সম্পদের সচ্ছলতা সম্পর্কে কী বলেছেন মহানবী (সাঃ)?

dreamstime_s_91775973

(১ম পর্ব)

অনেক লোক ভুল করে এটা মনে করে যে, সম্পদের প্রাচুর্য্যতাই হল প্রকৃত সচ্ছলতা। এটা সত্য যে, সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মহান নি’আমত যা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে দান করে থাকেন। এবং যারা হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন করে এবং যথাযথভাবে সম্পদ ব্যয় করে তারা নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছ থেকে অনেক বড় পুরস্কার লাভ করবে। তবে সম্পদ যার বেশি সেই প্রকৃত ধনী এই ধারণাটি নিতান্তই ভুল।

একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবী আবু যর(রাযিঃ)-কে বললেন, “হে আবু যর! তুমি কি সম্পদের প্রাচুর্য্যতাকেই সচ্ছলতা মনে করো?” আবু যর(রাযিঃ) বললেন, “হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, “তাহলে কি তুমি সম্পদের স্বল্পতাকে দারিদ্র্যতা মনে করো?” তিনি বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “প্রকৃত সচ্ছলতা তো হৃদয়ের সচ্ছলতা, আর হৃদয়ের দারিদ্র্যতাই হল প্রকৃত দারিদ্র্যতা।” (ইবনে হিব্বান)

প্রকৃত ধনী কে?

প্রতিটি মানুষের কাছেই মূলত ধনী-দরিদ্রের সংজ্ঞা এমন—”সম্পদ-ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ যে, সে-ই ধনী; আর সহায়-সম্পদ যার কম সে-ই দরিদ্র।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্বাভাবিক বিষয়টি এড়িয়ে আমাদেরকে সন্ধান দিয়েছেন এক মহাসত্যের। সুবিবেচক কোনো ব্যক্তির পক্ষেই তা অস্বীকার করা সম্ভব না।

আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “সম্পদের প্রাচুর্য্যতা সচ্ছলতা নয়, বরং প্রকৃত সচ্ছলতা তো হল হৃদয়ের সচ্ছলতা।” (বুখারী, মুসলিম)

আমরা যদি আমাদের চারপাশটাকে একটু ভালো করে পরখ করি দেখি তাহলে দেখব, প্রচুর টাকা মাসে যিনি উপার্জন করেন তার কণ্ঠেও শোনা যায় ‘নাই’ কিংবা ‘আরও চাই’-এর আক্ষেপ, আবার এই সমাজেই এমন কিছু ভাগ্যবান মানুষও আছেন, যারা দিনে এনে দিনে খায় কিন্তু এরপরও তাদের কথায়-আচরণে তৃপ্তি ঝড়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ধনী-গরীবের এ মানদন্ডটিই নির্দেশ করেছেন। তাঁর বর্ণনানুসারে, লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে যে এখন কোটিপতি, কিন্তু ‘আরও চাই’-এর তৃষ্ণায় রাতে সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না, সে মূলত ধনী নয়।

অন্যের সম্পদে হাত বাড়ানো

এর বিপরীতে কোনোমতে সংসার চলে যার, তৃপ্তির সঙ্গ পেলে সে-ই ধনী হয়ে যায়। কারণ অন্যের সম্পদের প্রতি তার একটুও আকর্ষণ নেই। সামান্য যা কিছুই সে আয় করে তাতেই তার সংসার চলে যায় এবং এতেই সে তৃপ্ত হয়। আয়-ব্যয়ের হিসাব চুকিয়ে রাতে যখন বিছানায় যায় দু’চোখ জুড়ে তার নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। কিন্তু একজন কোটিপতিও যখন আরও সম্পদের নেশায় অন্যের সম্পদের দিকে অন্যায়ভাবে হাত বাড়ায়, কিংবা অন্তত নিজের আরামটুকু হারাম করে তোলে, সমাজের চোখে তারা বিত্তশালী বা ধনী যাই হোক না কেন, হৃদয়ের বিচারে তারা মূলত সচ্ছল নয়। প্রচুর সম্পদের ওপর ঘুমালেও তারা মূলত দরিদ্রই। সম্পদের প্রাচুর্য তারা ঠিকই লাভ করেছে, কিন্তু হৃদয়ের সচ্ছলতায় তারা সচ্ছল হতে পারেনি।

দুনিয়াতে চলতে গেলে ধন-সম্পদ তো লাগেই। এটাই স্বাভাবিক। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যও তাই। আল্লাহ বলেন, “আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন-যাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা অর্বাচীনদের হাতে তুলে দিও না। বরং তা থেকে তাদেরকে খাওয়াও, পরাও এবং সান্তনার বানী শোনাও।“ (আল কুরআন-৪:৫)

সম্পদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকাটাও অতি স্বাভাবিক বিষয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- “মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত অশ্ব,, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের সামান্য ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল।” (আল কুরআন-৩:১৪)

অল্পেতুষ্টি

মানুষের অন্ততের এই স্বাভাবিক চাহিদাকে উল্লেখ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বলেছেন, “আদম সন্তানের কেউ যদি দুটি উপত্যকা ভর্তি সম্পদেরও মালিক হয়ে যায় তবুও সে আরেকটি উপত্যকার সন্ধান করতে থাকে। কেবল কবরের মাটিই তার উদরকে পূর্ণ করে দিতে পারে!” (বুখারী)

সম্পদের প্রতি অস্থির লালসা, এটাই মানুষের চিরাচরিত স্বভাব। তবে এ স্বভাব আর স্বাভাবিকতাকে যারা জয় করতে পারে, নিজের সম্পদ কম-বেশি যতটুকুই হোক তাতেই যারা তৃপ্ত, কষ্টকর এ দুনিয়ার জীবন তাদের জন্যই হয়ে ওঠে সুখকর। এভাবে তৃপ্ত থাকার গুণটিকে ‘কানা’আত’ বা ‘অল্পেতুষ্টি’ বলা হয়। 

হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস(রাযিঃ) আপন ছেলেকে এই বলে উপদেশ দিয়েছিলেন, “হে আমার ছেলে শোনো! যখন কোনো কিছুর সন্ধান করবে তখন অল্পেতুষ্টির সঙ্গে তার সন্ধান করবে। আর যদি তুমি অল্পেতুষ্ট না হও, তাহলে কোনো সম্পদই তোমার উপকারে আসবে না।”

(চলবে)