্রদর্শনের পরে তুমি আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দিও না, আমাদেরকে তোমার নিকট হতে রহমত প্রদান কর, মূলতঃ তুমিই মহান দাতা।” (আল কুরআন-৩: ৮)

এই দু’আটি বেঈমানের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

“ফেরআউনের সম্প্রদায় এবং তাদের পূর্ববর্তীদের ধারা অনুযায়ীই তারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। ফলে তাদের পাপের কারণে আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করেছেন আর আল্লাহর আযাব অতি কঠিন।” (আল কুরআন-৩:১১)

আল্লাহ আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেনন, “যারা কুফুরী করে, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর সামনে কখনও কাজে আসবে না। আর তারাই হচ্ছে দোযখের ইন্ধন।” (আল কুরআন-৩:১০)

এবং যারা এই দুর্দশা থেকে রক্ষা পেয়েছেন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তারা ধৈর্য্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (আল কুরআন-৩:১৭)

উপসংহার

কুরআনের নিয়ম হল যখন কোনো গুণ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়, তখন এর জন্য একটি দৃষ্টান্তও স্থাপন করা হয় যাতে এর অনুসরণ করা সহজ হয়। মরিয়ম(আঃ) এর ঘটনায় সেই শিক্ষাটিই দেয়া হয়েছে।

ঈমানের মধ্যে আন্তরিকতা বিকাশের মাধ্যমে এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে মরিয়ম (আঃ) যে মর্যাদা অর্জন করেছেন তা অনেকেই অর্জন করতে পারেন নি। সমগ্র দুনিয়ার জন্য আল্লাহ তাঁর দৃষ্টান্তস্বরূপ স্থাপন করেছেন। আমরাও যদি ঈমানের সাথে আন্তরিকতার বিকাশ ঘটাতে পারি তবে আল্লাহ আমাদেরকেও পুরষ্কৃত করবেন।

পরিশেষে বলা যায়, সূরা আলে ইমরানে মরিয়ম (আঃ) এর ঘটনা উল্লেখ রয়েছে তাতে সকল মানুষের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। তাঁর পরিত্রতা, অবিচলতা, আল্লাহর প্রতি ভরসার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে যে সম্মান দান করেছেন তা আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে এবং নেক কাজে অবিচলতা সৃষ্টিতে আমাদেরকে সাহায্য করে।